সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাঙালি মুসলমানের হজ সাহিত্য

বাংলা সাহিত্যে হজ এক সমৃদ্ধ অধ্যায়। এতে আছে হজের মাহাত্ম্য, আবেগ, অধ্যাত্ম উপলব্ধি এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। বাঙালি মানসে ঈমানি অনুরাগের প্রতিফলন ‘হজ সাহিত্য’।

হজ ইসলামের পঞ্চ ভিত্তির অন্যতম ফরজ ইবাদত।

শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য সমন্বিত ইবাদত। হজের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা তাওয়াফে কাবা। বাঙালি হৃদয়ে ঈমান, তাওহিদ, কোরআন, প্রিয় নবী (স.)-এর প্রতি ভক্তিময় অনুভব হজের সফরে জীবন্ত হয়ে ওঠে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমর্পণ, ১৯৩৬ খ্রি. (১৩৪৩) রেকর্ডকৃত :
‘দিলে মুখে তকবির, দিলে বুকে তৌহিদ

দিলে দুঃখেরই সান্ত্বনা খুশির ঈদ

দিলে প্রাণে ঈমান, দিলে হাতে কোরআন

শিরে শিরতাজ নাম মুসলিম আমায়।


মক্কা-মদিনার পবিত্র স্থানগুলো প্রিয় নবী (স.)-এর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আজও সুসংরক্ষিত। তা তাঁর (সা.) চলমান মুজিজা। উম্মতে মুহাম্মদির সর্বকালীন সর্বাত্মক ঐকমত্য, ‘বায়তুল্লাহ’র পর দুনিয়ার সর্বোত্কৃষ্ট ও সর্বাপেক্ষা মর্যাদাপূর্ণ স্থান, ‘রওজাতুল আতহার’ বা ‘পবিত্র সমাধি’। ভক্তিবাদী মানুষের আকাঙ্ক্ষা, জীবনে একটিবারের জন্য হলেও যেন ‘রওজা মুবারক’ জিয়ারতে বলতে পারেন : ‘আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ’।

মুসলিম আবেগ বোঝাতে জাতীয় কবির উচ্চারণ, ১৯৩৬ খ্রি. (১৩৪২) রেকর্ডকৃত :
‘ওরে ও দরিয়ার মাঝি, মোরে নিয়ে যারে মদিনায়

তুমি মুরশিদ হয়ে পথ দেখাও ভাই,

আমি যে পথ চিনি না।’

পবিত্র কাবা সৌদি আরবের মক্কার মসজিদুল হারামে অবস্থিত। কাবাঘরের ভূমিটুকু প্রথম স্থলভাগ। পৃথিবী স্থির হয় কাবার বরকতে ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয় (হেলে না যায়)।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১৫)

ধীরে ধীরে পবিত্র কাবা কেন্দ্র করেই মানবসভ্যতার বিকাশ।

কাজি নজরুল ইসলামের অনুভব, ১৯৩৮ খ্রি. (১৩৪৫) রেকর্ডকৃত :
‘দূর আরবের স্বপন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে

বেহুঁশ হয়ে চলেছি যেন কেঁদে কেঁদে কাবার পথে…।’

কবি মননে কাবা দর্শনের প্রবলতম আকাঙ্ক্ষা সুস্পষ্ট। তাঁর সাধ আছে সাধ্য নেই, আছে হতাশার দীর্ঘশ্বাস, ১৯৪০ খ্রি. (১৩৪৭) রেকর্ডকৃত :

‘পুবান হাওয়া পশ্চিমে যাও কাবার পথে বইয়া

যাও রে বইয়া এই গরিবের সালামখানি লইয়া।।

কাবার জিয়ারতের আমার নাই সম্বল ভাই

সারা জনম সাধ ছিল যে মদিনাতে যাই (রে ভাই)

মিটল না সাধ, দিন গেল মোর দুনিয়ার বোঝা বইয়া।।

(তোমার) পানির সাথে লইয়া যাও রে আমার চোখের পানি

লইয়া যাও রে এই নিরাশের, দীর্ঘ নিঃশ্বাসখানি।’

ইসলামী জীবনবোধে হজের অধ্যাত্ম শিক্ষার মধ্যে মানুষের অধিকারের তাৎপর্য রয়েছে :

‘কারো মনে দিও না আঘাত

সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে।

মানুষেরে তুমি যত কর ঘৃণা

খোদা যান ততো স’রে।।

একটি মানুষে খুশি করা আর

হজ করে আসা হাজার বার…।’

(আজিজুর রহমান)

পবিত্র মক্কা-মদিনা ভক্ত হৃদয়ের অনন্য উচ্চতায় স্থান পেয়েছে। অব্যক্ত আকূলতা ধ্বনিত হয় জান্নাতি আবাহণে :

‘দে দে পাল তুলে দে

মাঝি হেলা করিস না

ছেড়ে দে নৌকা

…ও দয়াল মুর্শিদ যার সখা

তার কিসের ভাবনা

আমার হৃদয় মাঝে কাবা

নয়নে মদিনা…।’

আশ্চর্য! মরমি অনুভবে মক্কার অবস্থান বাঙালির হৃদয়ের গভীরে। এমন লোকভাবনার ধর্মীয় মূল্য নেই বিন্দুমাত্র :

‘আছে আদি মক্কা এই মানবদেহে,

দেখ না রে মন চেয়ে…’

বাংলা ভাষায় হজ নিয়ে লিখেছেন অনেকেই। মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা (১৯১৬), ইয়াসিন আলী সরকারের (১৯৩০) রচনায় ওই সময়ের সমাজ ও হজের যাত্রাপথের চিত্র পাওয়া যায়। এ ছাড়া :

খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ ‘হেজাজ ভ্রমণ’ (১৯২১)।

আবদুর রহমান খাঁ ‘হজের সফর’ (১৯৪৯),

আবদুল আজিজ আল আমান ‘কাবার পথে’ (দুই খণ্ড ১৯৮৬),

সুলতানা রাজিয়া ‘আমার হজ কথা’ (২০০২),

নাজমা ফেরদৌসী ‘আল্লাহর অতিথি’।

বস্তুত বাঙালি মুসলিম সাহিত্যে হজ নিছক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এতে আছে বাঙালির ঈমানি চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় :

‘আয়রে হাজির দল গাট্টুরি বান্দিয়া চল

তের মঞ্জিল পাড়ি দিলে মিলবে মদিনা।’

প্রিয় নবী (স.)-এর বিদায় হজ বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। এসংক্রান্ত আলোচনা মানবাধিকার ও ইসলামের শাশ্বত বাণী হিসেবে গণ্য। যেমন মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ প্রবন্ধ ‘বিদায় হজ’। বিদায় হজে ৩১টি বিষয়ে তিনি উম্মতকে সতর্ক করেন। এখনো যাদের হজের সৌভাগ্য হয়নি, তাদের কাজী নজরুল ইসলামের সান্ত্বনা :

‘আমি হজে যেতে পাইনি ব’লে কেঁদেছিলাম রাতে।

তাই হযরত এসে স্বপ্নে মাগো ধরেছিলেন হাতে।’

(১৯৪১ খ্রি. ১৩৪৭ প্রচারিত)

হজবিষয়ক সংকলন :

ফাজায়েলে হজ : শাইখুল হাদিস মাওলানা যাকারিয়া (রহ.)। অনুবাদ : মাওলানা মো. ছাখাওয়াত উল্লাহ।

সফরে হিজায : মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদি। অনুবাদ : মুফতি ওয়ালিউল্লাহ আবদুল জলিল।

হজ পালনের শ্রেষ্ঠ উপায় : আবু মুনির ইসমাইল। অনুবাদ : রিয়াজ উদ্দিন।

হজ : একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড : মোহাম্মদ মুর্তজা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

হজ : ইসলামী বিধি ও রীতি : মুফতি তাকি উসমানি।

আহকামে হজ : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ

কাপাসিয়া, গাজীপুর

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বাঙালি মুসলমানের হজ সাহিত্য

প্রকাশিত সময় : ১২:৫৫:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

বাংলা সাহিত্যে হজ এক সমৃদ্ধ অধ্যায়। এতে আছে হজের মাহাত্ম্য, আবেগ, অধ্যাত্ম উপলব্ধি এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। বাঙালি মানসে ঈমানি অনুরাগের প্রতিফলন ‘হজ সাহিত্য’।

হজ ইসলামের পঞ্চ ভিত্তির অন্যতম ফরজ ইবাদত।

শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য সমন্বিত ইবাদত। হজের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা তাওয়াফে কাবা। বাঙালি হৃদয়ে ঈমান, তাওহিদ, কোরআন, প্রিয় নবী (স.)-এর প্রতি ভক্তিময় অনুভব হজের সফরে জীবন্ত হয়ে ওঠে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমর্পণ, ১৯৩৬ খ্রি. (১৩৪৩) রেকর্ডকৃত :
‘দিলে মুখে তকবির, দিলে বুকে তৌহিদ

দিলে দুঃখেরই সান্ত্বনা খুশির ঈদ

দিলে প্রাণে ঈমান, দিলে হাতে কোরআন

শিরে শিরতাজ নাম মুসলিম আমায়।


মক্কা-মদিনার পবিত্র স্থানগুলো প্রিয় নবী (স.)-এর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আজও সুসংরক্ষিত। তা তাঁর (সা.) চলমান মুজিজা। উম্মতে মুহাম্মদির সর্বকালীন সর্বাত্মক ঐকমত্য, ‘বায়তুল্লাহ’র পর দুনিয়ার সর্বোত্কৃষ্ট ও সর্বাপেক্ষা মর্যাদাপূর্ণ স্থান, ‘রওজাতুল আতহার’ বা ‘পবিত্র সমাধি’। ভক্তিবাদী মানুষের আকাঙ্ক্ষা, জীবনে একটিবারের জন্য হলেও যেন ‘রওজা মুবারক’ জিয়ারতে বলতে পারেন : ‘আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ’।

মুসলিম আবেগ বোঝাতে জাতীয় কবির উচ্চারণ, ১৯৩৬ খ্রি. (১৩৪২) রেকর্ডকৃত :
‘ওরে ও দরিয়ার মাঝি, মোরে নিয়ে যারে মদিনায়

তুমি মুরশিদ হয়ে পথ দেখাও ভাই,

আমি যে পথ চিনি না।’

পবিত্র কাবা সৌদি আরবের মক্কার মসজিদুল হারামে অবস্থিত। কাবাঘরের ভূমিটুকু প্রথম স্থলভাগ। পৃথিবী স্থির হয় কাবার বরকতে ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয় (হেলে না যায়)।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১৫)

ধীরে ধীরে পবিত্র কাবা কেন্দ্র করেই মানবসভ্যতার বিকাশ।

কাজি নজরুল ইসলামের অনুভব, ১৯৩৮ খ্রি. (১৩৪৫) রেকর্ডকৃত :
‘দূর আরবের স্বপন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে

বেহুঁশ হয়ে চলেছি যেন কেঁদে কেঁদে কাবার পথে…।’

কবি মননে কাবা দর্শনের প্রবলতম আকাঙ্ক্ষা সুস্পষ্ট। তাঁর সাধ আছে সাধ্য নেই, আছে হতাশার দীর্ঘশ্বাস, ১৯৪০ খ্রি. (১৩৪৭) রেকর্ডকৃত :

‘পুবান হাওয়া পশ্চিমে যাও কাবার পথে বইয়া

যাও রে বইয়া এই গরিবের সালামখানি লইয়া।।

কাবার জিয়ারতের আমার নাই সম্বল ভাই

সারা জনম সাধ ছিল যে মদিনাতে যাই (রে ভাই)

মিটল না সাধ, দিন গেল মোর দুনিয়ার বোঝা বইয়া।।

(তোমার) পানির সাথে লইয়া যাও রে আমার চোখের পানি

লইয়া যাও রে এই নিরাশের, দীর্ঘ নিঃশ্বাসখানি।’

ইসলামী জীবনবোধে হজের অধ্যাত্ম শিক্ষার মধ্যে মানুষের অধিকারের তাৎপর্য রয়েছে :

‘কারো মনে দিও না আঘাত

সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে।

মানুষেরে তুমি যত কর ঘৃণা

খোদা যান ততো স’রে।।

একটি মানুষে খুশি করা আর

হজ করে আসা হাজার বার…।’

(আজিজুর রহমান)

পবিত্র মক্কা-মদিনা ভক্ত হৃদয়ের অনন্য উচ্চতায় স্থান পেয়েছে। অব্যক্ত আকূলতা ধ্বনিত হয় জান্নাতি আবাহণে :

‘দে দে পাল তুলে দে

মাঝি হেলা করিস না

ছেড়ে দে নৌকা

…ও দয়াল মুর্শিদ যার সখা

তার কিসের ভাবনা

আমার হৃদয় মাঝে কাবা

নয়নে মদিনা…।’

আশ্চর্য! মরমি অনুভবে মক্কার অবস্থান বাঙালির হৃদয়ের গভীরে। এমন লোকভাবনার ধর্মীয় মূল্য নেই বিন্দুমাত্র :

‘আছে আদি মক্কা এই মানবদেহে,

দেখ না রে মন চেয়ে…’

বাংলা ভাষায় হজ নিয়ে লিখেছেন অনেকেই। মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা (১৯১৬), ইয়াসিন আলী সরকারের (১৯৩০) রচনায় ওই সময়ের সমাজ ও হজের যাত্রাপথের চিত্র পাওয়া যায়। এ ছাড়া :

খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ ‘হেজাজ ভ্রমণ’ (১৯২১)।

আবদুর রহমান খাঁ ‘হজের সফর’ (১৯৪৯),

আবদুল আজিজ আল আমান ‘কাবার পথে’ (দুই খণ্ড ১৯৮৬),

সুলতানা রাজিয়া ‘আমার হজ কথা’ (২০০২),

নাজমা ফেরদৌসী ‘আল্লাহর অতিথি’।

বস্তুত বাঙালি মুসলিম সাহিত্যে হজ নিছক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এতে আছে বাঙালির ঈমানি চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় :

‘আয়রে হাজির দল গাট্টুরি বান্দিয়া চল

তের মঞ্জিল পাড়ি দিলে মিলবে মদিনা।’

প্রিয় নবী (স.)-এর বিদায় হজ বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। এসংক্রান্ত আলোচনা মানবাধিকার ও ইসলামের শাশ্বত বাণী হিসেবে গণ্য। যেমন মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ প্রবন্ধ ‘বিদায় হজ’। বিদায় হজে ৩১টি বিষয়ে তিনি উম্মতকে সতর্ক করেন। এখনো যাদের হজের সৌভাগ্য হয়নি, তাদের কাজী নজরুল ইসলামের সান্ত্বনা :

‘আমি হজে যেতে পাইনি ব’লে কেঁদেছিলাম রাতে।

তাই হযরত এসে স্বপ্নে মাগো ধরেছিলেন হাতে।’

(১৯৪১ খ্রি. ১৩৪৭ প্রচারিত)

হজবিষয়ক সংকলন :

ফাজায়েলে হজ : শাইখুল হাদিস মাওলানা যাকারিয়া (রহ.)। অনুবাদ : মাওলানা মো. ছাখাওয়াত উল্লাহ।

সফরে হিজায : মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদি। অনুবাদ : মুফতি ওয়ালিউল্লাহ আবদুল জলিল।

হজ পালনের শ্রেষ্ঠ উপায় : আবু মুনির ইসমাইল। অনুবাদ : রিয়াজ উদ্দিন।

হজ : একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড : মোহাম্মদ মুর্তজা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

হজ : ইসলামী বিধি ও রীতি : মুফতি তাকি উসমানি।

আহকামে হজ : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ

কাপাসিয়া, গাজীপুর