খ্রিস্টীয় ১৭ শতক। মোগল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ। বর্তমান পাকিস্তানের দুই গবেষক ও কারিগর ভাই লাহোরের প্রশাসক আগা আফজালের জন্য একটি অ্যাস্ট্রোল্যাব তৈরি করেন। পিতলের তৈরি যন্ত্রটি ৪০০ বছর পর লন্ডনের সোথবিসে (নিলাম হাউস) ২.৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে।
অ্যাস্ট্রোল্যাব একটি জটিল ও বহুমুখী যন্ত্র। আধুনিক কম্পাস ও দিকনির্ণায়ক যন্ত্রগুলো আবিষ্কারের আগে এর মাধ্যমে মানুষ উচ্চতা পরিমাপ, সময় গণনা ও চন্দ্র-সূর্যের অবস্থান নির্ণয়ের মাধ্যমে দিক নির্ণয় করত। ইতিহাসবিদ ফেদেরিকা গিগান্তে বলেন, এগুলো মূলত একটি ত্রিমাত্রিক মহাবিশ্বের দ্বিমাত্রিক প্রক্ষেপণ। আমি এগুলোকে আধুনিক স্মার্টফোনের সঙ্গে তুলনা করি।
কেননা এগুলো দিয়ে অনেক কিছু করা যায়।
খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দে গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাব আবিষ্কার করেন। অষ্টম শতাব্দীতে তা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাবের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখে।
যাদের ভেতর আল-ফারাজি, আল-বাত্তানি, আল-বিরুনি, জারকালি ও মারিয়াম ইজলানি অন্যতম। মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম আল-ফারাজির ব্যাপারে বলা হয়, পিতা ইবরাহিমের সঙ্গে মিলে প্রথম মুসলিম বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি নিখুঁত অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেন। মুসলিম সমাজে কিবলা বা কাবার দিক নির্ণয় করার জন্য অ্যাস্ট্রোল্যাবের সাধারণ ব্যবহার ছিল। এ জন্য মুসলিম বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যবহার জানত, বিশেষ করে মসজিদের মুয়াজ্জিনরা নামাজের সময় নির্ণয় করতে যন্ত্রটি ব্যবহার করতেন।
বেশির ভাগ অ্যাস্ট্রোল্যাব হতো পকেট সাইজের।
কিন্তু মোগল আমলে তৈরি এই অ্যাস্ট্রোল্যাবের উচ্চতা প্রায় ১৮ ইঞ্চি, ওজন ৮.২ কেজি। সোথবিসের ইসলামী ও ভারতীয় শিল্প বিভাগের প্রধান বেনেডিক্ট কার্টার বলেন, ‘সম্ভবত এটি এখন পর্যন্ত বিদ্যমান সবচেয়ে বড় অ্যাস্ট্রোল্যাব।’ গত ২৯ এপ্রিল ভারতে তৈরি বৃহৎ এই অ্যাস্ট্রোল্যাবটি নিলাম হয়। তার আগে সোথবিসের লন্ডন গ্যালারিতে তা প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়।
সোথবিসের তথ্য মতে, অ্যাস্ট্রোল্যাবটি ১৬১২ সালে লাহোরে তৈরি হয়। তখন মোগল সাম্রাজ্যের শাসন চলছিল। মোগলরা ছিল তুর্কি-মোঙ্গল বংশোদ্ভূত এবং তারা আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করত। এই অঞ্চলের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নে মুসলিম মোগল সম্রাটদের অবদান ছিল অসামান্য। মোগল আমলে লাহোর ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র। মোগল পরিবারের অনেক সদস্য লাহোরে বসবাস করত। মধ্য এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীদের অনেকে লাহোরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
তখন লাহোরে কায়িম মুহাম্মদ ও মুহাম্মদ মুকিম নামের দুই ভাই বসবাস করতেন। তাঁরা ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানে পণ্ডিত এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নির্মাণে সুদক্ষ কারিগর। চার প্রজন্ম ধরে তাঁদের পরিবার জ্যোর্তিবিজ্ঞান চর্চা ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরির কাজে যুক্ত ছিল। তাঁদের দাদা মোল্লা ইলাহদাদ সম্রাট হুমায়ুনের রাজদরবারে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাতা ছিলেন। কায়িম ও মুকিমের সন্তানরাও একাধিক অ্যাস্ট্রোল্যাব তৈরি করেছিলেন। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে লাহোরের প্রশাসক আগা আফজাল এই দুই ভাইকে একটি অ্যাস্ট্রোল্যাব তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তাঁরা রবিউল আউয়াল ১০২১ হিজরি মোতাবেক মে ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণ কাজ শেষ করেন। আগা আফজাল পারস্যের ইস্পাহান শহর থেকে ভারতে এসেছিলেন। মোগল সম্রাটরা তাঁর জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও বিচক্ষণতার জন্য একাধিক প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত করেন।
কায়িম ও মুকিমের তৈরি অ্যাস্ট্রোল্যাবটি সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতে তৈরি অন্যান্য সাধারণ অ্যাস্ট্রোল্যাবের তুলনায় চার গুণ বড়। এতে ৩৮টি নক্ষত্র এবং মক্কা, বিজাপুর, আজমির, কাশ্মীর, লাহোরসহ ৯৪টি শহরের নাম ও অবস্থান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সোথবিসের মতে, পরিমাপের দাগগুলো এত সূক্ষ্ম যে সেগুলোকে ডিগ্রির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ভাগ করা হয়েছে। কার্টার বলেন, এই বিস্তারিত কারুকাজ লাহোরে উন্নত কারুশিল্পের প্রতিফলন, যা তখন তাঁর উন্নতির সবচেয়ে পরিশীলিত পর্যায়ে পৌঁছে ছিল।
১৯ শতকে মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং লাহোরের অ্যাস্ট্রোল্যাবটি বিভিন্ন হাত ঘুরে জয়পুরের দ্বিতীয় ও শেষ রাজা মহারাজা সওয়াই মান সিং দ্বিতীয়ের সংগ্রহে আসে। ১৯৭০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর, তা তাঁর স্ত্রী রাজমাতা গায়েত্রী দেবীর কাছে যায়। পরে লন্ডনের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে স্থানান্তরিত হয়।
কায়িম মুহাম্মদ ও মুহাম্মদ মুকিমের তৈরি আরেকটি অ্যাস্ট্রোল্যাব ইরাক জাতীয় জাদুঘরে আছে। তাতে তাঁদের নামও খোদাই করা আছে, কিন্তু সেটি অনেক ছোট। পরিমাপে সেটার প্রস্থ পাঁচ ইঞ্চিরও কম।
তথ্যঋণ : আর্টনেট ডটকম, সোথবি’স ডটকম
ও স্মিথসোনিয়ান ম্যাগ ডটকম

রিপোর্টারের নাম 
























