অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া থালাপতি বিজয় প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়েই রাজ্য সরকার গঠনের পথে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। প্রাথমিক ভোট গণনার শুরু থেকেই ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-এর মতো শক্তিশালী দলগুলোকে পেছনে ফেলে অভিনেতার টিভিকে ১০০-র বেশি আসনে এগিয়ে।
থালাপতির এই জয় প্রমাণ করেছে, পর্দার জনপ্রিয়তা শুধু বিনোদনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনমানুষের আস্থাতেও তার অবস্থান অনেক ওপরে। অভিনেতা থেকে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী বনে যাওয়ার এই যাত্রাকে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার রথী-মহারথীরা একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে বিজয়ের ভূমিধস জয়ের আসল রহস্য কী কিংবা কিভাবে হলো সিনেমার নায়কের মতো তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে তার উত্থান।
বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা মোটেও আকস্মিক ছিল না। ২০০৯ সালে তার বিশাল ফ্যান ক্লাব নেটওয়ার্ক ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে একটি সমাজসেবামূলক সংস্থায় রূপান্তরিত হয়। অনেকে বিষয়টা প্রথমে ধরতে না পারলেও তার রাজনৈতিক যাত্রার ভিত তৈরি হয়েছিল তখনই। পরবর্তীকালে তার সিনেমাগুলোও সুকৌশলে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তৈরিতে সাহায্য করেছে।
আইএমডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মুক্তি পায় তার সিনেমা ‘সরকার’, যেখানে এক ব্যবসায়ীর রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
সিনেমাটিতে দেখা গিয়েছিল, ভোট দিতে গিয়ে থালাপতির চরিত্র ‘সুন্দর’ যখন দেখেন তার ভোটটি অন্য কেউ দিয়ে গেছে, তখন থেকেই তার চরিত্রের পরিবর্তন শুরু হয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করেন। সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাটিই দুর্নীতিগ্রস্ত। এরপর তিনি একজন নির্দলীয় বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন এবং সরাসরি দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের মুখোমুখি হন।
সিনেমার শেষ দিকে দেখা যায়, থালাপতির দল নির্বাচনে জয়ী হলেও তিনি নিজে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেননি। এর বদলে তিনি একজন সৎ ও যোগ্য সরকারি কর্মকর্তাকে (কালেক্টর) মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন। থালাপতির চরিত্র ‘সুন্দর’ মূলত একজন কিংমেকার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন, যিনি সিস্টেম বদলানোর পর ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের পাশে থাকাই বেছে নেন।
২০২৪ সালে শুরুতে রাজনৈতিক দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজগাম (টিভিকে)’ গঠনের পর বিজয়ের রাজনীতির যাত্রাকে দেখা হচ্ছিল এই ‘সরকার’ সিনেমার গল্পের মতো করে। যদিও দল গঠনের পর অনেকটা নীরব ছিলেন বিজয়। মূলত তিনি ও তার দলের সদস্যরা একটি মুহূর্ত খুঁজছিলেন, যেখানে সহজেই জনসাধারণের সাড়া পাওয়া যাবে।
এই মুহূর্তটি আসে সেপ্টেম্বরে। ৫ তারিখে মুক্তি পায় বিজয়ের ‘গ্রেটেস্ট অব অলটাইম’ সিনেমা। আর ২৫ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ুর কেন্দ্রস্থল ত্রিচিতে হয় সমাবেশ। মূলত, সিনেমা মুক্তির পরপরই ওই সমাবেশের সময় নির্ধারণ করা হয়, যাতে চলচ্চিত্র নিয়ে উন্মাদনার মধ্যেই বিজয়ের রাজনীতে উপস্থিতির বিষয়টি আলোচনায় থাকে।
তামিল সুপারস্টার থালাপতি বিজয় রাজনীতির মাঠে সক্রিয়ভাবে আলোচনায় আসেন গত বছরের আগস্টে। ওই সময় তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ে এক বিশাল সমাবেশে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্বকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যা দেন।
আগস্টের মহাসমাবেশে থালাপতি বিজয়ের ভাষণেও উঠে আসে এমন সংলাপ। বিজেপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘জঙ্গলে অনেক শিয়াল থাকে, কিন্তু সিংহ থাকে মাত্র একটি। সিংহ জানে কি করে টিকে থাকতে হয়।’
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবেই তখন তিনি মাঠে সক্রিয় ছিলেন। এর মধ্যেই কারুরে তার এক সমাবেশে ভয়াবহ পদদলনের ঘটনায় ৪১ জনের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পরিস্থিতি ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হলেও বিজয়ের অবস্থান নিয়ে তখন নানা প্রশ্ন ওঠে।
ধারণা করা হচ্ছে, তামিলনাড়ুর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ী হলে দক্ষিণী সুপারস্টার বিজয় থালাপতি এমন এক ইতিহাস গড়বেন, যা গত ৪৯ বছরে আর কোনো চলচ্চিত্র তারকা করতে পারেননি। এম জি রামাচন্দ্রনের (এমজিআর) পর তিনিই হবেন অভিনেতা থেকে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া প্রথম ব্যক্তি।
এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজের রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দিয়ে বিজয় জানিয়েছিলেন, রাজনীতি তার কাছে কোনো শখ বা পার্ট-টাইম কাজ নয়। মানুষের সেবা করাই তার মূল লক্ষ্য এবং তামিলনাড়ুর জনগণের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্কই তাকে এই পথে এনেছে।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 






















