প্রকাশিত সময় :
০৬:৫১:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬
১১
মহানবী (সা.)-এর প্রতিভাবান সাহাবিদের অন্যতম একজন আব্দুল্লাহ (রা.)। তাঁর উপনাম ছিল, আবু আব্দুর রহমান। পিতা মাসউদ ইবনে গাফিল। মক্কার ‘বনু হুযাইল’ গোত্রের সন্তান। তাই তাঁকে ‘আল-হুযালি’ বলা হয়। তাঁর মা উম্মে আব্দ বিনতে আব্দে উদ্দ। বনু হুযাইলের কন্যা। মায়ের দিকে সম্বন্ধ করে লোকজন তাঁকে ইবনে উম্মে আব্দ বলে ডাকত। দৈহিক গঠন-কাঠামোতে ছিলেন তিনি অস্বাভাবিক খাট। সুবিজ্ঞ ক্বারী, ফক্বীহ ও মুহাদ্দিস সাহাবি। (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা ৩/১১১পৃ., ক্র.৪১; উসদুল গাবাহ : ৩/২৮১পৃ., ক্র.৩১৭৭; সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/২৮০, ২৮১পৃ., ক্র.৯২)
কৈশোরেই ইসলামগ্রহণ ও তার চমৎকার কাহিনী
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) যৌবনে পদার্পণের পূর্বে কৈশোরে ‘উক্ববা ইবনে আবু মু‘আইত -এর ছাগলপালের রাখালি করতেন। মক্কার নির্জন গিরিপথে একবার ছাগল চরানো অবস্থায় রাসুল (সা.) ও আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হয়। তাঁরা দু’জন এ সময় মুশরিকদের উত্পীড়ন ও নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য মক্কার গিরিপথে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা ছিলেন পরিশ্রান্ত পিপাসার্ত। তাই কিশোর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদকে বললেন, তোমার ছাগলগুলো থেকে কিছু দুধ দুহন করে আমাদেরকে পান করাও।
বালক বলল, এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ ছাগলগুলোর মালিক আমি নই; আমি এগুলোর রাখাল মাত্র। এরপর তাঁরা বললেন, তাহলে এমন একটি ছাগী দাও, যা এখনো পাঠার সংস্পর্শে আসেনি। অর্থাত্ যার ওলানে দুধ আসার মতো সময় এখনো হয়নি। বালক একটি বাচ্চা ছাগী তাঁদের সামনে উপস্থিত করল। তখন রাসুল (সা.) বিসমিল্লাহ পড়ে ছাগীর ওলান মলতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ছাগীর ওলান ফুলে গেল এবং দুধে ভরে গেল। অতপর প্রচুর পরিমাণে দুধ বের হতে লাগল। আবু বকর (রা.) পেয়ালার মতো একটি পাথর কুড়িয়ে নিয়ে তাতে দুধ ভরে নিলেন। অতপর তাঁরা তৃপ্তি সহকারে পান করলেন এবং বালককেও পান করালেন। এরপর প্রিয় নবী ছাগীর ওলানকে লক্ষ করে বললেন, সঙ্কুচিত হয়ে যাও। সাথে সাতে ওলান সঙ্কুচিত হয়ে গেল।
বালক আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) অবাক দৃষ্টিতে এসব প্রত্যক্ষ করলেন। এরপর তিনি প্রিয় নবী (সা.)-কে বললেন, আপনার উচ্চারিত কথাগুলো আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন, তুমি তো শিক্ষাপ্রাপ্ত বালক। এর কিছু দিন পর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তখনো রাসুল (সা.) দারুল আরক্বামে অবস্থান নেননি। ইবনে হাজার আল-ইসাবাহ গ্রন্থে (৪/২০০পৃ., ক্র.৪৯৭০) বলেন, আবু নু‘আইমের মতে তিনি ৬ষ্ঠ মুসলমান। (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ২/১১১—১১২পৃ.; উসদুল গাবাহ : ৩/১৮১পৃ.; আল-ইসতিআব ৩/৮৮৭—৯৮৮পৃ., ক্র.১৬৫৯; সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/২৮৩পৃ.)
মক্কার কাফিরদের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন-পাঠ
উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রা.)-ই সৌভাগ্যবান প্রথম ব্যক্তি, যিনি মক্কার ভূমিতে সর্বপ্রথম কাফিরদেরকে শুনানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেছেন। তাঁর এমন তিলাওয়াত মুশরিকদের সহ্য হয়নি। একদিন তিনি কুরাইশদেরকে শুনানোর উদ্দেশ্যে মক্বামে ইবরাহিমের পাশে দাঁড়িয়ে তিলাওয়াত শুরু করলেন। কাফিররা তাঁকে ধরে বেদম প্রহার করল। তিনি রক্তাক্ত হয়ে গেলেন। (উসদুল গাবাহ : ৩/২৮২পৃ.)
হিজরত : ইসলামগ্রহণের পর তিনি বিভিন্নভাবে কাফিরদের নির্যতনের শিকার হলেন। এক পর্যায়ে দ্বীন ও ঈমান রক্ষার স্বার্থে একে একে দুইবার হাবশায় এবং তৃতীয় পর্যায়ে মদিনায় হিজরত করেন।
শিক্ষা : শিক্ষা লাভ করেন সরাসরি নবীজী থেকে। সাহাবিদের মধ্যে যাঁরা কোরআনের সবচেয়ে ভালো পাঠক, তার ভাব ও অর্থের সবচেয়ে বেশি প্রাজ্ঞ এবং বিধি-বিধানের সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ, তিনি তাঁদেরই একজন। তিনি সরাসরি রাসুল (সা.)-এর পবিত্র যবান মোবারক থেকে ৭০টি সুরা শিক্ষা লাভ করেন। (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ৩/১১৩পৃ.; সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/২৮৬—২৮৭, ২৮৯, ২৯১পৃ.; উসদুল গাবাহ : ৩/২৮২পৃ.; মিশকাত [আসমাউর রিজাল] ৬০৫পৃ.)
যুদ্ধ-জিহাদ : তিনি বদর, উহুদ, খন্দক, বাইআতে রিজওয়ান-সহ সকল যুদ্ধ ও অভিযানে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে শরিক ছিলেন। বদর যুদ্ধে আবুজাহলকে ধরাশায়ী করার ক্ষেত্রে তাঁরও ভূমিকা ছিল। রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইয়ারমূকের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। রাসুল (সা.) তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ৩/১১৩পৃ.; উসদুল গাবাহ : ৩/২৮২পৃ.)
হাদিস : আল্লামা যাহাবি (রহ.)-এর বর্ণনামতে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে ৮৪০টি হাদীস বর্ণিত আছে। বুখারী-মুসলিম যৌথভাবে ৬৪টি এবং এককভাবে বুখারি ২১টি ও মুসলিম ৩৫টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন অনেক সাহাবি ও তাবেয়ি। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/২৮১পৃ.)
ইন্তেকাল : তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর খেলাফতামলে ৩২ হিজরি সনে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং রাতের বেলা জান্নাতুল বাকী’তে তাঁকে দাফন করা হয়। (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ৩/১১৮পৃ., ক্র.৪১; উসদুল গাবাহ : ৩/২৮৬পৃ., ক্র.৩১৭৭; আল-ইসতি‘আব ৩/৯৯৩—৩৯৪পৃ., ক্র.১৬৫৯; মিশকাত [আসমাউর রিজাল] ৬০৫পৃ.)