সিঙ্গাপুরের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক প্রাইভেট লিমিটেড’ শুরুতে ফিফার কাছ থেকে এ সম্প্রচারস্বত্ব কিনে নিয়েছিল। তারা বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর কাছে ১৫১ কোটি টাকায় বিক্রির প্রস্তাব দেয়। কর, ভ্যাটসহ যার মোট মূল্য দাঁড়াত প্রায় ২০০ কোটি টাকা। চড়া মূল্যের কারণে কোনো চ্যানেল এটি কিনতে রাজি হয়নি। এ সময় বাংলাদেশ বিশ্বকাপ দেখাতে পারবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সরকার জনগণের বিপুল অর্থ এভাবে অপচয় না করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ যখন স্প্রিংবকের কাছ থেকে বিশ্বকাপ সম্প্রচার কিনতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দেয়, তখন প্রতিষ্ঠানটি বাধ্য হয়ে খেলার স্বত্ব ফিফাকে ফেরত দেয়।
এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাফুফে সভাপতি ও তথ্য মন্ত্রণালয় সরাসরি ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং গতবারের চেয়েও কম দামে বিশ্বকাপ সম্প্রচার করার স্বত্ব কিনে নেয়। বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্বকাপ দেখাতে মোট খরচ হচ্ছে ৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের বারের চেয়ে এবার খরচ কমেছে ২৫ কোটি টাকা। অথচ এবার বিশ্বকাপের সম্প্রচার খরচ সবচেয়ে বেশি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ সম্প্রচারের নামে এ দেশে রীতিমতো লুটপাট হয়েছিল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখানো নিয়ে জটিল অবস্থা তৈরি হয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ওই বছর খেলা দেখানোর সম্প্রচারস্বত্ব কিনেছিল তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এজন্য তমা কনস্ট্রাকশনকে দিতে হয় ৯৮ কোটি টাকা। যাদের এ ধরনের কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়া তমা কনস্ট্রাকশনের কাছ থেকে যাতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) এ প্রচারস্বত্ব কেনা যায়, এ-বিষয়ক প্রস্তাবে তখন নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। আওয়ামী লীগ আমলে ঠিকাদারি কাজ বেশি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি তমা কনস্ট্রাকশন। তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন (নোয়াখালী-২)। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন। তিনি নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। এটাই বিগত তিন মাসে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র পদক্ষেপ নয়। মশা নিধনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচ কর্মকর্তা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁদের এ বিদেশ সফরের অনুমোদন দেননি। মশা নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই, দেশেই সন্ধ্যার পর কোনো ডোবার পাশে অবস্থান করলে মশা নিধনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব বলে অভিমত দিয়েছেন তিনি। কেরানীগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে করার প্রস্তাব অনুমোদন করেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বরং তিনি মত দিয়েছেন, নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে নতুন নামকরণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর অফিসে দুপুরের খাবার ও বিকালের নাশতা মিলিয়ে মোট বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি ১৫০ টাকা, যা আগে ছিল এর ৫ গুণের বেশি। এমপিদের ১ কোটি টাকার থোক বরাদ্দের নামে লুটপাট বন্ধে প্রধানমন্ত্রী যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন থেকে সরাসরি এমপিদের কাছে থোক বরাদ্দের অর্থ যাবে না। তাঁরা তাঁদের এলাকায় কী কী উন্নয়নকাজ লাগবে তার তালিকা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাবেন। প্রধানমন্ত্রী চাহিদা নিরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কাজ করার নির্দেশ দেবেন। এর ফলে একদিকে যেমন দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ হবে, তেমন সারা দেশে পরিকল্পিত এবং সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। এ রকম উদাহরণ অনেক। বাংলাদেশে বিগত সময়ে উন্নয়নের নামে অপচয় এবং দুর্নীতি হয়েছে। দুর্নীতি বললেও কম বলা হবে, রীতিমতো লুটপাট হয়েছে। একেকটি প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়েছে লাগামহীনভাবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কয়েক গুণ খরচ বাড়ানো হয় শুধু দুর্নীতির জন্য। এভাবেই জনগণের অর্থ অপচয় হয়েছে। ইউনূস সরকারের আমলে এ দুর্নীতি বন্ধ হয়নি বরং আরও বাড়ে। বিদেশ সফরের নামে ইউনূস কোটি কোটি টাকার অপচয় করেছেন। এ সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ রীতিমতো হরিলুট হয়েছে। সম্প্রতি কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়া অভিযোগ করেছেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও হাসনাত আবদুল্লাহ তৎকালীন জেলা পরিষদের মাধ্যমে নিজেদের দুই উপজেলায় ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে তাঁর জেলার অন্য ১২ উপজেলার সঙ্গে বৈষম্য করেছেন। উল্লিখিত তহবিলের টাকা ছাড়াও তাঁরা দুজন তাঁদের এলাকার বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আরও অনেক বড় বড় বরাদ্দ এনেছেন বলে দাবি করেছেন মোস্তাক মিয়া। এভাবেই বিগত বছরগুলোতে দুর্নীতি ও অপচয় হয়েছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। শুধু নীতি গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হননি, নজির স্থাপন করে তিনি সবাইকে দুর্নীতিমুক্ত থাকার বার্তা দিচ্ছেন। দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ হলে দেশের অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে বটে, কিন্তু অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে হলে দেশের বেসরকারি খাতকে বাঁচাতে হবে। ইউনূস সরকারের দেড় বছরে বেসরকারি খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বেসরকারি খাত ধ্বংসের মিশনে নেমেছিলেন ইউনূস এবং তাঁর বাহিনী। বাংলাদেশের বেসরকারি খাত এখন মনোবলহীন, হতাশ। তারা হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। অনেকেই উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত। ২০০৭ সালে এক-এগারোর সময় যেভাবে বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল ফখরুদ্দীন-মইন সরকার, শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তালিকা প্রকাশ করে বেসরকারি খাতকে বিকলাঙ্গে পরিণত করেছিল। সেই একই ধারায় ইউনূস সরকার এক-এগারোর অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার মিশনে নেমেছিল। ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ, বিদেশভ্রমণে বাধা দিয়ে ইউনূস সরকার বেসরকারি খাতে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কলকারখানায় মব সন্ত্রাস, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নির্বিচার হামলা, অগ্নিসংযোগ করে দেশের অর্থনীতি কুড়ি বছর পিছিয়ে দিয়েছে ইউনূস সরকার। ইউনূস আমলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বেসরকারি উদ্যোক্তারা কাজকর্ম বন্ধ করে দেন। অর্থ পাচারের অসত্য গল্প বানিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল করা হয় বহু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, ১১ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের কল্পিত অভিযোগ এনে নজিরবিহীন হয়রানি। কীসের ভিত্তিতে কোনোরকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই এই ১১ প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হলো? কেন তাদের সীমাহীন হয়রানি করা হলো? এর ফলে দেশের সব বড় ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তার মধ্যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
গত দেড় বছর সোশ্যাল মিডিয়া যেন সমান্তরাল সরকার চালাচ্ছে। তারা বিভিন্নভাবে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অবিরাম অপপ্রচারে লিপ্ত। এদের কুৎসিত আক্রমণের শিকার হয়ে অনেকেই নিজেদের কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়া এখন সরকারের জন্য হুমকি। তারা যা খুশি বলছে। মানুষের চরিত্রহননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ফেসবুক এবং ইউটিউবকে। এসব মাধ্যম ব্যবহার করে চলছে চাঁদাবাজি এবং ব্ল্যাকমেল। সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ না করলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতি হবে দেশের অর্থনীতির। শুধু অর্থনীতি নয়, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশ পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় এবং সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। আগামী বৃহস্পতিবার নতুন সরকার প্রথম বাজেট পেশ করবে। এখন দেশ বাঁচাতে, গণতন্ত্র রক্ষায় অর্থনীতি বাঁচাতে হবে। অর্থনীতি বাঁচাতে হলে দরকার বেসরকারি খাত সচল করা। এজন্য অবিলম্বে বেসরকারি খাতের ওপর ইউনূস আমলের সব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। সব বেসরকারি উদ্যোক্তাকে আস্থায় আনতে হবে। তাঁদের জন্য সৃষ্টি করতে হবে ভয়হীন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। ভয়-আতঙ্কের মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব নয়, সম্ভব নয় ব্যবসা পরিচালনা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে দেশের অর্থনীতি সচল হবে না।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























