প্রকাশিত সময় :
০৯:৩০:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
১২
আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের ধুলোবালি ওড়া রাস্তায় যে ছোট ছেলেটি পায়ে বল আঠার মতো লাগিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বোকা বানাত, সেদিনের সেই শারীরিক গঠনে দুর্বল বালকটিই যে একদিন বিশ্ব ফুটবলের পুরো ব্যাকরণ বদলে দেবে— তা হয়তো ফুটবল বিধাতা নিজেই লিখে রেখেছিলেন। আজ ২৪ জুন, ফুটবল ইতিহাসের সেই অবিসংবাদিত জাদুকর লিওনেল মেসির ৩৯তম জন্মদিন। যিনি গত দুই দশক ধরে বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছেন এক জীবন্ত মহাকাব্য।
মেসির এই অতিমানবীয় গল্পের শুরুটা কিন্তু মোটেও সহজ বা রাজকীয় ছিল না। শৈশবে শরীরে বাসা বাঁধা গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি যখন তাঁর আকাশছোঁয়া স্বপ্নকে প্রায় পিষে ফেলতে চেয়েছিল, ঠিক তখনই বার্সেলোনার একটি সাধারণ ন্যাপকিন পেপার হয়ে উঠেছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান দলিল। সেই ন্যাপকিন পেপারেই চুক্তির মাধ্যমে ক্যাম্প ন্যু-তে আগমন ঘটেছিল এই খুদে জাদুকরের। লম্বা চুলের, ১৯ নম্বর জার্সি পরা সেই তরুণ যখন রোনালদিনহোর পাস থেকে আলতো চিপে ক্যারিয়ারের প্রথম গোলটি করেছিলেন, তখন থেকেই শুরু হয়েছিল এক নতুন যুগের।
পরবর্তীতে পেপ গার্দিওলার অধীনে ‘ফলস নাইন’ পজিশনে খেলে ফুটবলকে এক নতুন ভাষা দিয়েছিলেন মেসি। একের পর এক ব্যালন ডি’অর আর ট্রফিতে যখন তাঁর শোকেস ভরে উঠছিল, তখন মনে হচ্ছিল ফুটবল বুঝি এই গ্রহের এক মহাতারকার পায়ের কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই অতিমানবীয় সাফল্যের মুদ্রার ওপিঠেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর নীল বেদনা। বার্সেলোনার নীল-বেগুনী জার্সিতে যিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য, দেশের আকাশী-নীল জার্সিতে তিনিই যেন বারবার পরিণত হচ্ছিলেন এক ট্রাজিক হিরোতে। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে মারাকানায় সেই সোনার ট্রফিটার পাশ দিয়ে মেসির শূন্য চোখে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য কিংবা ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে গিয়ে ২০১৬ সালে ডাগআউটে বসে তাঁর শিশুর মতো কান্না—স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো ফুটবল বিশ্বকে। নিজ দেশের মানুষের সমালোচনা সইতে না পেরে অভিমানে অবসরের ঘোষণাও দিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু মহাকাব্যের নায়ক তো এভাবে বিদায় নিতে পারেন না; ট্র্যাজেডি না থাকলে যে পুনরুত্থানের গল্পটা এত মধুর হতো না!
টানা ব্যর্থতার সেই মেঘ কেটে প্রথম সূর্যকিরণ দেখা দেয় ২০২১ সালে, ব্রাজিলের মাটিতে ব্রাজিলকে হারিয়েই কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে। তবে নিয়তি তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় মঞ্চটা সাজিয়ে রেখেছিল ২০২২ সালের কাতারে। ৩৫ বছর বয়সে এসে, কোটি মানুষের প্রত্যাশার পাহাড় কাঁধে নিয়ে লুসাইল স্টেডিয়ামে এক অবিশ্বাস্য ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লেখেন মেসি। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই জাদুকরী দূরপাল্লার শট, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য পাসিং জ্যামিতি, আর ফাইনালে এমবাপের ফ্রান্সের সাথে সেই শ্বাসরুদ্ধকর স্নায়ুযুদ্ধ—সবই এখন ইতিহাসের অংশ।
লুসাইল স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারে যখন শেষ শটটি জালের ভেতর জড়াল, মেসি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন মাঠের বুকে। কালো ‘বিশত’ পরে যখন তিনি অবশেষে সেই অধরা বিশ্বকাপ ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলেন, ফুটবল খেলাটা নিজেই যেন পূর্ণতা পেল তার দীর্ঘদিনের ঋণ থেকে।
ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে, ইন্টার মায়ামির জার্সিতে যখন মেসি এখন মাঠে নামেন, তখন আর কোনো চাপ নেই, কাউকে কিছু প্রমাণ করার তাগিদও নেই। এখন তিনি খেলেন স্রেফ আনন্দের জন্য, ফুটবলপ্রেমীদের রোমান্টিসিজমকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। ৮টি ব্যালন ডি’অর কিংবা অসংখ্য রেকর্ড—এসব তো শুধুই কিছু শুষ্ক সংখ্যা। মেসির আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তাঁর পায়ে বল পাওয়ার পর স্টেডিয়াম জুড়ে তৈরি হওয়া সেই অবিশ্বাস্য স্তব্ধতায়।
শুভ জন্মদিন, লিওনেল মেসি! আমাদের প্রজন্মে একটা আস্ত রূপকথাকে সত্যি করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।