শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে ঢল ও পাহাড়ধসে ৫ দিনে ৩৩ মৃত্যু

টানা ভারি বর্ষণে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বাড়ছে নদ-নদীর পানি। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে মৃত্যু বাড়ছে। পাহাড়, দেয়াল ধসে ও পানিতে ডুবে পাঁচ দিনে শুধু বৃহত্তর চট্টগ্রামেই ৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আর এই নিহতদের ১৫ জনই রোহিঙ্গা। গতকাল বৃহস্পতিবার বান্দরবানের লামায় পাহাড়ধসে একজন শিশুসহ দুই পরিবারের পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটে।

এ ছাড়া কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাহাড়ধসে দুজনের মৃত্যু হয়। রাঙামাটির সাজেকে দুই দিন আটকে থাকার পর ৫৬১ পর্যটকের মধ্যে সেনাবাহিনীর বিশেষ সহায়তায় ১৫০ জন পর্যটককে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এদিকে ভারি বর্ষণে জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে আছে খুলনাবাসী। প্রতিনিধিরা স্থানীয় সূত্রে জানিয়েছেন বিস্তারিত :

ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে : নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা আবহাওয়া অফিসের বরাত দিয়ে জানান, টানা কয়েক দিনের ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ পার্বত্য জেলা।

বন্যায় পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সারা দেশে ভারি বৃষ্টি আরো দুই দিন থাকতে পারে। আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় এবং লঘুচাপের প্রভাবে আগামী দু-এক দিন সারা দেশেই ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এই বৃষ্টির প্রভাবে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ভূমিধস হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সর্দার উদয় রায়হান  বলেন, দেশের অভ্যন্তরে টানা ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে।

বৃহত্তর চট্টগ্রামে দুঃসহ ভোগান্তি : চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, চট্টগ্রামে গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২১৪.৪ মিলিমিটার (মিমি) বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে ১০২০.৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে নগরের পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়। টানা বৃষ্টির কারণে গতকালও নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে স্থানীয় মানুষজন। বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। গতকাল পাহাড়ধসে ও পানিতে ডুবে কক্সবাজারের চকরিয়ায় তিন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। পাহাড়, দেয়াল ধসে ও পানিতে ডুবে গত পাঁচ দিনে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার জেলায় ২২ জন, চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় পাঁচজন, রাঙামাটি জেলায় একজন এবং বান্দরবান জেলায় পাঁচজন নিহত হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বোয়ালখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায় দুজন নিখোঁজ রয়েছে।

বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার কথা জানিয়েছে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন। চট্টগ্রাম নগরের যোলশহর ও জানালিহাটে রেলপথে হাঁটুপানির কারণে গত মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। গতকাল ভোর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ হাশিমপুর এলাকার কসাইপাড়া ও পাঠানীপুলের প্রধান সড়কে হাঁটুপানি জমেছে। এ কারণে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রেলপথে গতকাল আরো আটটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করেছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের মাস্টার আবু জাফর। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, দুটি রেলপথে তিন দিনে ১৮টি আন্ত নগর ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম মহানগরের সঙ্গে দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এবং উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজান উপজেলার সঙ্গে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। অনেকে ভ্যানে আবার কেউ কেউ পানি ভেঙে হেঁটে জলাবদ্ধ এলাকা পার হচ্ছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেরানীহাট থেকে বান্দরবান সড়কের বাজালিয়া বুড়ির দোকান এলাকায় দুই থেকে আড়াই ফুট পানি জমেছে। তিন দিন ধরে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

সাতকানিয়ার ৮০% এলাকা প্লাবিত : সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বানের জলে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে সাড়ে তিন লক্ষাধিক মানুষ। সেখানে বসতবাড়িতেও পানি ঢুকেছে। গতকাল ভোরে সাঙ্গু নদীতে লাকড়ি ধরতে গিয়ে নৌকা থেকে পড়ে আবদুল আলম নিখোঁজ হন। এদিকে চরতি এলাকায় জাল দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে পানিতে তলিয়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা, পৌরসভা ও আদালত প্রাঙ্গণে বন্যার পানি ঢুকেছে। ডলু নদীর রামপুর এলাকায় প্রায় ২০০ ফুট বাঁধ ভেঙে গেছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বুড়ির দোকান, বাজালিয়া অলি আহমেদ কলেজের সামনে এবং দস্তিদার হাট এলাকায় সড়কের দু-তিন ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, ১৭ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। চরতিতে মাছ ধরতে গিয়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে এবং কালিয়াইশের কাঠগড় এলাকায় লাকড়ি ধরার সময় নৌকা থেকে পড়ে গিয়ে এক যুবক নিখোঁজ হয়েছেন। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ২৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের অধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। জেলার প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোলরুম চালু রেখে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গতকাল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এসব তথ্য জানান।

প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ : চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জানান, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরো ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। প্রথম দফার বরাদ্দ এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে। নতুন বরাদ্দও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত বিতরণ করা হবে, যাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ খাদ্যসংকটে না পড়ে। উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারে সাতকানিয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোট প্রয়োজন বলে জানান জেলা প্রশাসক। চট্টগ্রাম জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড়, শিশুদের জন্য মাফিন, কেক, বিস্কুট, ওরস্যালাইন এবং পাঁচ লিটার করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জানান, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশে প্রায় আট হাজার মানুষ এরই মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো মানুষ যেন অভুক্ত না থাকে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়।

লামায় পাহাড়ধসে শিশুসহ নিহত ৫ : লামা-আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি জানান, গতকাল ভোর ৪টায় বান্দরবানের লামায় উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় পাহাড় ধসে মো. ইউনুছ ও জুয়েলের ঘরের ওপর পড়ে। ওই সময় মাটিচাপায় একটি শিশুসহ দুই পরিবারের পাঁচজন নিহত হয়। নিহতরা হলো মো. ইউনুছ (২৮), তাঁর স্ত্রী রানু আক্তার (২২) এবং তাঁদের চার বছরের শিশুসন্তান মো. সোলেমান, জুয়েল (২৭) এবং তাঁর স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৩)। একই ইউনিয়নের উত্তরপাড়ায় গত রাত দেড়টায় আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রেহানা বেগমের ঘরে পাহাড় ধসে পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ছাড়া উপজেলার আরো বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে কমপক্ষে পাঁচজন আহত হয়। এদিকে পাহাড়ি ঢলে লামা পৌর এলাকাসহ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আলীকদম-লামা-চকরিয়া সড়কের বিভিন্ন স্থান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। আলীকদমের সঙ্গে লামা ও চকরিয়ার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন জানান, পাহাড়ধসে নিহতের ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। চার দিন ধরে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

লামা পৌর এলাকার হলিচাইল্ড পাবলিক স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুল ও মাদরাসা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া লামা থানাসহ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর বন্যাকবলিত হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

চকরিয়ায় তিনজনের মৃত্যু : চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, বন্যার পানিতে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার সাত লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বন্ধ রয়েছে তিন উপজেলার তিন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। গতকাল ভোররাতে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোহছেনিয়া কাটার ডেবলতলীতে বসতবাড়ির ওপর পাহাড়ধসে চাচাতো ভাই-বোনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের একজন রুমি আক্তার (১৫)। সে মোহছেনিয়া কাটা গ্রামের মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে ও বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। নিহত অন্যজন মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। সে আবদুল মজিদের ছেলে ও স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। নিহতরা সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীন দেলোয়ার বরইতলীতে বসতবাড়ির ওপর পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহত দুই শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সরকারিভাবে দুই পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে।

এদিকে চকরিয়ায় ঢলের পানিতে পড়ে মৃত্যু হয়েছে আড়াই বছরের একটি শিশুর। গতকাল বিকেলে উপজেলার মাতামুহুরী নদীবিধৌত কাকারা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাইজ কাকারা গ্রামের সুলতান আহমদের বাড়ির ভেতর এই ঘটনা ঘটে। নিহত হয় আড়াই বছরের মোহাম্মদ ওয়াকিম।

ঢল ও পাহাড়ধসে ৫ দিনে ৩৩ মৃত্যু

রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে হাজার পরিবার পানিবন্দি : রাঙামাটি সংবাদদাতা জানান, রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে কাচালং নদীর পানি বেড়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বাঘাইছড়ি পৌর এলাকার মধ্যমপাড়া, মাস্টারপাড়া, মুসলিম ব্লক, হাজীপাড়া, এফ ব্লক, পূর্ব লাইল্যাঘোনা এলাকা পুরোটাই পানিতে ডুবে গেছে। এ ছাড়া সাজেক, মারিশ্যা, বঙ্গলতলী, রূপকারী, খেদারমারা, বাঘাইছড়ি, সারোয়াতলী ও আমতলী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকালে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের সাপছড়িতে পাহাড়ধসের কারণে সড়কে যান চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকে।

সেনা সহায়তায় সাজেক ছেড়েছে দেড় শ পর্যটক : রাঙামাটির সাজেকে দুই দিন আটকে থাকার পর ৫৬১ পর্যটকের মধ্যে সেনাবাহিনীর বিশেষ সহায়তায় দেড় শ পর্যটককে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অন্য পর্যটকদের পরবর্তী সময়ে ফিরিয়ে আনা হবে। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান এ তথ্য জানিয়ে বলেন, সাজেকের সড়কে একাধিক স্থানে পানি ওঠার কারণে সব পর্যটক সাজেক ত্যাগ করতে পারেনি। অন্যদের আগামীকাল ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কের একাধিক স্থানে বন্যার পানির কারণে যান চলাচল বন্ধ থাকায় সব পর্যটক বের হতে পারেনি।

খাগড়াছড়িতে সড়ক তলিয়েছে : খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালা প্রতিনিধি জানান, খাগড়াছড়িতে মাইনী নদীর পানি আরো বেড়েছে। গতকাল সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি। সাজেকসহ রাঙামাটির সঙ্গে তিনটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। দীঘিনালা উপজেলার কবাখালি, বাচামেরুং, ছোটমেরুং বাজার এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা-সাজেক সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানান, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি এড়াতে ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠার আহবান জানানো হয়েছে।

সিলেটে নদ-নদীর পানি বাড়ছে : সিলেট থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, টানা বর্ষণ এবং ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। সিলেটেও পাহাড় ও টিলা ধসের শঙ্কা বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। সিলেট জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনা খাবার মজুদ রাখা হয়েছে।

গতকাল দুপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন-চার দিন ভারতের মেঘালয়ে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। তাতে পাহাড়ি ঢলে সিলেটের নদ-নদীর পানির উচ্চতা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সীমান্তঘেঁষা নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, অমলশিদ, কানাইঘাটসহ কয়েকটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে এবং তা বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছতে পারে।

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ইসলামপুর, আদমপুর, আলীনগর ও মাধবপুর ইউনিয়নের ২০ থেকে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

খুলনা নগরীতে জলাবদ্ধতা : খুলনা অফিস জানায়, ভারি বর্ষণে খুলনা মহানগরীসহ আশপাশের এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি থেমে গেলেও গতকাল নগরীর বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাতে ভোগান্তিতে পড়ে স্থানীয় মানুষজন। গত বুধবার দুপুরে হালকা বৃষ্টি হলেও রাত দেড়টার পর তা বেড়ে যায়। ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে সড়ক ছাপিয়ে বৃষ্টির পানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক কার্যালয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকার বাসাবাড়িতে ঢোকে। গতকাল সকালে বিড়ম্বনায় পড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। দুপুরেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ছিল। নগরীর টুটপাড়া, নিরালা আবাসিক হাজী মেহের আলী রোড, দোলখোলা, নতুন বাজার, বাস্তুহারা কলোনি, মুজগুন্নী, বয়রা, দৌলতপুর, খালিশপুরের নিম্নাঞ্চল, শিপইয়ার্ড, লবণচরা, বাগমারাসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি বাসাবাড়িতে ঢোকে।

সোর্স: কালের কণ্ঠ

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

চট্টগ্রামে ঢল ও পাহাড়ধসে ৫ দিনে ৩৩ মৃত্যু

প্রকাশিত সময় : ১০:৫৮:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
টানা ভারি বর্ষণে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বাড়ছে নদ-নদীর পানি। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে মৃত্যু বাড়ছে। পাহাড়, দেয়াল ধসে ও পানিতে ডুবে পাঁচ দিনে শুধু বৃহত্তর চট্টগ্রামেই ৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আর এই নিহতদের ১৫ জনই রোহিঙ্গা। গতকাল বৃহস্পতিবার বান্দরবানের লামায় পাহাড়ধসে একজন শিশুসহ দুই পরিবারের পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটে।

এ ছাড়া কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাহাড়ধসে দুজনের মৃত্যু হয়। রাঙামাটির সাজেকে দুই দিন আটকে থাকার পর ৫৬১ পর্যটকের মধ্যে সেনাবাহিনীর বিশেষ সহায়তায় ১৫০ জন পর্যটককে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এদিকে ভারি বর্ষণে জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে আছে খুলনাবাসী। প্রতিনিধিরা স্থানীয় সূত্রে জানিয়েছেন বিস্তারিত :

ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে : নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা আবহাওয়া অফিসের বরাত দিয়ে জানান, টানা কয়েক দিনের ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ পার্বত্য জেলা।

বন্যায় পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সারা দেশে ভারি বৃষ্টি আরো দুই দিন থাকতে পারে। আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় এবং লঘুচাপের প্রভাবে আগামী দু-এক দিন সারা দেশেই ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এই বৃষ্টির প্রভাবে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ভূমিধস হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সর্দার উদয় রায়হান  বলেন, দেশের অভ্যন্তরে টানা ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে।

বৃহত্তর চট্টগ্রামে দুঃসহ ভোগান্তি : চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, চট্টগ্রামে গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২১৪.৪ মিলিমিটার (মিমি) বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পাঁচ দিনে চট্টগ্রামে ১০২০.৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে নগরের পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়। টানা বৃষ্টির কারণে গতকালও নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে স্থানীয় মানুষজন। বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। গতকাল পাহাড়ধসে ও পানিতে ডুবে কক্সবাজারের চকরিয়ায় তিন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। পাহাড়, দেয়াল ধসে ও পানিতে ডুবে গত পাঁচ দিনে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার জেলায় ২২ জন, চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় পাঁচজন, রাঙামাটি জেলায় একজন এবং বান্দরবান জেলায় পাঁচজন নিহত হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বোয়ালখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায় দুজন নিখোঁজ রয়েছে।

বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার কথা জানিয়েছে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন। চট্টগ্রাম নগরের যোলশহর ও জানালিহাটে রেলপথে হাঁটুপানির কারণে গত মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। গতকাল ভোর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ হাশিমপুর এলাকার কসাইপাড়া ও পাঠানীপুলের প্রধান সড়কে হাঁটুপানি জমেছে। এ কারণে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রেলপথে গতকাল আরো আটটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করেছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের মাস্টার আবু জাফর। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, দুটি রেলপথে তিন দিনে ১৮টি আন্ত নগর ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম মহানগরের সঙ্গে দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এবং উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজান উপজেলার সঙ্গে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। অনেকে ভ্যানে আবার কেউ কেউ পানি ভেঙে হেঁটে জলাবদ্ধ এলাকা পার হচ্ছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেরানীহাট থেকে বান্দরবান সড়কের বাজালিয়া বুড়ির দোকান এলাকায় দুই থেকে আড়াই ফুট পানি জমেছে। তিন দিন ধরে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

সাতকানিয়ার ৮০% এলাকা প্লাবিত : সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বানের জলে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে সাড়ে তিন লক্ষাধিক মানুষ। সেখানে বসতবাড়িতেও পানি ঢুকেছে। গতকাল ভোরে সাঙ্গু নদীতে লাকড়ি ধরতে গিয়ে নৌকা থেকে পড়ে আবদুল আলম নিখোঁজ হন। এদিকে চরতি এলাকায় জাল দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে পানিতে তলিয়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা, পৌরসভা ও আদালত প্রাঙ্গণে বন্যার পানি ঢুকেছে। ডলু নদীর রামপুর এলাকায় প্রায় ২০০ ফুট বাঁধ ভেঙে গেছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বুড়ির দোকান, বাজালিয়া অলি আহমেদ কলেজের সামনে এবং দস্তিদার হাট এলাকায় সড়কের দু-তিন ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, ১৭ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। চরতিতে মাছ ধরতে গিয়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে এবং কালিয়াইশের কাঠগড় এলাকায় লাকড়ি ধরার সময় নৌকা থেকে পড়ে গিয়ে এক যুবক নিখোঁজ হয়েছেন। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ২৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের অধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। জেলার প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোলরুম চালু রেখে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গতকাল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এসব তথ্য জানান।

প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ : চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জানান, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরো ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। প্রথম দফার বরাদ্দ এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে। নতুন বরাদ্দও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত বিতরণ করা হবে, যাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ খাদ্যসংকটে না পড়ে। উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারে সাতকানিয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোট প্রয়োজন বলে জানান জেলা প্রশাসক। চট্টগ্রাম জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড়, শিশুদের জন্য মাফিন, কেক, বিস্কুট, ওরস্যালাইন এবং পাঁচ লিটার করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জানান, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশে প্রায় আট হাজার মানুষ এরই মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো মানুষ যেন অভুক্ত না থাকে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়।

লামায় পাহাড়ধসে শিশুসহ নিহত ৫ : লামা-আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি জানান, গতকাল ভোর ৪টায় বান্দরবানের লামায় উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় পাহাড় ধসে মো. ইউনুছ ও জুয়েলের ঘরের ওপর পড়ে। ওই সময় মাটিচাপায় একটি শিশুসহ দুই পরিবারের পাঁচজন নিহত হয়। নিহতরা হলো মো. ইউনুছ (২৮), তাঁর স্ত্রী রানু আক্তার (২২) এবং তাঁদের চার বছরের শিশুসন্তান মো. সোলেমান, জুয়েল (২৭) এবং তাঁর স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৩)। একই ইউনিয়নের উত্তরপাড়ায় গত রাত দেড়টায় আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রেহানা বেগমের ঘরে পাহাড় ধসে পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ছাড়া উপজেলার আরো বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে কমপক্ষে পাঁচজন আহত হয়। এদিকে পাহাড়ি ঢলে লামা পৌর এলাকাসহ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আলীকদম-লামা-চকরিয়া সড়কের বিভিন্ন স্থান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। আলীকদমের সঙ্গে লামা ও চকরিয়ার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন জানান, পাহাড়ধসে নিহতের ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। চার দিন ধরে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

লামা পৌর এলাকার হলিচাইল্ড পাবলিক স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুল ও মাদরাসা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া লামা থানাসহ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর বন্যাকবলিত হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

চকরিয়ায় তিনজনের মৃত্যু : চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, বন্যার পানিতে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার সাত লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বন্ধ রয়েছে তিন উপজেলার তিন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। গতকাল ভোররাতে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোহছেনিয়া কাটার ডেবলতলীতে বসতবাড়ির ওপর পাহাড়ধসে চাচাতো ভাই-বোনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের একজন রুমি আক্তার (১৫)। সে মোহছেনিয়া কাটা গ্রামের মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে ও বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। নিহত অন্যজন মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। সে আবদুল মজিদের ছেলে ও স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। নিহতরা সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীন দেলোয়ার বরইতলীতে বসতবাড়ির ওপর পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহত দুই শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সরকারিভাবে দুই পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে।

এদিকে চকরিয়ায় ঢলের পানিতে পড়ে মৃত্যু হয়েছে আড়াই বছরের একটি শিশুর। গতকাল বিকেলে উপজেলার মাতামুহুরী নদীবিধৌত কাকারা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাইজ কাকারা গ্রামের সুলতান আহমদের বাড়ির ভেতর এই ঘটনা ঘটে। নিহত হয় আড়াই বছরের মোহাম্মদ ওয়াকিম।

ঢল ও পাহাড়ধসে ৫ দিনে ৩৩ মৃত্যু

রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে হাজার পরিবার পানিবন্দি : রাঙামাটি সংবাদদাতা জানান, রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে কাচালং নদীর পানি বেড়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বাঘাইছড়ি পৌর এলাকার মধ্যমপাড়া, মাস্টারপাড়া, মুসলিম ব্লক, হাজীপাড়া, এফ ব্লক, পূর্ব লাইল্যাঘোনা এলাকা পুরোটাই পানিতে ডুবে গেছে। এ ছাড়া সাজেক, মারিশ্যা, বঙ্গলতলী, রূপকারী, খেদারমারা, বাঘাইছড়ি, সারোয়াতলী ও আমতলী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকালে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের সাপছড়িতে পাহাড়ধসের কারণে সড়কে যান চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকে।

সেনা সহায়তায় সাজেক ছেড়েছে দেড় শ পর্যটক : রাঙামাটির সাজেকে দুই দিন আটকে থাকার পর ৫৬১ পর্যটকের মধ্যে সেনাবাহিনীর বিশেষ সহায়তায় দেড় শ পর্যটককে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অন্য পর্যটকদের পরবর্তী সময়ে ফিরিয়ে আনা হবে। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান এ তথ্য জানিয়ে বলেন, সাজেকের সড়কে একাধিক স্থানে পানি ওঠার কারণে সব পর্যটক সাজেক ত্যাগ করতে পারেনি। অন্যদের আগামীকাল ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কের একাধিক স্থানে বন্যার পানির কারণে যান চলাচল বন্ধ থাকায় সব পর্যটক বের হতে পারেনি।

খাগড়াছড়িতে সড়ক তলিয়েছে : খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালা প্রতিনিধি জানান, খাগড়াছড়িতে মাইনী নদীর পানি আরো বেড়েছে। গতকাল সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি। সাজেকসহ রাঙামাটির সঙ্গে তিনটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। দীঘিনালা উপজেলার কবাখালি, বাচামেরুং, ছোটমেরুং বাজার এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা-সাজেক সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানান, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি এড়াতে ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠার আহবান জানানো হয়েছে।

সিলেটে নদ-নদীর পানি বাড়ছে : সিলেট থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, টানা বর্ষণ এবং ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। সিলেটেও পাহাড় ও টিলা ধসের শঙ্কা বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। সিলেট জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনা খাবার মজুদ রাখা হয়েছে।

গতকাল দুপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন-চার দিন ভারতের মেঘালয়ে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। তাতে পাহাড়ি ঢলে সিলেটের নদ-নদীর পানির উচ্চতা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সীমান্তঘেঁষা নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, অমলশিদ, কানাইঘাটসহ কয়েকটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে এবং তা বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছতে পারে।

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ইসলামপুর, আদমপুর, আলীনগর ও মাধবপুর ইউনিয়নের ২০ থেকে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

খুলনা নগরীতে জলাবদ্ধতা : খুলনা অফিস জানায়, ভারি বর্ষণে খুলনা মহানগরীসহ আশপাশের এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি থেমে গেলেও গতকাল নগরীর বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাতে ভোগান্তিতে পড়ে স্থানীয় মানুষজন। গত বুধবার দুপুরে হালকা বৃষ্টি হলেও রাত দেড়টার পর তা বেড়ে যায়। ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে সড়ক ছাপিয়ে বৃষ্টির পানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক কার্যালয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকার বাসাবাড়িতে ঢোকে। গতকাল সকালে বিড়ম্বনায় পড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। দুপুরেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ছিল। নগরীর টুটপাড়া, নিরালা আবাসিক হাজী মেহের আলী রোড, দোলখোলা, নতুন বাজার, বাস্তুহারা কলোনি, মুজগুন্নী, বয়রা, দৌলতপুর, খালিশপুরের নিম্নাঞ্চল, শিপইয়ার্ড, লবণচরা, বাগমারাসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি বাসাবাড়িতে ঢোকে।

সোর্স: কালের কণ্ঠ