সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনের খসড়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেসে) পাঠানো হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় মুদ্রণ ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তা পরবর্তী ধাপে যাবে।
এর আগে বৃহস্পতিবারের মধ্যে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। পরে আগামী রোববার প্রজ্ঞাপন জারির নতুন সময়সীমা জানানো হয়।
এদিকে অর্থসচিব জানিয়েছেন, ৬ সেপ্টেম্বরই নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। ফলে এখন নজর রয়েছে বিজি প্রেস ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর শেষ মুহূর্তের কার্যক্রমের দিকে।
নতুন বেতন কাঠামোকে সাধুবাদ জানিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন এই বেতন কাঠামো আরো আগে হওয়া দরকার ছিল। তবে এটার জন্য বেসরকারি খাতে এক ধরনের চাপ তৈরি হবে।
মূল্যস্ফীতির চাপ আমলে নিয়ে বেসরকারি খাতের সবখানে, এমনকি সংবাদমাধ্যমেও নতুন বেতন কাঠামো হওয়া দরকার। আবার সরকারি খাতে অপ্রয়োজনীয় লোকবল কমিয়েও আনা যেতে পারে। এতে সরকারের ব্যয় কমবে।
নতুন কাঠামোয় সবচেয়ে বড় সুবিধা পাচ্ছেন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বাড়ছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাতও কমিয়ে আনা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বর্তমানে এই অনুপাত ১:১.৯৪৫ থাকলেও নতুন স্কেলে তা ১:১.৭৮ করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, এতে বেতন কাঠামোয় ন্যায্যতা ও ভারসাম্য বাড়বে।
কোন গ্রেডে কত বেতন
প্রথম গ্রেডের ৭৮ হাজার টাকার বেতন নতুন স্কেলে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। দ্বিতীয় গ্রেডে ৬৬ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। তৃতীয় গ্রেডে ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এছাড়া চতুর্থ গ্রেডে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৪৩ হাজার থেকে ৮৬ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭১ হাজার টাকা, সপ্তম গ্রেডে ২৯ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা, অষ্টম গ্রেডে ২৩ হাজার থেকে ৪৬ হাজার টাকা এবং নবম গ্রেডে ২২ হাজার থেকে ৪৪ হাজার টাকা করা হয়েছে।
দশম গ্রেডে বর্তমান ১৬ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। এ দুই গ্রেডেও বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ। এর পরের গ্রেডগুলোতে বেতন বৃদ্ধির হার আরও বেশি। ১২তম গ্রেডে বর্তমান ১১ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, যা প্রায় ১১৫ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার টাকা, বৃদ্ধির হার ১১৮ শতাংশ। ১৪তম গ্রেডে ১১ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার টাকা, অর্থাৎ ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, যা ১৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি।
১৬তম গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৯০০ টাকা। এ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার ১৩৫ শতাংশ। ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৪০০ টাকা, অর্থাৎ ১৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৮তম গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার টাকা। এতে বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১৩৯ শতাংশ। ১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ টাকা, অর্থাৎ ১৪১ শতাংশ বৃদ্ধি। সবশেষে ২০তম গ্রেডে বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। এ গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ।
অর্থাৎ নতুন বেতন স্কেলে উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন দ্বিগুণ হলেও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছেন।
পেনশন বাড়বে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ
শুধু চাকরিজীবী নন, অবসরভোগীদের জন্যও বড় সুখবর এসেছে। কম পেনশন পাওয়া অবসরভোগীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে। মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনধারীদের ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়বে। ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন।
২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সামরিক ও অসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) চালুর সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। তবে একসঙ্গে এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন এবং অসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের আগে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য না থাকায় তা এখনই পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। তাই সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ওআরওপি বাস্তবায়ন করবে। এর আগ পর্যন্ত স্ল্যাবভিত্তিক পেনশন বাড়িয়ে অবসরভোগীদের স্বস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা
ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এতদিন শুধু পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা এ সুবিধা পেতেন। এখন সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ‘প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন সরকারি কর্মচারীরা।
বছরে অতিরিক্ত ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের আর্থিক চাপও কম নয়। বেতন, ভাতা, পেনশনসহ বিভিন্ন সুবিধার কারণে অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সরকারের দাবি, মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে।
সুবিধার আওতায় ৩৩ লাখ মানুষ
নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ সরাসরি এ সুবিধার আওতায় আসবেন।
বাড়বে কর্মোদ্দীপনা
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি বলেন, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়াবে বলে মনে করে সরকার। এর মাধ্যমে দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসেও আলাদা স্কেল
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। এটিও নতুন বেতন স্কেলের মতো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। নতুন বেতন স্কেল কার্যকর করতে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে।
মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর কৌশল
সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বেতন বাড়ানোর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে বাজারে ভোগব্যয় বাড়বে। একই সময়ে উৎপাদন ও সরবরাহ যদি সেই হারে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
এদিকে অর্থবিভাগের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়েছে, ধাপে ধাপে বেতন স্কেল বাস্তবায়নের অন্যতম লক্ষ্য জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো। অন্যদিকে নতুন বেতন কাঠামোর মাধ্যমে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার মান কিছুটা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।

রিপোর্টারের নাম 

























