দেশে ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যতগুলো সংসদ নির্বাচন হয়েছে, তাতে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে আওয়ামী লীগ; ৪৮ শতাংশ। এর পরেই আছে বিএনপি। আর কোনো নির্বাচনেই সাত শতাংশের বেশি ভোট পায়নি বর্তমান সংসদের বিরোধী দল- জাতীয় পার্টি (জাপা)। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও জাপার বাইরে এবারের নির্বাচনে যে ২৬টি দল রয়েছে, তাদের কেউই কোনো নির্বাচনে এক শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। সংসদ নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯৯০ সাল থেকে আওয়ামী লীগের ভোটের হার বেড়েছে। কিছুটা কমেছে বিএনপির ভোট। তবে ভোটে যত দলই অংশগ্রহণ করুক কিংবা যে দলই সরকার গঠন করুক, সব নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যেই।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে পাঁচটি সাধারণ নির্বাচন হয়। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৭৫টি দল। ৩০০ আসনে প্রার্থী ছিলেন ২৭৮৭ জন। এদের মধ্যে ৪২৪ জন ছিলেন স্বতন্ত্র। সবচেয়ে বেশি আসন পায় বিএনপি; ১৪০টি। আওয়ামী লীগ পায় ৮৮টি। ভোট পড়ে ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বিএনপি ভোট পায় ৩০ দমমিক ৮১ শতাংশ; আওয়ামী লীগ পায় ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ। ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট নিয়ে ১৮টি আসনে জয় পায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম। জাতীয় পার্টি পায় ৩৫টি আসন। তাদের বাক্সে ভোট পড়ে ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ। ১ দশমিক ৮১ শতাংশ ভোট পেয়ে পাঁচটি আসনে জয় পায় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ। ১ দশমিক ২২ শতাংশ ভোট পাওয়া জাকের পার্টি কোনো আসন জয় পায়নি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি পায় পাঁচটি আসন, তাদের বাক্সে ভোট পড়ে ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। ইসলামী ঐক্যজোট আসন পায় একটি; ভোট ছিল দশমিক ৭৯ শতাংশ। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মুজাফফর) আসন একটি; ভোট পায় দশমিক ৭৬ শতাংশ।
ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এতে ৪২টি দলের প্রার্থী ছিলেন ১৪৫০ জন। ভোট পড়ে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আওয়ামী লীগসহ
অনেকে অংশগ্রহণ না করায় চার দিনের এ সংসদে বিরোধী দল ছিল না। এ নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪৮টি), স্বতন্ত্র ১০টি ও ফ্রিডম পার্টি একটি আসনে জয় পায়।
সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। এতে অংশগ্রহণ করে ৮১টি দল। ৩০০ আসনে প্রার্থী ছিলেন ২৫৭৪ জন। এদের মধ্যে ২৮১ জন ছিলেন স্বতন্ত্র। ৩০ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪৬টি আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। বিএনপি বিজয়ী হয় ১১৬টি আসনে; ভোট পায় ৩৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। জাতীয় পার্টি পায় ৩২টি আসন। তাদের বাক্সে ভোট পড়ে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পায় তিনটি আসন; তাদের প্রতীকে ভোট পড়ে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। ইসলামী ঐক্যজোট একটি আসন পায়। তাদের পক্ষে ভোট পড়ে ১ দশমিক ০৯ শতাংশ। দশমিক ২৩ শতাংশ ভোট পাওয়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (রব) জয় পায় একটি আসনে।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর। অংশগ্রহণ করে ৫৪টি দল। ৩০০ আসনে প্রার্থী ছিলেন ১৯৩৫ জন। স্বতন্ত্র ছিলেন ৪৮৪ জন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ৬২টি আসন। নৌকায় ভোট পড়ে ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ। বিএনপি ১৯৩টি আসনে জয়লাভ করে, তাদের বাক্সে ভোট পড়ে ৪০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি আসন পায়, ভোট ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১৭টি আসন পায়; তাদের ভোট ছিল ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ৪টি আসনে বিজয়ী হয়, ভোট ছিল ১ দশমিক ১২ শতাংশ। ইসলামী ঐক্যজোট ২টি আসনে জয় পায়, ভোট ছিল দশমিক ৬৮ শতাংশ। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একটি আসন পায়, ভোট পড়ে দশমিক ৪৭ শতাংশ।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয়লাভ করে। তাদের বাক্সে ভোট পড়ে ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ২৭টি আসনে জয় পায়, ভোট ছিল ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ পায় তিনটি আসন, ভোট ছিল দশমিক ৭২ শতাংশ। দশমিক ২৭ শতাংশ ভোট পাওয়া এলডিপি জয় পায় একটি আসনে। ওয়ার্কার্স পার্টি ২টি আসন পায়, ভোট ছিল দশমিক ৩৭ শতাশং। বিএনপি ৩০টি আসন পায়। তাদের বাক্সে ভোট পড়ে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দুটি আসন পায়, ভোট ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি একটি আসন পায়, ভোট ছিল দশমিক ২৫ শতাংশ।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। স্বতন্ত্রসহ ১৭টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ৩০০টির মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ ২৩৪টি আসনে জয়লাভ করে। ভোট পায় ৭২ দশমিক ১৪ শতাংশ। জাতীয় পার্টি ৩৪টি আসনে জয়লাভ করে ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি জেতে ছয়টি আসন, ভোট ছিল ২ দশমিক ১ শতাংশ। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ ৫টি আসন পায়, ভোট পায় ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন পায় ২টি আসন; ভোট পায় ১ দশমিক ০৪ শতাংশ। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) দুটি আসন পায়, ভোট ছিল দশমিক ৭৩ শতাংশ। স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় পান ১৬টি আসনে, ভোট পান ১৫ দশমিক ০৬ শতাংশ।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট এবং বিএনপির নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টসহ ৩৯টি দল অংশগ্রহণ করে। ১৮৪৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১২৮ জন ছিলেন স্বতন্ত্র। আওয়ামী লীগ পায় ২৩৪ আসন। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) পায় ৩৪টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬টি, জাসদ ৫, জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) ২টি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ২টি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ১টি আসন পায়।
বর্তমানে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪৪। এর মধ্যে এবারের সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো ভোট বর্জন করলেও ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। বিএনপি না থাকায় এবার ৩০ শতাংশ ভোটার ভোট থেকে বিরত থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

রিপোর্টারের নাম 

























