শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুকে টার্গেট করে ভাইরাল ইরানি ভিডিও, বিশ্বজুড়ে তোলপাড়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বর্ণনাগত লড়াইয়ে লেগো-স্টাইল অ্যানিমেশন ব্যবহার করে ভাইরাল ভিডিও তৈরি করছে ইরানের একাধিক কনটেন্ট নির্মাতা দল। বিশ্লেষকদের মতে, কম খরচে তৈরি হলেও এসব ভিডিওর মান উচ্চ এবং এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে সামনে এনে বিশ্বব্যাপী দর্শকদের আকৃষ্ট করছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লেগো চরিত্রে একজন নেটিভ আমেরিকান প্রধান চাঁদের আলোয় একটি নির্জন প্রান্তরে প্রবেশ করছেন। এরপর দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে দেখানো হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিভিন্ন সময়ের শিকারদের—শৃঙ্খলাবদ্ধ কৃষ্ণাঙ্গ, ইরাকের আবু গারিব কারাগারের নির্যাতনের শিকার, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের যুদ্ধাহত মানুষদের।

ভিডিওতে আরও উল্লেখ করা হয় হিরোশিমা ও নাগাসাকি পারমাণবিক হামলা, ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ ভূপাতিত ঘটনা এবং গাজায় নিহত মার্কিন মানবাধিকারকর্মী র‍্যাচেল কোরির ঘটনাও। প্রতিটি ঘটনার স্মরণে ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যানার লাগাতে দেখা যায় ইরানি সৈন্যদের, যা শেষে নিক্ষেপ করা হয়। ভিডিওর শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিশাল মূর্তি ভেঙে পড়তে দেখা যায়, সঙ্গে লেখা—‘সবার প্রতিশোধ’।

গত ২৯ মার্চ প্রকাশিত এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় দেড় লাখ বার দেখা হয়েছে। এটি তৈরি করেছে তেহরানভিত্তিক কনটেন্ট গ্রুপ এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া, যাদের ইউটিউব চ্যানেল সম্প্রতি গুগলের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম থেকে ‘সহিংসতা প্রচারের’ অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সংগঠনটির দাবি, তাদের লেগো-স্টাইল অ্যানিমেশন মোটেও সহিংস নয়।

সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে সত্যকে চেপে রাখে, তা আমাদের জানা।’

প্রতীক ও বার্তা

ভিডিওগুলোতে ব্যবহৃত সবুজ ও লাল রঙের প্রতীকী অর্থও তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মতে, সবুজ প্রতিনিধিত্ব করে ইমাম হুসাইন-এর ন্যায়বিচারের সংগ্রামকে, আর লাল প্রতীক অত্যাচারীর।

কিছু ভিডিওতে ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে তার নিজের বক্তব্য ব্যবহার করা হয়, যেখানে তাকে ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া ও সাধারণ আমেরিকানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। ‘ব্যর্থ’ শিরোনামের একটি ভিডিওতে ট্রাম্পের ব্যবহৃত শব্দই উল্টো তার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে।

তরুণ নির্মাতা ও বিস্তার

এই ভিডিও তৈরির পেছনে রয়েছে ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১০ জনের একটি দল। তারা দাবি করেছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় কিছু গণমাধ্যম তাদের কনটেন্ট কিনলেও তারা স্বাধীনভাবেই কাজ করে।

শুধু এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া নয়, পার্সিয়াবয় ও সাউদার্ন পাঙ্ক-এর মতো অন্যান্য নির্মাতারাও একই ধাঁচের ভিডিও তৈরি করছে। এই প্রবণতা পাকিস্তানেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নুকতা মিডিয়ার মতো প্ল্যাটফর্মও একই ধরনের কনটেন্ট তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে

ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক ফাসি জাকা বলেন, ‘এই ভিডিওগুলো তথ্যযুদ্ধের অংশ, যেখানে পশ্চিমা গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে বর্ণনা তৈরি করেছে। লেগো ভিডিও সেই প্রভাব ভাঙছে।’

অন্যদিকে কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি-এর অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোন্স বলেন, ‘সামরিকভাবে না পারলেও জনমত নিজের পক্ষে আনাই ইরানের কৌশল। এই ধরনের প্রচারণা বর্তমান সময়ে কার্যকর।’

তার মতে, এসব ভিডিওতে শক্তিশালী বর্ণনা ও সূক্ষ্ম বার্তা রয়েছে, যা বৈশ্বিক দর্শকদের ওপর প্রভাব ফেলছে।

ভাইরাল ভিডিওগুলো দেখতে এই নিউজের লিংকে ক্লিক করুন

সূত্র: আল-জাজিরা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুকে টার্গেট করে ভাইরাল ইরানি ভিডিও, বিশ্বজুড়ে তোলপাড়

প্রকাশিত সময় : ০৯:০৮:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বর্ণনাগত লড়াইয়ে লেগো-স্টাইল অ্যানিমেশন ব্যবহার করে ভাইরাল ভিডিও তৈরি করছে ইরানের একাধিক কনটেন্ট নির্মাতা দল। বিশ্লেষকদের মতে, কম খরচে তৈরি হলেও এসব ভিডিওর মান উচ্চ এবং এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে সামনে এনে বিশ্বব্যাপী দর্শকদের আকৃষ্ট করছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লেগো চরিত্রে একজন নেটিভ আমেরিকান প্রধান চাঁদের আলোয় একটি নির্জন প্রান্তরে প্রবেশ করছেন। এরপর দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে দেখানো হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিভিন্ন সময়ের শিকারদের—শৃঙ্খলাবদ্ধ কৃষ্ণাঙ্গ, ইরাকের আবু গারিব কারাগারের নির্যাতনের শিকার, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের যুদ্ধাহত মানুষদের।

ভিডিওতে আরও উল্লেখ করা হয় হিরোশিমা ও নাগাসাকি পারমাণবিক হামলা, ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ ভূপাতিত ঘটনা এবং গাজায় নিহত মার্কিন মানবাধিকারকর্মী র‍্যাচেল কোরির ঘটনাও। প্রতিটি ঘটনার স্মরণে ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যানার লাগাতে দেখা যায় ইরানি সৈন্যদের, যা শেষে নিক্ষেপ করা হয়। ভিডিওর শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিশাল মূর্তি ভেঙে পড়তে দেখা যায়, সঙ্গে লেখা—‘সবার প্রতিশোধ’।

গত ২৯ মার্চ প্রকাশিত এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় দেড় লাখ বার দেখা হয়েছে। এটি তৈরি করেছে তেহরানভিত্তিক কনটেন্ট গ্রুপ এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া, যাদের ইউটিউব চ্যানেল সম্প্রতি গুগলের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম থেকে ‘সহিংসতা প্রচারের’ অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সংগঠনটির দাবি, তাদের লেগো-স্টাইল অ্যানিমেশন মোটেও সহিংস নয়।

সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে সত্যকে চেপে রাখে, তা আমাদের জানা।’

প্রতীক ও বার্তা

ভিডিওগুলোতে ব্যবহৃত সবুজ ও লাল রঙের প্রতীকী অর্থও তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মতে, সবুজ প্রতিনিধিত্ব করে ইমাম হুসাইন-এর ন্যায়বিচারের সংগ্রামকে, আর লাল প্রতীক অত্যাচারীর।

কিছু ভিডিওতে ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে তার নিজের বক্তব্য ব্যবহার করা হয়, যেখানে তাকে ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া ও সাধারণ আমেরিকানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। ‘ব্যর্থ’ শিরোনামের একটি ভিডিওতে ট্রাম্পের ব্যবহৃত শব্দই উল্টো তার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে।

তরুণ নির্মাতা ও বিস্তার

এই ভিডিও তৈরির পেছনে রয়েছে ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১০ জনের একটি দল। তারা দাবি করেছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় কিছু গণমাধ্যম তাদের কনটেন্ট কিনলেও তারা স্বাধীনভাবেই কাজ করে।

শুধু এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া নয়, পার্সিয়াবয় ও সাউদার্ন পাঙ্ক-এর মতো অন্যান্য নির্মাতারাও একই ধাঁচের ভিডিও তৈরি করছে। এই প্রবণতা পাকিস্তানেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নুকতা মিডিয়ার মতো প্ল্যাটফর্মও একই ধরনের কনটেন্ট তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে

ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক ফাসি জাকা বলেন, ‘এই ভিডিওগুলো তথ্যযুদ্ধের অংশ, যেখানে পশ্চিমা গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে বর্ণনা তৈরি করেছে। লেগো ভিডিও সেই প্রভাব ভাঙছে।’

অন্যদিকে কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি-এর অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোন্স বলেন, ‘সামরিকভাবে না পারলেও জনমত নিজের পক্ষে আনাই ইরানের কৌশল। এই ধরনের প্রচারণা বর্তমান সময়ে কার্যকর।’

তার মতে, এসব ভিডিওতে শক্তিশালী বর্ণনা ও সূক্ষ্ম বার্তা রয়েছে, যা বৈশ্বিক দর্শকদের ওপর প্রভাব ফেলছে।

ভাইরাল ভিডিওগুলো দেখতে এই নিউজের লিংকে ক্লিক করুন

সূত্র: আল-জাজিরা