শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (এমওইউ)-এ স্বাক্ষর করেছেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমঝোতা আনুষ্ঠানিক রূপ পেল বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও)।

চুক্তিপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষরও রয়েছে।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় শাহবাজ শরিফ বলেন, “ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ আজ ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট এতে স্বাক্ষর করেছেন এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমিও এতে অনুমোদন দিয়েছি।”

তিনি জানান, চুক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাতটি দ্রুত আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেয় এবং এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ে।

১৪ দফা সমঝোতা অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ে উভয় পক্ষ একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চালাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় প্রস্তুতকৃত দলিলে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ডিজিটাল স্বাক্ষর করেছেন।

চুক্তির পরও ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা চালাতে পারে। ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “তারা চুক্তি লঙ্ঘন করলে আমরা কঠোর জবাব দেব। তবে আমি চাই তারা চুক্তি মেনে চলুক।”

একই সময়ে ইরানের নেতারা চুক্তিটিকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উদযাপন করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরযুক্ত চুক্তির ছবি প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

চুক্তিকে স্বাগত জানালেন প্রেসিডেন্ট জারদারি

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ‘ইসলামাবাদ এমওইউ’ স্বাক্ষরকে অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এক বার্তায় তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের জন্য ব্যাপক দুর্ভোগ ডেকে আনে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জারদারি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এমন সংকট আর ফিরে আসবে না এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে মনোযোগ দেবে।

তিনি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।

পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর, রাশিয়া ও চীনের ভূমিকাও উল্লেখ করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদানের প্রশংসা করেন।

সুইজারল্যান্ডে শুরু হচ্ছে বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আলোচনা

সুইস সরকার জানিয়েছে, চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও কাতার অংশ নেবে। তবে বৈঠকের বিস্তারিত সময়সূচি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

১৪ দফা খসড়া প্রকাশ

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ ‘ইসলামাবাদ এমওইউ’-এর পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করেছে। এতে সামরিক সংঘাতের অবসান এবং একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছানোর রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো:
১। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এবং বর্তমান যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করবে। উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেবে না এবং শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে।

২। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।

৩। উভয় দেশ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালাবে। পারস্পরিক সম্মতিতে এ সময় বাড়ানো যেতে পারে।

৪। সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বাধা বা হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আশপাশের এলাকা থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করবে।

৫। ইরান সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার পদক্ষেপ নেবে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর ও মাইন অপসারণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে।

৬। যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে।

৭। যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর বর্তমান সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

৮। ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত চুক্তিতে সমাধান করা হবে।

৯। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করবে না।

১০। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরপরই এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবার রপ্তানির অনুমোদন দেবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতও থাকবে।

১১। আলোচনায় অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরানের স্থগিত বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত যেকোনো চূড়ান্ত অর্থপ্রদানে এসব অর্থ ব্যবহার করা যাবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও লাইসেন্স যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করবে।

১২। চূড়ান্ত চুক্তির সফল বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি তদারকির জন্য একটি বাস্তবায়ন কাঠামো গঠন করা হবে।

১৩। সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর এবং ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর উভয় দেশ বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।

১৪। চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত সময় : ১১:৪৯:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (এমওইউ)-এ স্বাক্ষর করেছেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমঝোতা আনুষ্ঠানিক রূপ পেল বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও)।

চুক্তিপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষরও রয়েছে।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় শাহবাজ শরিফ বলেন, “ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ আজ ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট এতে স্বাক্ষর করেছেন এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমিও এতে অনুমোদন দিয়েছি।”

তিনি জানান, চুক্তিটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাতটি দ্রুত আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেয় এবং এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ে।

১৪ দফা সমঝোতা অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ে উভয় পক্ষ একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চালাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় প্রস্তুতকৃত দলিলে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ডিজিটাল স্বাক্ষর করেছেন।

চুক্তির পরও ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা চালাতে পারে। ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “তারা চুক্তি লঙ্ঘন করলে আমরা কঠোর জবাব দেব। তবে আমি চাই তারা চুক্তি মেনে চলুক।”

একই সময়ে ইরানের নেতারা চুক্তিটিকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উদযাপন করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরযুক্ত চুক্তির ছবি প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

চুক্তিকে স্বাগত জানালেন প্রেসিডেন্ট জারদারি

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ‘ইসলামাবাদ এমওইউ’ স্বাক্ষরকে অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এক বার্তায় তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের জন্য ব্যাপক দুর্ভোগ ডেকে আনে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জারদারি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এমন সংকট আর ফিরে আসবে না এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে মনোযোগ দেবে।

তিনি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।

পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর, রাশিয়া ও চীনের ভূমিকাও উল্লেখ করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদানের প্রশংসা করেন।

সুইজারল্যান্ডে শুরু হচ্ছে বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আলোচনা

সুইস সরকার জানিয়েছে, চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও কাতার অংশ নেবে। তবে বৈঠকের বিস্তারিত সময়সূচি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

১৪ দফা খসড়া প্রকাশ

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ ‘ইসলামাবাদ এমওইউ’-এর পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করেছে। এতে সামরিক সংঘাতের অবসান এবং একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছানোর রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো:
১। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এবং বর্তমান যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করবে। উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেবে না এবং শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে।

২। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।

৩। উভয় দেশ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালাবে। পারস্পরিক সম্মতিতে এ সময় বাড়ানো যেতে পারে।

৪। সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বাধা বা হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আশপাশের এলাকা থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করবে।

৫। ইরান সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার পদক্ষেপ নেবে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর ও মাইন অপসারণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে।

৬। যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে।

৭। যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর বর্তমান সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

৮। ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত চুক্তিতে সমাধান করা হবে।

৯। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করবে না।

১০। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরপরই এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবার রপ্তানির অনুমোদন দেবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতও থাকবে।

১১। আলোচনায় অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরানের স্থগিত বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত যেকোনো চূড়ান্ত অর্থপ্রদানে এসব অর্থ ব্যবহার করা যাবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও লাইসেন্স যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করবে।

১২। চূড়ান্ত চুক্তির সফল বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি তদারকির জন্য একটি বাস্তবায়ন কাঠামো গঠন করা হবে।

১৩। সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর এবং ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর উভয় দেশ বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।

১৪। চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।