সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হিজাব ছাড়া গান, ইরানি গায়িকার সাজা ৭৪ দোররা

হিজাব ছাড়া প্রকাশ্যে গান গাওয়ার অভিযোগে ইরানি গায়িকা পারাস্তু আহমাদি এবং তার প্রযোজনা দলের আট সদস্যকে ৭৪টি করে দোররা মারার নির্দেশ দিয়েছে ইরানের একটি আদালত। একই সঙ্গে তাদের দুই বছরের জন্য বিদেশ ভ্রমণ ও শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, কোয়ম প্রদেশের একটি ফৌজদারি আদালত এই রায় দিয়েছেন। শিল্পীদের বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে ‘অশ্লীল ও অনৈতিক কনটেন্ট’ তৈরি ও প্রচারের মাধ্যমে জনশৃঙ্খলা এবং সামাজিক শালীনতা নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। সে সময় ২৯ বছর বয়সী পারাস্তু আহমাদি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে একটি লাইভ কনসার্ট সম্প্রচার করেন।

সেখানে তিনি হিজাব ছাড়া উপস্থিত হয়ে ‘আজ খুনে জাভানানে ভাতান’ শিরোনামের একটি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিও প্রকাশের পর পারাস্তু এবং তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন সংগীতশিল্পীকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছিল। পরে তারা মুক্তি পেলেও কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করে। ইউটিউবে ভিডিওটি ইতোমধ্যে লাখোবার দেখা হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, এই রায় কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভিন্নমত ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে দমনের একটি উদাহরণ। তাদের মতে, সরকারের সমালোচনামূলক অবস্থানে থাকা শিল্পীদের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ ইরানে দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’-এর অ্যাডভোকেসি পরিচালক বাহার ঘান্দেহারি বলেন, শুধু গান গাওয়া এবং হিজাব ছাড়া উপস্থিত হওয়ার কারণে একজন শিল্পীকে ৭৪ দোররা মারার সাজা দেওয়া অত্যন্ত কঠোর ও উদ্বেগজনক। এটি ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

অন্যদিকে, ইরানি অ্যাক্টিভিস্টদের আইনি সহায়তাদানকারী সংস্থা ‘দাদবান’-এর মানবাধিকার আইনজীবী মইন খাজায়েলি বলেন, এই রায়ের কোনো স্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই। তার ভাষ্য, ইরানের প্রচলিত আইনে নারীদের গান গাওয়া বা সংগীত পরিবেশন করাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এসব কর্মকাণ্ডকে ‘অশ্লীল কনটেন্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করা আইনের অপপ্রয়োগ।

তিনি আরও বলেন, দোররা মারার শাস্তি শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতেও প্রশ্নবিদ্ধ। বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এ ধরনের শাস্তিকে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করে।

ইরানি-ব্রিটিশ অভিনেত্রী নাজানিন বোনিয়াদি এই রায়কে ‘কঠোর বার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ইরানে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের আলোচনা চললেও বাস্তবে দেশটির দমনমূলক ব্যবস্থা এখনো বহাল রয়েছে।

এদিকে, নির্বাসিত ইরানি অভিনেত্রী সেতারেহ মালেকি বলেন, পারাস্তু আহমাদির কনসার্ট তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সাহস দেখিয়েছেন এই শিল্পী। আর এটাই ইরানি নারীদের সংগ্রামের প্রতীক।

বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় ইরানে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নারীর অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কও আরও জোরালো হতে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

জাহিদ হাসানের প্রিয় দল আর্জেন্টিনা, তবে ট্রফি দেখতে চান অন্য হাতে

হিজাব ছাড়া গান, ইরানি গায়িকার সাজা ৭৪ দোররা

প্রকাশিত সময় : ০৬:০৩:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
হিজাব ছাড়া প্রকাশ্যে গান গাওয়ার অভিযোগে ইরানি গায়িকা পারাস্তু আহমাদি এবং তার প্রযোজনা দলের আট সদস্যকে ৭৪টি করে দোররা মারার নির্দেশ দিয়েছে ইরানের একটি আদালত। একই সঙ্গে তাদের দুই বছরের জন্য বিদেশ ভ্রমণ ও শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, কোয়ম প্রদেশের একটি ফৌজদারি আদালত এই রায় দিয়েছেন। শিল্পীদের বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে ‘অশ্লীল ও অনৈতিক কনটেন্ট’ তৈরি ও প্রচারের মাধ্যমে জনশৃঙ্খলা এবং সামাজিক শালীনতা নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। সে সময় ২৯ বছর বয়সী পারাস্তু আহমাদি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে একটি লাইভ কনসার্ট সম্প্রচার করেন।

সেখানে তিনি হিজাব ছাড়া উপস্থিত হয়ে ‘আজ খুনে জাভানানে ভাতান’ শিরোনামের একটি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিও প্রকাশের পর পারাস্তু এবং তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন সংগীতশিল্পীকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছিল। পরে তারা মুক্তি পেলেও কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করে। ইউটিউবে ভিডিওটি ইতোমধ্যে লাখোবার দেখা হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, এই রায় কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভিন্নমত ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে দমনের একটি উদাহরণ। তাদের মতে, সরকারের সমালোচনামূলক অবস্থানে থাকা শিল্পীদের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ ইরানে দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’-এর অ্যাডভোকেসি পরিচালক বাহার ঘান্দেহারি বলেন, শুধু গান গাওয়া এবং হিজাব ছাড়া উপস্থিত হওয়ার কারণে একজন শিল্পীকে ৭৪ দোররা মারার সাজা দেওয়া অত্যন্ত কঠোর ও উদ্বেগজনক। এটি ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

অন্যদিকে, ইরানি অ্যাক্টিভিস্টদের আইনি সহায়তাদানকারী সংস্থা ‘দাদবান’-এর মানবাধিকার আইনজীবী মইন খাজায়েলি বলেন, এই রায়ের কোনো স্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই। তার ভাষ্য, ইরানের প্রচলিত আইনে নারীদের গান গাওয়া বা সংগীত পরিবেশন করাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এসব কর্মকাণ্ডকে ‘অশ্লীল কনটেন্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করা আইনের অপপ্রয়োগ।

তিনি আরও বলেন, দোররা মারার শাস্তি শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতেও প্রশ্নবিদ্ধ। বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এ ধরনের শাস্তিকে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করে।

ইরানি-ব্রিটিশ অভিনেত্রী নাজানিন বোনিয়াদি এই রায়কে ‘কঠোর বার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ইরানে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের আলোচনা চললেও বাস্তবে দেশটির দমনমূলক ব্যবস্থা এখনো বহাল রয়েছে।

এদিকে, নির্বাসিত ইরানি অভিনেত্রী সেতারেহ মালেকি বলেন, পারাস্তু আহমাদির কনসার্ট তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সাহস দেখিয়েছেন এই শিল্পী। আর এটাই ইরানি নারীদের সংগ্রামের প্রতীক।

বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় ইরানে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নারীর অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কও আরও জোরালো হতে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান