শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লক্ষ্মীপুরে চার খুনের রহস্য এখনো অজানা, মামলা দায়ের

সাত বছর আগে হারিয়েছিলেন বাবাকে। এবার একই দিনে হারালেন মা ও তিন বোনকে। পৃথিবীতে আপন বলতে আর কেউ রইলো না ১৮ বছর বয়সী জুনায়েদ ইসলাম সিফাতের। এক পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক পরিণতি পুরো এলাকাজুড়ে তীব্র শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে নাস্তা খাওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল সিফাতের। কয়েক ঘণ্টা পর ঘরে ফিরে দেখতে হয় মা ও তিন বোনের রক্তাক্ত নিথর দেহ। চার স্বজনের লাশের ভার পড়ল সিফাতের কাঁধেই।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর শহরের ধানহাটা-সংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে ভাড়া বাসায় ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

এ ঘটনায় শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে রায়পুর থানায় পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য জুনায়েদ ইসলাম সিফাত বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন

নিহতের স্বজনরা বলছেন, ডাকাতির উদ্দেশ্যেই হামলা চালানো হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, সন্দেহভাজন একজন নিহত হলেও এই হত্যাযজ্ঞে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বাবা কামাল হোসেনকে হারান সিফাত। এরপর স্থানীয়দের সহযোগিতা ও আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় চলত সংসার। লেখাপড়ার পাশাপাশি রায়পুর শহরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে কাজ নিয়ে সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। মা ও তিন বোনকে নিয়ে কোনোমতে চলছিল পাঁচ সদস্যের পরিবার। এখন সেই পরিবারের চারজনই না ফেরার দেশে।

বৃহস্পতিবার সকালে সিফাতের মা শাহিনুর আক্তার (৩৮), বড় বোন সায়মা আক্তার (২০), মেঝো বোন নাফিসা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট বোন সিফা আক্তারকে (৯) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে স্থানীয়দের পিটুনিতে মারা যান সন্দেহভাজন খুনি অন্তর মজুমদার (২৮)।

অন্তর মজুমদার সিফাতের পরিবারের পূর্বপরিচিত ছিল এবং একই বাসায় ওপরের তলায় ভাড়া থাকত।

সিফাতের স্বজনদের দাবি, কারো সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না নিহতদের পরিবারের। সিফাতের নানা ও মামা বলছেন, ডাকাতিই ছিল ঘটনার মূল উদ্দেশ্য। একই কথা জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী এক নারীও।

নিহতদের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. অরুপ পাল জানিয়েছেন, মরদেহগুলোর বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। ধর্ষণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মেডিকেল পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন বলেছেন, “তদন্ত চলছে। নিহতের ছেলে সিফাত বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি একজনের কাজ বলে মনে হলেও সব দিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে এমন কিছু মনে হয়নি যে, একজন ব্যক্তি শুধু ডাকাতির উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা অন্য কারো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

লক্ষ্মীপুরে চার খুনের রহস্য এখনো অজানা, মামলা দায়ের

প্রকাশিত সময় : ১১:০৭:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

সাত বছর আগে হারিয়েছিলেন বাবাকে। এবার একই দিনে হারালেন মা ও তিন বোনকে। পৃথিবীতে আপন বলতে আর কেউ রইলো না ১৮ বছর বয়সী জুনায়েদ ইসলাম সিফাতের। এক পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক পরিণতি পুরো এলাকাজুড়ে তীব্র শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে নাস্তা খাওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল সিফাতের। কয়েক ঘণ্টা পর ঘরে ফিরে দেখতে হয় মা ও তিন বোনের রক্তাক্ত নিথর দেহ। চার স্বজনের লাশের ভার পড়ল সিফাতের কাঁধেই।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর শহরের ধানহাটা-সংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে ভাড়া বাসায় ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

এ ঘটনায় শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে রায়পুর থানায় পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য জুনায়েদ ইসলাম সিফাত বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন

নিহতের স্বজনরা বলছেন, ডাকাতির উদ্দেশ্যেই হামলা চালানো হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, সন্দেহভাজন একজন নিহত হলেও এই হত্যাযজ্ঞে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বাবা কামাল হোসেনকে হারান সিফাত। এরপর স্থানীয়দের সহযোগিতা ও আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় চলত সংসার। লেখাপড়ার পাশাপাশি রায়পুর শহরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে কাজ নিয়ে সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। মা ও তিন বোনকে নিয়ে কোনোমতে চলছিল পাঁচ সদস্যের পরিবার। এখন সেই পরিবারের চারজনই না ফেরার দেশে।

বৃহস্পতিবার সকালে সিফাতের মা শাহিনুর আক্তার (৩৮), বড় বোন সায়মা আক্তার (২০), মেঝো বোন নাফিসা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট বোন সিফা আক্তারকে (৯) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে স্থানীয়দের পিটুনিতে মারা যান সন্দেহভাজন খুনি অন্তর মজুমদার (২৮)।

অন্তর মজুমদার সিফাতের পরিবারের পূর্বপরিচিত ছিল এবং একই বাসায় ওপরের তলায় ভাড়া থাকত।

সিফাতের স্বজনদের দাবি, কারো সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না নিহতদের পরিবারের। সিফাতের নানা ও মামা বলছেন, ডাকাতিই ছিল ঘটনার মূল উদ্দেশ্য। একই কথা জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী এক নারীও।

নিহতদের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. অরুপ পাল জানিয়েছেন, মরদেহগুলোর বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। ধর্ষণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মেডিকেল পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন বলেছেন, “তদন্ত চলছে। নিহতের ছেলে সিফাত বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি একজনের কাজ বলে মনে হলেও সব দিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে এমন কিছু মনে হয়নি যে, একজন ব্যক্তি শুধু ডাকাতির উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা অন্য কারো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”