রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরাসি ঝড়ের সামনে প্যারাগুয়ে

চার ম্যাচের চারটিতেই জয়। শতভাগ জয়ের রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখার পথে প্রতিপক্ষের জালে ১৩ বার বল পাঠানোর বিপরীতে তারা হজম করেছে মোটে ২টি।

এর মধ্যে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও ব্র্যাডলি বারকোলা—এই ত্রয়ী মিলেই করেছেন ১২ গোল। আক্রমণভাগের অন্য নামগুলোও তো কম ওজনদার নয়—মাইকেল ওলিসে, রায়ান চেরকি, দেজিরে দুয়ে, জঁ ফিলিপ মাতেতারাও—প্রত্যেকে পারেন যেকোনো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে! ফরাসি সৌরভ ছড়িয়ে বিশ্বকাপ মাতিয়ে রেখেছেন এই তারকারা। এমন একটি দলকে তো যেকোনো দলেরই হিংসে করার কথা! আক্রমণের তোড়ে প্রতিপক্ষকে একেবারে কাঁপিয়ে দিচ্ছেন ফ্রান্সের বিশ্বসেরা আক্রমণ ভাগের খেলোয়াড়রা। তুঙ্গস্পর্শী ওই ছন্দ এমবাপ্পে-ওলিসে-দেম্বেলেরা অনুবাদ করতে পারলে ফিলাডেলফিয়ার লিনকন ফিন্যানশিয়াল ফিল্ডেও হয়তো লেখা হবে আরেকটা ফরাসি বিজয়গাথা! প্যারাগুয়ে কী পারবে ফরাসি-ঝড় সামলে আরেকটা বীরোচিত কাব্য রচনা করতে? কাগজে-কলমে দেশমের দলই এগিয়ে, তবে চলতি বিশ্বকাপে প্যারাগুয়েরও আছে নিজস্ব বীরত্বের গল্প।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলের বড় হারে শুরুটা দুঃস্বপ্নের হলেও ধীরে ধীরে উন্নতি করে সামনে অগ্রসর হয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশটি। শুরুর বিপর্যয় সামলে প্রাণবন্ত একতাবদ্ধ একটা দল হিসেবে প্যারাগুয়েকে বদলে দিয়েছেন কোচ গুস্তাভো আলফারো। উন্নতির ধারাবাহিকতায় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটন ঘটিয়ে জার্মান যন্ত্র বিকল করে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আজ তারা মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্সের। লাতিন আমেরিকান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে এই প্যারাগুয়েই কিন্তু হারিয়ে দিয়েছিল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা—এই দুই পরাশক্তিকে।

আকাশে উড়তে থাকা শিষ্যদের পা তাই মাটিতেই রাখতে বলেছেন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম, ‘তারা যা অর্জন করেছে, তা কোনো দুর্ঘটনা নয়।’ এমবাপ্পেরা প্যারাগুয়ের বিপক্ষে খেলতে নামার চার ঘণ্টা আগেই অবশ্য শুরু হয়ে যাবে শেষ ষোলোর (তৃতীয় রাউন্ড) লড়াই। হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে এ পর্বের প্রথম ম্যাচে সহ-আয়োজক কানাডার প্রতিপক্ষ মরক্কো। নেদারল্যান্ডসের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে আজ কানাডার বিপক্ষে শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে নামছেন আশরাফ হাকিমিরা।
পেনসিলভানিয়ার ম্যাচটি প্যারাগুয়ের জন্য প্রতিশোধের মঞ্চ।

২৮ বছর আগে বিশ্বকাপের এই একই মঞ্চে ইউরোপিয়ান পরাশক্তিদের মুখোমুখি হয়ে হারের তিক্ততা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল লাতিন আমেরিকার দেশটিকে। ১১৪ মিনিটে করা লঁরা ব্লাঁর গোল্ডেন গোলে কপাল পুড়েছিল প্যারাগুয়ের। নিজ দেশে সেবার বিশ্বকাপও জিতেছিল ফরাসিরা। সেদিন ফরাসি দলের অধিনায়ক ছিলেন দিদিয়ের দেশম, ১৯৯৮ সালের ওই সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনতে এবার তিনি দলের রণকৌশল ঠিক করবেন ডাগ আউটে বসে। শক্তির নিক্তিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এই লড়াইয়েও পরিষ্কার ফেভারিট হয়ে মাঠে নামবেন এমবাপ্পে-ওলিসেরা। কিন্তু জয়োৎসব করতে হলে তাঁদের ভাঙতে হবে প্যারাগুয়ের দুর্ভেদ্য রক্ষণব্যূহ! দেশটির সাবেক ফরোয়ার্ড মিগুয়েল আনহেল বেনিতেজ ফ্রান্সের বিপক্ষে মনপ্রাণ উজাড় করে খেলতে পরামর্শ দিয়েছেন তাঁর উত্তরসূরিদের। কয়েক সেকেন্ডের ভুলেও তো ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়তে পারে তারা। কারণ সামান্যতমভুলেরও চরম শাস্তি দিয়ে ম্যাচটা নিজেদের করে নিতে পারঙ্গম ফ্রান্সের বিশ্বসেরা আক্রমণ ভাগ

কানাডার বিশ্বকাপটা কাটছে রূপকথার মতো। ফুটবল মহাযজ্ঞে প্রথম পয়েন্ট, প্রথম জয়, প্রথমবার নক আউটে ওঠার বীরোচিত গল্প—সবই তারা রচনা করেছে চলতি আসরে। রূপকথার এই পরিভ্রমণে আজ শেষ ষোলোর লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি হবে মরক্কোর। আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে চার বছর আগে কাতার আসরে সেমিফাইনালে খেলা মরক্কানরা বিশ্বকাপ স্বপ্নযাত্রা অব্যাহত রেখে এবারও জায়গা করে নিয়েছে শেষ ষোলোয়। ব্রাজিলের গ্রুপ থেকে নক আউটে উঠে শেষ বত্রিশে তারা হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করে পরাক্রমশালী ডাচদের। সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও কৌশলগতভাবে দারুণ সমীহজাগানিয়া দলটি আবারও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে মরক্কানদের। আজকের দ্বৈরথেও এগিয়ে থেকেই মাঠে নামবে তারা। অন্যদিকে বিশ্বকাপে নতুন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কানাডা। তাদের মূল জ্বালানি হলো বর্তমান ফর্ম এবং নির্ভার থাকা। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে প্রত্যাশার চাপ জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল তাদের বুকে। অনেক প্রথমের কীর্তি গড়ে এতটা পথ পাড়ি দেওয়ায় সেই চাপ গেছে পুরোপুরি উবে। মরক্কোর বিপক্ষে তারা যে ফলই করুক, তা নিয়ে হয়তো আফসোসে পুড়বে না সমর্থকরা। আর মানসিক এই স্বাধীনতাই হতে পারে আজ মরক্কোর বিপক্ষে কানাডার অন্যতম বড় শক্তি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

ফরাসি ঝড়ের সামনে প্যারাগুয়ে

প্রকাশিত সময় : ০৪:২১:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

চার ম্যাচের চারটিতেই জয়। শতভাগ জয়ের রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখার পথে প্রতিপক্ষের জালে ১৩ বার বল পাঠানোর বিপরীতে তারা হজম করেছে মোটে ২টি।

এর মধ্যে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও ব্র্যাডলি বারকোলা—এই ত্রয়ী মিলেই করেছেন ১২ গোল। আক্রমণভাগের অন্য নামগুলোও তো কম ওজনদার নয়—মাইকেল ওলিসে, রায়ান চেরকি, দেজিরে দুয়ে, জঁ ফিলিপ মাতেতারাও—প্রত্যেকে পারেন যেকোনো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে! ফরাসি সৌরভ ছড়িয়ে বিশ্বকাপ মাতিয়ে রেখেছেন এই তারকারা। এমন একটি দলকে তো যেকোনো দলেরই হিংসে করার কথা! আক্রমণের তোড়ে প্রতিপক্ষকে একেবারে কাঁপিয়ে দিচ্ছেন ফ্রান্সের বিশ্বসেরা আক্রমণ ভাগের খেলোয়াড়রা। তুঙ্গস্পর্শী ওই ছন্দ এমবাপ্পে-ওলিসে-দেম্বেলেরা অনুবাদ করতে পারলে ফিলাডেলফিয়ার লিনকন ফিন্যানশিয়াল ফিল্ডেও হয়তো লেখা হবে আরেকটা ফরাসি বিজয়গাথা! প্যারাগুয়ে কী পারবে ফরাসি-ঝড় সামলে আরেকটা বীরোচিত কাব্য রচনা করতে? কাগজে-কলমে দেশমের দলই এগিয়ে, তবে চলতি বিশ্বকাপে প্যারাগুয়েরও আছে নিজস্ব বীরত্বের গল্প।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলের বড় হারে শুরুটা দুঃস্বপ্নের হলেও ধীরে ধীরে উন্নতি করে সামনে অগ্রসর হয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশটি। শুরুর বিপর্যয় সামলে প্রাণবন্ত একতাবদ্ধ একটা দল হিসেবে প্যারাগুয়েকে বদলে দিয়েছেন কোচ গুস্তাভো আলফারো। উন্নতির ধারাবাহিকতায় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটন ঘটিয়ে জার্মান যন্ত্র বিকল করে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আজ তারা মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্সের। লাতিন আমেরিকান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে এই প্যারাগুয়েই কিন্তু হারিয়ে দিয়েছিল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা—এই দুই পরাশক্তিকে।

আকাশে উড়তে থাকা শিষ্যদের পা তাই মাটিতেই রাখতে বলেছেন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম, ‘তারা যা অর্জন করেছে, তা কোনো দুর্ঘটনা নয়।’ এমবাপ্পেরা প্যারাগুয়ের বিপক্ষে খেলতে নামার চার ঘণ্টা আগেই অবশ্য শুরু হয়ে যাবে শেষ ষোলোর (তৃতীয় রাউন্ড) লড়াই। হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে এ পর্বের প্রথম ম্যাচে সহ-আয়োজক কানাডার প্রতিপক্ষ মরক্কো। নেদারল্যান্ডসের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে আজ কানাডার বিপক্ষে শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে নামছেন আশরাফ হাকিমিরা।
পেনসিলভানিয়ার ম্যাচটি প্যারাগুয়ের জন্য প্রতিশোধের মঞ্চ।

২৮ বছর আগে বিশ্বকাপের এই একই মঞ্চে ইউরোপিয়ান পরাশক্তিদের মুখোমুখি হয়ে হারের তিক্ততা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল লাতিন আমেরিকার দেশটিকে। ১১৪ মিনিটে করা লঁরা ব্লাঁর গোল্ডেন গোলে কপাল পুড়েছিল প্যারাগুয়ের। নিজ দেশে সেবার বিশ্বকাপও জিতেছিল ফরাসিরা। সেদিন ফরাসি দলের অধিনায়ক ছিলেন দিদিয়ের দেশম, ১৯৯৮ সালের ওই সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনতে এবার তিনি দলের রণকৌশল ঠিক করবেন ডাগ আউটে বসে। শক্তির নিক্তিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এই লড়াইয়েও পরিষ্কার ফেভারিট হয়ে মাঠে নামবেন এমবাপ্পে-ওলিসেরা। কিন্তু জয়োৎসব করতে হলে তাঁদের ভাঙতে হবে প্যারাগুয়ের দুর্ভেদ্য রক্ষণব্যূহ! দেশটির সাবেক ফরোয়ার্ড মিগুয়েল আনহেল বেনিতেজ ফ্রান্সের বিপক্ষে মনপ্রাণ উজাড় করে খেলতে পরামর্শ দিয়েছেন তাঁর উত্তরসূরিদের। কয়েক সেকেন্ডের ভুলেও তো ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়তে পারে তারা। কারণ সামান্যতমভুলেরও চরম শাস্তি দিয়ে ম্যাচটা নিজেদের করে নিতে পারঙ্গম ফ্রান্সের বিশ্বসেরা আক্রমণ ভাগ

কানাডার বিশ্বকাপটা কাটছে রূপকথার মতো। ফুটবল মহাযজ্ঞে প্রথম পয়েন্ট, প্রথম জয়, প্রথমবার নক আউটে ওঠার বীরোচিত গল্প—সবই তারা রচনা করেছে চলতি আসরে। রূপকথার এই পরিভ্রমণে আজ শেষ ষোলোর লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি হবে মরক্কোর। আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে চার বছর আগে কাতার আসরে সেমিফাইনালে খেলা মরক্কানরা বিশ্বকাপ স্বপ্নযাত্রা অব্যাহত রেখে এবারও জায়গা করে নিয়েছে শেষ ষোলোয়। ব্রাজিলের গ্রুপ থেকে নক আউটে উঠে শেষ বত্রিশে তারা হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করে পরাক্রমশালী ডাচদের। সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও কৌশলগতভাবে দারুণ সমীহজাগানিয়া দলটি আবারও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে মরক্কানদের। আজকের দ্বৈরথেও এগিয়ে থেকেই মাঠে নামবে তারা। অন্যদিকে বিশ্বকাপে নতুন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কানাডা। তাদের মূল জ্বালানি হলো বর্তমান ফর্ম এবং নির্ভার থাকা। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে প্রত্যাশার চাপ জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল তাদের বুকে। অনেক প্রথমের কীর্তি গড়ে এতটা পথ পাড়ি দেওয়ায় সেই চাপ গেছে পুরোপুরি উবে। মরক্কোর বিপক্ষে তারা যে ফলই করুক, তা নিয়ে হয়তো আফসোসে পুড়বে না সমর্থকরা। আর মানসিক এই স্বাধীনতাই হতে পারে আজ মরক্কোর বিপক্ষে কানাডার অন্যতম বড় শক্তি।