লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পা থেকে যখন বলটি বাতাসে ভাসল, তখন যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো স্টেডিয়াম। সবার চোখ তখন মাঠের সেই জাদুকরের ওপর, যিনি বছরের পর বছর ধরে কোটি ভক্তের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন।
অফসাইডের সুক্ষ্ম ফাঁদ এড়িয়ে, নিখুঁত দক্ষতায় বলটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিলেন তিনি। এরপর কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার মাথার ওপর দিয়ে আলতো চিপে বলটি যখন জালে জড়াল, গ্যালারিতে তখন উল্লাসের সুনামি।

বিশ্বকাপের মঞ্চে এটি কেবল আরেকটি গোল ছিল না, এটি ছিল লিওনেল মেসির অনন্য এক মহাকাব্যের নতুন অধ্যায়। ম্যাচের ২৯তম মিনিটের সেই গোলটি দিয়ে বিশ্বকাপে নিজের ২০তম গোল পূর্ণ করলেন এই মহাতারকা, যা তাকে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে আরও উঁচুতে বসিয়ে দিল। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী কিলিয়ান এমবাপ্পের চেয়ে এখন তিনি দুই গোল এগিয়ে।
এই ফুটবল জাদুকরকে ঘিরেই শুক্রবারের রাতটি রূপ নিয়েছিল এক চরম নাটকীয়তায়। কেপ ভার্দের মতো লড়াকু দলের বিপক্ষে যখন বিদায়ের স্তব্ধতা গ্রাস করতে যাচ্ছিল আর্জেন্টিনাকে, তখন অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুচাপ উবে যায় মেসির জাদুকরী উপস্থিতিতে। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয়ে মাঠ ছাড়ে আলবিসেলেস্তেরা। আর এই জয়ের পথেই মেসি গড়ে ফেললেন টানা আটটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার এক অবিশ্বাস্য, অতিমানবীয় রেকর্ড। বিশ্বকাপের শেষ আট ম্যাচে তার গোল সংখ্যা এখন ১২।
মেসি মাঠে থাকা মানেই যেন এক পশলা স্বস্তি। তার সতীর্থ এবং প্রিয় বন্ধু রদ্রিগো দে পল ম্যাচ শেষে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলছিলেন, তার বন্ধু হতে পারাটা আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। বন্ধুত্ব আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। তার পাশে থেকে এমন মুহূর্তগুলো ভাগাভাগি করতে পারছি, নিজেকে সত্যিই সৌভাগ্যবান মনে করি।
আসলে মেসির মাহাত্ম্য তো এখানেই। তিনি কেবল গোল করেন না, তিনি পুরো দলকে এক সুতোয় বাঁধেন, সতীর্থদের মনে বিশ্বাস জাগান। গোল করার পর যখন দুই হাত প্রসারিত করে পাসদাতা মার্তিনেজের দিকে ইঙ্গিত করলেন, তখন মনে হচ্ছিল তিনি যেন বলতে চাইছেন, এই কৃতিত্ব আমার একার নয়, আমাদের সবার।
চলতি বিশ্বকাপে ৭ গোল নিয়ে মেসি এখন গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার শীর্ষে। হালান্ড, কেইন কিংবা এমবাপ্পের মতো তরুণ তুর্কিরা তাকে তাড়া করে ফিরছে ঠিকই, কিন্তু মেসি যেন খেলছেন অন্য এক উচ্চতায়। ২০১৪ সালের আক্ষেপ কিংবা ২০২২ সালে ৭ গোল করেও এমবাপ্পের কাছে গোল্ডেন বুট হারানোর হিসাব মেলাতে নয়, তিনি এবার এসেছেন নিজের শেষ বিশ্বকাপকে এক অমর রূপ দিতে।
টাইব্রেকার, অ্যাসিস্ট কিংবা কম সময় খেলার মারপ্যাঁচ হয়তো কাগজের কলমে এমবাপ্পেকে কিছুটা এগিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু মাঠের সবুজ ঘাসে লিওনেল মেসি যে আবেগের গল্প লিখছেন, তার কোনো টাইব্রেকার হয় না। তিনি কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ের এক টুকরো আবেগ, যিনি প্রতি ম্যাচে প্রমাণ করছেন কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা বলা হয়।

স্পোর্টস ডেস্ক/ ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম 






















