বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিমান হামলার সতর্কতায় এআই ব্যবহার করছে ইসরায়েল

গাজা উপত্যকার যুদ্ধ এবং এক বছরের ব্যবধানে ইরানের সঙ্গে দুটি সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইসরায়েল তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে।

জেরুজালেম থেকে এএফপি জানায়, গত বছরের ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে যখন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র আসত, তখন পুরো শহরজুড়ে সাইরেন বেজে উঠত এবং বাসিন্দাদের দিনে বহুবার আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হতো।

তবে এখন এই সতর্কতা ব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত ও নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে উঠেছে।

৩২ বছর বয়সী সারা শেমলা, যিনি ২০২৫ সালের যুদ্ধে তেল আবিবের একটি ভূগর্ভস্থ হাসপাতালের বাঙ্কারে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন, বলেন, আগে প্রতিটি সতর্কতা পুরো শহরের জন্য প্রযোজ্য ছিল, কিন্তু এখন তা অনেক বেশি নির্দিষ্ট।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন আশ্রয়কেন্দ্রে কম সময় কাটাই, যদিও মানসিক চাপ এখনও রয়ে গেছে।’

বর্তমান যুদ্ধে এই উন্নত সতর্কতা ব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবন কিছুটা সহজ করেছে বলে জানান তিনি।

আগের মতো এখন আর প্রতিটি সাইরেনে সন্তানদের জাগিয়ে তুলতে হয় না, এমনকি কিছু রাতে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুমাতেও পারে।

তিনি বলেন, ‘আগে তেল আবিবের যেকোনো স্থানে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে পুরো শহরে সতর্কতা জারি হতো। এখন সতর্কতা অত্যন্ত নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ। কোনো ক্ষেপণাস্ত্র শহরের দক্ষিণাংশে লক্ষ্য করলে আমি শুধু আগাম সতর্কতা পাই, সন্তানদের আর জাগাতে হয় না।’

গাজা যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে ইসরাইলের সিভিল ডিফেন্স তাদের সতর্কতা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে, যাতে ক্রমাগত হামলার আশঙ্কার মধ্যেও সাধারণ জীবন কিছুটা স্বাভাবিক রাখা যায়।

এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, যা আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র কোথায় আঘাত হানতে পারে তা পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করে।

ধারাবাহিক নজরদারি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ‘৬০ হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন ও আকাশপথের হুমকি’ ইসরাইলে নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানান সাবেক বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ডার রান কোখাভ।

তিনি বলেন, প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ, সময়, আবহাওয়া, উৎক্ষেপণের কোণ ও রাডার সংকেতসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এই বিপুল তথ্য এআইয়ের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়, যা মানুষের পক্ষে এত দ্রুত ও গভীরভাবে করা সম্ভব নয়।

তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ইয়েহোশুয়া কালিস্কি বলেন, ‘এআই লক্ষ লক্ষ ডেটা একত্র করে বিশ্লেষণ করে, যা কৌশলগত পরিকল্পনা ও পূর্বাভাসে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।’

১,৭০০ সতর্কতা অঞ্চল

২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের সময় পুরো দেশকে ২৫টি সতর্কতা অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৭০০।

বড় শহরগুলোকে ছোট ছোট উপ-অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে লাখো মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে না হয়।

ইসরাইলের এই সতর্কতা ব্যবস্থা এখন সাইরেন, ওয়েবসাইট, গণমাধ্যম, এমনকি বিশেষ রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে স্মার্টফোন ব্যবহারের মাধ্যমে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ লাখ ফোনে ব্যবহৃত একটি অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অবস্থানভিত্তিক সতর্কতা, আশ্রয় নিতে কত সময় লাগবে এবং বিপদ কেটে গেলে ‘সব ঠিক’ বার্তাও পাঠানো হয়।

২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় সেল ব্রডকাস্ট প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার সব মোবাইল ফোনে একসঙ্গে সতর্কতা পাঠানো সম্ভব হয়।

সারা শেমলার ভাষায়, গত এক বছরে সতর্কতা ব্যবস্থার এই উন্নয়ন ‘জীবনরক্ষাকারী’ হিসেবে কাজ করছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

বিমান হামলার সতর্কতায় এআই ব্যবহার করছে ইসরায়েল

প্রকাশিত সময় : ০৭:৪৬:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
গাজা উপত্যকার যুদ্ধ এবং এক বছরের ব্যবধানে ইরানের সঙ্গে দুটি সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইসরায়েল তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে।

জেরুজালেম থেকে এএফপি জানায়, গত বছরের ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে যখন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র আসত, তখন পুরো শহরজুড়ে সাইরেন বেজে উঠত এবং বাসিন্দাদের দিনে বহুবার আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হতো।

তবে এখন এই সতর্কতা ব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত ও নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে উঠেছে।

৩২ বছর বয়সী সারা শেমলা, যিনি ২০২৫ সালের যুদ্ধে তেল আবিবের একটি ভূগর্ভস্থ হাসপাতালের বাঙ্কারে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন, বলেন, আগে প্রতিটি সতর্কতা পুরো শহরের জন্য প্রযোজ্য ছিল, কিন্তু এখন তা অনেক বেশি নির্দিষ্ট।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন আশ্রয়কেন্দ্রে কম সময় কাটাই, যদিও মানসিক চাপ এখনও রয়ে গেছে।’

বর্তমান যুদ্ধে এই উন্নত সতর্কতা ব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবন কিছুটা সহজ করেছে বলে জানান তিনি।

আগের মতো এখন আর প্রতিটি সাইরেনে সন্তানদের জাগিয়ে তুলতে হয় না, এমনকি কিছু রাতে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুমাতেও পারে।

তিনি বলেন, ‘আগে তেল আবিবের যেকোনো স্থানে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে পুরো শহরে সতর্কতা জারি হতো। এখন সতর্কতা অত্যন্ত নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ। কোনো ক্ষেপণাস্ত্র শহরের দক্ষিণাংশে লক্ষ্য করলে আমি শুধু আগাম সতর্কতা পাই, সন্তানদের আর জাগাতে হয় না।’

গাজা যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে ইসরাইলের সিভিল ডিফেন্স তাদের সতর্কতা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে, যাতে ক্রমাগত হামলার আশঙ্কার মধ্যেও সাধারণ জীবন কিছুটা স্বাভাবিক রাখা যায়।

এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, যা আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র কোথায় আঘাত হানতে পারে তা পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করে।

ধারাবাহিক নজরদারি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ‘৬০ হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন ও আকাশপথের হুমকি’ ইসরাইলে নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানান সাবেক বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ডার রান কোখাভ।

তিনি বলেন, প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ, সময়, আবহাওয়া, উৎক্ষেপণের কোণ ও রাডার সংকেতসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এই বিপুল তথ্য এআইয়ের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়, যা মানুষের পক্ষে এত দ্রুত ও গভীরভাবে করা সম্ভব নয়।

তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ইয়েহোশুয়া কালিস্কি বলেন, ‘এআই লক্ষ লক্ষ ডেটা একত্র করে বিশ্লেষণ করে, যা কৌশলগত পরিকল্পনা ও পূর্বাভাসে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।’

১,৭০০ সতর্কতা অঞ্চল

২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের সময় পুরো দেশকে ২৫টি সতর্কতা অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৭০০।

বড় শহরগুলোকে ছোট ছোট উপ-অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে লাখো মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে না হয়।

ইসরাইলের এই সতর্কতা ব্যবস্থা এখন সাইরেন, ওয়েবসাইট, গণমাধ্যম, এমনকি বিশেষ রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে স্মার্টফোন ব্যবহারের মাধ্যমে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ লাখ ফোনে ব্যবহৃত একটি অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অবস্থানভিত্তিক সতর্কতা, আশ্রয় নিতে কত সময় লাগবে এবং বিপদ কেটে গেলে ‘সব ঠিক’ বার্তাও পাঠানো হয়।

২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় সেল ব্রডকাস্ট প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার সব মোবাইল ফোনে একসঙ্গে সতর্কতা পাঠানো সম্ভব হয়।

সারা শেমলার ভাষায়, গত এক বছরে সতর্কতা ব্যবস্থার এই উন্নয়ন ‘জীবনরক্ষাকারী’ হিসেবে কাজ করছে।