শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরকীয়ায় ঘর ছেড়েছেন মা, মারা গেছেন বাবা, দুই শিশুর মানবেতর জীবন

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার গারুরিয়া ইউনিয়নের হিরাধর গ্রামের দুই শিশু দ্বীন ইসলাম মেহেদী (১০) ও মাইনুল ইসলামের (৭) জীবন এখন সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি। যে বয়সে স্কুলে যাওয়া ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলার কথা, সেই বয়সে তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।

পাঁচ বছর আগে মা আসমা বেগম পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে অবুঝ দুই সন্তানকে ফেলে অন্য পুরুষের সঙ্গে চলে যান। এরপর থেকে সন্তানদের কোনো খোঁজখবর নেননি তিনি। মায়ের চলে যাওয়ার পর প্রতিবন্ধী বাবা নাসির হাওলাদারই ছিলেন শিশু দুটির একমাত্র ভরসা। কিন্তু তিন বছর আগে বিলে শাপলা তুলতে গিয়ে পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হলে পরিবারটি পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়ে।

এরপর থেকে ষাটোর্ধ্ব বিধবা দাদি রিজিয়া বেগমের কাছেই বেড়ে উঠছে দুই শিশু। তিনি মানুষের বাড়ি বাড়ি ও হাটবাজারে ভিক্ষা করে কোনোমতে নিজের ও দুই নাতির মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে বয়সের ভারে ও শারীরিক দুর্বলতায় এখন আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারেন না।

রিজিয়া বেগম বলেন, যতদিন বাঁচি নাতিদের আগলে রাখবো। কিন্তু বয়স হয়েছে, এখন আর ঠিকমতো চলতে পারি না। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তায় আছি। থাকার ঘরটিও ভেঙে পড়েছে। কেউ যদি ঘরটি মেরামত করে দিত এবং নাতি দুটির দায়িত্ব নিত, তাহলে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম। বড় নাতি মেহেদী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। সে ও ছোট ভাই মাইনুল স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়তো। কিন্তু চরম দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের কারণে তাদের লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অনেক সময় খাবারের অভাবেও দিন কাটাতে হয়।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দাদি রিজিয়া বেগম ঘরের পাশে চুলায় ভাত ও ডাল রান্না করছেন। ভাঙাচোরা ঘরের সামনেই রয়েছে শিশু দুটির বাবার কবর। দুই ভাই মাঝেমধ্যেই বাবার কবরের পাশে গিয়ে নীরবে বসে থাকে। কখনো খেলতে খেলতে কবরের কাছে চলে যায়, আবার কখনো দীর্ঘ সময় চুপচাপ বসে থাকে। যেন তারা এখনো বিশ্বাস করতে চায়- বাবা একদিন ফিরে আসবেন।

এলাকাবাসী জানায়, দাদির পক্ষে আর এই সংসারের দায়িত্ব বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত সহায়তা না পেলে শিশু দুটির শিক্ষা, পুষ্টি ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, বিষয়টি শুনে খুবই কষ্ট পেলাম। দুটি শিশু এভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে- এটি সত্যিই হৃদয়বিদারক। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে সরেজমিনে তদন্ত করার নির্দেশ দিচ্ছি। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি শিশু দুটির পুনর্বাসনের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

কারামুক্ত হয়ে বাড়িতে ফিরলেও আইভীকে থাকতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে

পরকীয়ায় ঘর ছেড়েছেন মা, মারা গেছেন বাবা, দুই শিশুর মানবেতর জীবন

প্রকাশিত সময় : ০৯:০৩:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার গারুরিয়া ইউনিয়নের হিরাধর গ্রামের দুই শিশু দ্বীন ইসলাম মেহেদী (১০) ও মাইনুল ইসলামের (৭) জীবন এখন সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি। যে বয়সে স্কুলে যাওয়া ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলার কথা, সেই বয়সে তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।

পাঁচ বছর আগে মা আসমা বেগম পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে অবুঝ দুই সন্তানকে ফেলে অন্য পুরুষের সঙ্গে চলে যান। এরপর থেকে সন্তানদের কোনো খোঁজখবর নেননি তিনি। মায়ের চলে যাওয়ার পর প্রতিবন্ধী বাবা নাসির হাওলাদারই ছিলেন শিশু দুটির একমাত্র ভরসা। কিন্তু তিন বছর আগে বিলে শাপলা তুলতে গিয়ে পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হলে পরিবারটি পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়ে।

এরপর থেকে ষাটোর্ধ্ব বিধবা দাদি রিজিয়া বেগমের কাছেই বেড়ে উঠছে দুই শিশু। তিনি মানুষের বাড়ি বাড়ি ও হাটবাজারে ভিক্ষা করে কোনোমতে নিজের ও দুই নাতির মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে বয়সের ভারে ও শারীরিক দুর্বলতায় এখন আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারেন না।

রিজিয়া বেগম বলেন, যতদিন বাঁচি নাতিদের আগলে রাখবো। কিন্তু বয়স হয়েছে, এখন আর ঠিকমতো চলতে পারি না। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তায় আছি। থাকার ঘরটিও ভেঙে পড়েছে। কেউ যদি ঘরটি মেরামত করে দিত এবং নাতি দুটির দায়িত্ব নিত, তাহলে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম। বড় নাতি মেহেদী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। সে ও ছোট ভাই মাইনুল স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়তো। কিন্তু চরম দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের কারণে তাদের লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অনেক সময় খাবারের অভাবেও দিন কাটাতে হয়।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দাদি রিজিয়া বেগম ঘরের পাশে চুলায় ভাত ও ডাল রান্না করছেন। ভাঙাচোরা ঘরের সামনেই রয়েছে শিশু দুটির বাবার কবর। দুই ভাই মাঝেমধ্যেই বাবার কবরের পাশে গিয়ে নীরবে বসে থাকে। কখনো খেলতে খেলতে কবরের কাছে চলে যায়, আবার কখনো দীর্ঘ সময় চুপচাপ বসে থাকে। যেন তারা এখনো বিশ্বাস করতে চায়- বাবা একদিন ফিরে আসবেন।

এলাকাবাসী জানায়, দাদির পক্ষে আর এই সংসারের দায়িত্ব বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত সহায়তা না পেলে শিশু দুটির শিক্ষা, পুষ্টি ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, বিষয়টি শুনে খুবই কষ্ট পেলাম। দুটি শিশু এভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে- এটি সত্যিই হৃদয়বিদারক। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে সরেজমিনে তদন্ত করার নির্দেশ দিচ্ছি। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি শিশু দুটির পুনর্বাসনের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।