বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার চোখে আনন্দ অশ্রু

স্পেন–কেপ ভার্দে ম্যাচ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে হংকংয়ের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র শাওলিন সকার-এর একটি দৃশ্য। সেখানে দেখা যায়, প্রতিপক্ষের একের পর এক শক্তিশালী শট ঠেকিয়ে যাচ্ছেন গোলরক্ষক। আগুনের গোলার মতো ছুটে আসা বল তাঁর শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করলেও তিনি অনড়।

সিনেমার সেই দৃশ্যের পাশে বসানো হয় কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার ছবি। যারা স্পেনের বিপক্ষে তাঁর অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখেছেন, তাদের কাছে এই তুলনা মোটেও অতিরঞ্জিত মনে হওয়ার কথা নয়। বরং বাস্তবের ভোজিনিয়া যেন সিনেমার কল্পনাকেও হার মানিয়েছেন।

বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী স্পেনের সামনে গোলপোস্টে একাই যেন প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। ম্যাচজুড়ে স্পেনের তারকা আক্রমণভাগকে অসহায় করে রেখে একের পর এক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেন তিনি। সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভের পাশাপাশি দুর্দান্ত পজিশনিংয়ে স্পেনের ফরোয়ার্ডদের জন্য প্রায় কোনো জায়গাই খোলা রাখেননি।

ফুটবলে গোলরক্ষকদের ভাগ্যে প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই বেশি জোটে। একটি ভুলে পুরো ম্যাচের দায় এসে পড়ে তাঁদের কাঁধে। কিন্তু এই ম্যাচে ভোজিনিয়া যেন গোলরক্ষকদের পক্ষেই এক অনন্য জয়গান লিখেছেন। পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন গোলকিপারও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।

স্পেনের আক্রমণের ধার এতটাই ছিল যে একপর্যায়ে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে মাঠে নামাতে হয় তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালকে। কিন্তু ১৮ বছর বয়সী এই বিস্ময়বালকও ভোজিনিয়ার সামনে বিশেষ কিছু করতে পারেননি।

মজার বিষয় হলো, ইয়ামাল যখন মাঠে নামেন, তখন তাঁর বয়স ১৮ বছর ৩৪২ দিন। অন্যদিকে ভোজিনিয়ার বয়স ৪০ বছর ২২ দিন। দুজনের বয়সের পার্থক্য ২১ বছর ৪৫ দিন, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে একই ম্যাচে প্রতিপক্ষ দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ বয়সের ব্যবধান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

পরিসংখ্যানও ভোজিনিয়ার কীর্তিকে আরও উজ্জ্বল করে। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে ৪০ বা তার বেশি বয়সী কোনো গোলরক্ষক মাত্র একবারই তাঁর চেয়ে বেশি সেভ করতে পেরেছেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে নিজের ৪১তম জন্মদিনে ব্রাজিলের বিপক্ষে উত্তর আয়ারল্যান্ডের কিংবদন্তি গোলরক্ষক প্যাট জেনিংস করেছিলেন ১০টি সেভ।

স্পেনের বিপক্ষে ভোজিনিয়ার পরিসংখ্যানও ছিল চমৎকার। সাতটি সেভের পাশাপাশি তিনি ৪২টি পাসের মধ্যে ২৯টি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। লং বলের সফলতার হার ছিল ৪৩ শতাংশ। এছাড়া তিনটি ডাইভিং সেভ এবং বক্সের ভেতর ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেছেন তিনি।

ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভোজিনিয়া। চোখের জলেই যেন প্রকাশ পেয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। তাঁর পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে বিবিসির বিশ্লেষক প্যাট নেভিন লিখেছেন, ‘পুরো ম্যাচে ভোজিনিয়াই ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ৪০ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তিনি যা করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। ম্যাচ শেষে সব ক্যামেরা তাঁর দিকেই ঘুরে যায়, আর সতীর্থরা দেখিয়ে দেন দলের প্রকৃত নায়ককে।’

সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার লি ডিক্সনও আবেগ লুকাতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, ‘এটি অসাধারণ এক পারফরম্যান্স। এই একটি পয়েন্ট কেপ ভার্দের প্রাপ্য ছিল। আজকের রাতটা শুধু তাদেরই। ভোজিনিয়াকে কাঁদতে দেখে আমারও আবেগাপ্লুত লাগছিল।’

ম্যাচের আগে ইনস্টাগ্রামে ভোজিনিয়ার অনুসারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৫ হাজার। ম্যাচ শেষে তা এক মিলিয়নের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি পরিণত হন বিশ্বকাপের নতুন নায়কে।

ভোজিনিয়ার কান্না তাই হতাশার নয়, আনন্দের। এটি ছোট দলের বড় স্বপ্নের প্রতীক। এটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সাহস আর বিশ্বাসের জয়গাথা। ফুটবল ইতিহাসে আন্ডারডগদের গল্প বারবার লেখা হয় না। কিন্তু যেদিন লেখা হয়, সেদিন সেটি হয়ে ওঠে অনন্ত অনুপ্রেরণার গল্প। আর সেই গল্পের নতুন নায়ক ভোজিনিয়া।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

অভিনেত্রীর আত্মহত্যা, মৃত্যুর আগে প্রেমিকের সঙ্গে স্ক্রীনশট ফাঁস

কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার চোখে আনন্দ অশ্রু

প্রকাশিত সময় : ১১:০১:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
স্পেন–কেপ ভার্দে ম্যাচ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে হংকংয়ের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র শাওলিন সকার-এর একটি দৃশ্য। সেখানে দেখা যায়, প্রতিপক্ষের একের পর এক শক্তিশালী শট ঠেকিয়ে যাচ্ছেন গোলরক্ষক। আগুনের গোলার মতো ছুটে আসা বল তাঁর শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করলেও তিনি অনড়।

সিনেমার সেই দৃশ্যের পাশে বসানো হয় কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার ছবি। যারা স্পেনের বিপক্ষে তাঁর অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখেছেন, তাদের কাছে এই তুলনা মোটেও অতিরঞ্জিত মনে হওয়ার কথা নয়। বরং বাস্তবের ভোজিনিয়া যেন সিনেমার কল্পনাকেও হার মানিয়েছেন।

বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী স্পেনের সামনে গোলপোস্টে একাই যেন প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। ম্যাচজুড়ে স্পেনের তারকা আক্রমণভাগকে অসহায় করে রেখে একের পর এক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেন তিনি। সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভের পাশাপাশি দুর্দান্ত পজিশনিংয়ে স্পেনের ফরোয়ার্ডদের জন্য প্রায় কোনো জায়গাই খোলা রাখেননি।

ফুটবলে গোলরক্ষকদের ভাগ্যে প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই বেশি জোটে। একটি ভুলে পুরো ম্যাচের দায় এসে পড়ে তাঁদের কাঁধে। কিন্তু এই ম্যাচে ভোজিনিয়া যেন গোলরক্ষকদের পক্ষেই এক অনন্য জয়গান লিখেছেন। পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন গোলকিপারও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।

স্পেনের আক্রমণের ধার এতটাই ছিল যে একপর্যায়ে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে মাঠে নামাতে হয় তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালকে। কিন্তু ১৮ বছর বয়সী এই বিস্ময়বালকও ভোজিনিয়ার সামনে বিশেষ কিছু করতে পারেননি।

মজার বিষয় হলো, ইয়ামাল যখন মাঠে নামেন, তখন তাঁর বয়স ১৮ বছর ৩৪২ দিন। অন্যদিকে ভোজিনিয়ার বয়স ৪০ বছর ২২ দিন। দুজনের বয়সের পার্থক্য ২১ বছর ৪৫ দিন, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে একই ম্যাচে প্রতিপক্ষ দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ বয়সের ব্যবধান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

পরিসংখ্যানও ভোজিনিয়ার কীর্তিকে আরও উজ্জ্বল করে। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে ৪০ বা তার বেশি বয়সী কোনো গোলরক্ষক মাত্র একবারই তাঁর চেয়ে বেশি সেভ করতে পেরেছেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে নিজের ৪১তম জন্মদিনে ব্রাজিলের বিপক্ষে উত্তর আয়ারল্যান্ডের কিংবদন্তি গোলরক্ষক প্যাট জেনিংস করেছিলেন ১০টি সেভ।

স্পেনের বিপক্ষে ভোজিনিয়ার পরিসংখ্যানও ছিল চমৎকার। সাতটি সেভের পাশাপাশি তিনি ৪২টি পাসের মধ্যে ২৯টি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। লং বলের সফলতার হার ছিল ৪৩ শতাংশ। এছাড়া তিনটি ডাইভিং সেভ এবং বক্সের ভেতর ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেছেন তিনি।

ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভোজিনিয়া। চোখের জলেই যেন প্রকাশ পেয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। তাঁর পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে বিবিসির বিশ্লেষক প্যাট নেভিন লিখেছেন, ‘পুরো ম্যাচে ভোজিনিয়াই ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ৪০ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তিনি যা করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। ম্যাচ শেষে সব ক্যামেরা তাঁর দিকেই ঘুরে যায়, আর সতীর্থরা দেখিয়ে দেন দলের প্রকৃত নায়ককে।’

সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার লি ডিক্সনও আবেগ লুকাতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, ‘এটি অসাধারণ এক পারফরম্যান্স। এই একটি পয়েন্ট কেপ ভার্দের প্রাপ্য ছিল। আজকের রাতটা শুধু তাদেরই। ভোজিনিয়াকে কাঁদতে দেখে আমারও আবেগাপ্লুত লাগছিল।’

ম্যাচের আগে ইনস্টাগ্রামে ভোজিনিয়ার অনুসারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৫ হাজার। ম্যাচ শেষে তা এক মিলিয়নের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি পরিণত হন বিশ্বকাপের নতুন নায়কে।

ভোজিনিয়ার কান্না তাই হতাশার নয়, আনন্দের। এটি ছোট দলের বড় স্বপ্নের প্রতীক। এটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সাহস আর বিশ্বাসের জয়গাথা। ফুটবল ইতিহাসে আন্ডারডগদের গল্প বারবার লেখা হয় না। কিন্তু যেদিন লেখা হয়, সেদিন সেটি হয়ে ওঠে অনন্ত অনুপ্রেরণার গল্প। আর সেই গল্পের নতুন নায়ক ভোজিনিয়া।