বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক এখন কেবল কূটনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দুই দেশের জনগণের দৈনন্দিন জীবনেও এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ সম্পর্ক আরো কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিজিটিএনের সাংবাদিক চেং শিয়া।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে রাইজিংবিডি ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
চেং শিয়া বলেন, “বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে এখন ‘অ্যাকশন-ওরিয়েন্টেড’ বা কর্মমুখী সম্পর্ক বলা যায়। ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক বক্তব্যের বাইরে এসে দুই দেশের অংশীদারিত্ব এখন বাস্তব উন্নয়ন প্রকল্প ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দৃশ্যমান হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীন। শুধু তাই নয়, দুই দেশের বাণিজ্য কাঠামোও পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে আমদানি বাড়াতে চীন ৯৮ শতাংশ শুল্কযোগ্য পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
প্রধানমন্ত্রীর চলমান চীন সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন চেং শিয়া। তার মতে, “দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর এবং এমন এক সময়ে এটি হচ্ছে, যখন দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরের ভিত্তি আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।”
তিনি বলেন, “এই সফর কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়। প্রধানমন্ত্রী চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং দালিয়ানে অনুষ্ঠিত সামার দাভোস ফোরামে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। এর মাধ্যমে নতুন সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে কৌশলগত আস্থার সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, এমন একটি স্পষ্ট বার্তা বিশ্বে পৌঁছাচ্ছে।”
চেং শিয়ার আরো বলেন, “পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ এবং কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো এখন আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই; এগুলো বাস্তবে চালু হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করছে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর এসব সফল প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরো বিস্তৃত করবে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মতো উদ্যোগও নতুন গতি পেতে পারে।”
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিজিটিএনের সাংবাদিক চেং শিয়া। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
বাংলাদেশে চীনের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, “অবকাঠামো ও বিনিয়োগের পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো খাতে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী বেইজিং।”
তার ভাষ্য, “চীন এমন খাতে বিনিয়োগ করতে চায়, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে। এছাড়া শিল্পপার্ক আধুনিকায়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে।”
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রসঙ্গে চেং শিয়া বলেন, “বাংলাদেশ-চীন প্রতিরক্ষা সম্পর্ক স্বচ্ছ এবং সম্পূর্ণভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর আওতায় আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা আরো শক্তিশালী করতে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
তিনি বলেন, “বিনিয়োগ হোক কিংবা নিরাপত্তা সহযোগিতা, সব ক্ষেত্রেই চীনের লক্ষ্য বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।”
গত ২২ জুন রাতে মালয়েশিয়া থেকে চীনের দালিয়ানে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে যোগ দেন তিনি। দালিয়ান থেকে গত ২৪ জুন দুপুরে হাই স্পিড ট্রেনে (বুলেট ট্রেন) বেইজিং যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এ ছাড়া চীনা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তারেক রহমান।
বেইজিংয়ে বিনিয়োগ সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন।
২৬ জুন সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

রিপোর্টারের নাম 




















