পাঁচ দিন ধরে চলা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অব্যাহত পাহাড়ধসে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত চার দিনে পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানে ২৯ জনের মৃত্যু হলো। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ার পাগলির ঝিরি এলাকায় শিশুসহ দুই পরিবারের পাঁচজন এবং কক্সাবাজারের চকরিয়া উপজেলার পহরচাঁদা-মছইন্যাকাটা এলাকায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও গতকাল রাঙামাটি জেলার ১২৬ স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক এবং চন্দ্রঘোনা-বাঙ্গালহালিয়ার সঙ্গে রাঙামাটির যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
গতকাল বান্দরবানের লামায় পাহাড়ধসে নিহতরা হলেন- পাগলির ঝিরি এলাকার মো. ইউনুস (৪০), তার স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫) ও তাদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মো. সোলেমান এবং একই এলাকার মো. জুয়েল (৩৪) ও তার স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৫)। কক্সবাজারের চকরিয়ায় নিহতরা হলোÑ পহরচাঁদা-মছইন্যাকাটা গ্রামের মৃত মো. কাজলের মেয়ে রুমি (১৪) ও আবদুল মজিদের ছেলে মো. তৌওছিফ (১২)।
এ নিয়ে গত চার দিনে পাহাড়ধসে ২৯ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে গত ৬ জুলাই সোমবার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৯ জন, পরদিন মঙ্গলবার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে তিনজন, বুধবার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও চট্টগ্রামে ৯ শিশুসহ ১০ জন এবং গতকাল সাতজনের মৃত্যু হয়।
প্রসঙ্গত, গতকাল সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গত ৫ দিনে পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢলে ৩০ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছে। উল্লিখিত ২৯ জন ছাড়াও পাহাড়ি ঢলে মারা যাওয়া ব্যক্তি হলেন রাঙামাটি সদর উপজেলার এক বৃদ্ধা।
বান্দরবানে নিহত ৫ : লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, উপজেলার মিশনপাড়ার মো. ইউনুচ, তার স্ত্রী ও সন্তান এবং মো. জুয়েল ও তার স্ত্রী কুলসুমা বেগম মাটি চাপা পড়ে মারা গেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, গতকাল ভোর চারটার দিকে পাহাড় ধসে পড়লে এলাকার মানুষ চিৎকার শুনতে পান। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সদস্যরা পৃথক স্থান থেকে মাটি চাপা পড়া অবস্থায় পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, একই এলাকায় পৃথক দুই ঘটনায় নিহত হয়েছে শিশুসহ পাঁচজন। মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।
এর বাইরেও বান্দরবান জেলার সদর ও বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। তবে তাতে ঘরবাড়ি ও গাছ-বাঁশের অবকাঠামো বিধ্বস্ত হলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
রাঙামাটিতে শতাধিক পাহাড়ধস : রাঙামাটিতে অতিবৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের কারণে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক এবং কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা-বাঙ্গালহালিয়া সড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল সকাল থেকে এসব সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানায়, গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কের সাপছড়ি ইউনিয়নের দেপ্পোছড়িমুখ এলাকায় পাহাড় ধসে পড়ে। এতে সড়কের ওপর বিশাল মাটির স্তূপ জমা হলে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের একটি দল মাটি সরানোর কাজ শুরু করলে এক ঘণ্টা চেষ্টার পর সড়কের এক পাশ দিয়ে হালকা ও ছোট যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
এ ছাড়া কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের মতিপাড়া এলাকায় চন্দ্রঘোনা-বাঙ্গালহালিয়া সড়কেও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল ভোর ৬টা থেকে এ সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। রাইখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মংক্য মারমা জানান, গত কয়েকদিনের প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে রাতের কোনো একসময় মতিপাড়া এলাকায় সড়কের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। সকাল থেকে এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি-মারিশ্যা-দিঘীনালা সড়কের ৩ কিলোমিটার এলাকায় রাস্তা ধসে যাওয়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন।
জেলার ১২৬টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনার তথ্য জানিয়েছেন রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন। এর মধ্যে কাপ্তাইয়ে ১৫টি, বাঘাইছড়িতে ৩২টি, কাউখালীতে ৩০টি, নানিয়ারচরে ২টি, রাঙামাটি সদরে ১০টি ও বিলাইছড়ি উপজেলায় ৩৭টি স্থানে পাহাড়ধস হয়েছে। রাঙামাটিতে বর্তমানে ৩৪টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৪ হাজার ২৬৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
রাঙামাটি সদর উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে ভেসে যাওয়ার দু’দিন পর দলমনি চাকমা (৭০) নামে এক বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পৃথক ঘটনায় জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে নিখোঁজ হয়েছেন মো. বদি আলম নামে এক মুদি ব্যবসায়ী। তার স্থায়ী বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটায়। তিনি ফারুয়া বাজারে ব্যবসা করতেন।
চকরিয়ায় দুই শিশুর মৃত্যু: টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পাহাড়ঘেঁষা একটি বসতঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এ সময় এক শিশুর মা গুরুতর আহত হন। গতকাল ভোর রাতে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের পহরচাঁদা-মছইন্যাকাটা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন- এলাকার মৃত মো. কাজলের মেয়ে রুমি (১৪) এবং আবদুল মজিদের ছেলে মো. তৌওছিফ (১২)। আহত রুমির মা লায়লা বেগম (৫৫) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. ছালেকুজ্জামান বলেন, গভীর রাতে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় টানা বৃষ্টিতে নরম হয়ে যাওয়া পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে তাদের বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে থাকা তিনজন মাটিচাপা পড়েন। চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর লাইলা বেগমকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও রুমি ও তৌওছিফকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আল ইব্রাহীম বলেন, কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পাহাড়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলেও বসবাসকারী পরিবারগুলোর অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে তারা ঝুঁকি নিয়েই সেখানে বসবাস করছিলেন। ঘটনার পরপর চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 























