শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভোটের জয় থেকে রাজনৈতিক বিদায়

দীর্ঘ ২০ বছর অবরুদ্ধ দশা, তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন এবং রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের পর অবসান ঘটল গাজায় হামাসের দীর্ঘদিনের বেসামরিক শাসনের। অবরুদ্ধ এ উপত্যকাটির প্রশাসনিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বাধীন টেকনোক্র্যাট (প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞ) পরিষদের কাছে হস্তান্তর করে নিজেদের ‘সরকারি জরুরি কমিটি’ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে হামাস। আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থনপুষ্ট ‘গাজা পিস কাউন্সিল’-এর অধীনে নবগঠিত ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ এখন থেকে এ ভূখণ্ডের প্রশাসনিক দেখভাল করবে।

২০০৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ফিলিস্তিনের সাধারণ নির্বাচনে হামাস এক অভূতপূর্ব সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৩২টি আসনের মধ্যে ৭৬টি আসনে জয়লাভ করে তারা তৎকালীন শাসকদল ফাতাহ-কে পরাজিত করে। নির্বাচনে অভাবনীয় জনসমর্থন থাকলেও পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েল এই গণতান্ত্রিক ফলাফল মেনে নেয়নি। এর পরপরই গাজার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অবরোধ আরোপ করা হয়। ২০০৭ সালে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর হামাস গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। জবাবে ইসরাইল জল, স্থল ও আকাশপথে সর্বাত্মক অবরোধ জোরালো করে, যার ফলে গাজার ৮০ শতাংশ মানুষ ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

অবরোধ ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযান মোকাবিলার পাশাপাশি গাজার বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনায় ২০১৪ সালে একটি প্রশাসনিক কমিটি গঠন করে হামাস। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে ২০১৭ সালে দলটির নতুন রাজনৈতিক ইশতেহার প্রকাশ এবং মিশরের চাপে ঐকমত্যের সরকার গঠনে ওই কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সমঝোতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ২০১৮ সালে সিভিল অ্যাফেয়ার্স পরিচালনার জন্য গঠিত হয় ‘গভর্নমেন্ট অ্যাকশন ফলোআপ কমিটি’।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর গাজায় ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। চলমান এই যুদ্ধে গাজার বেসামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি হামাসের প্রশাসনিক কাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তেহরানে হামাসের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ইসমাইল হানিয়াহ এবং ২০২৫ সালের মার্চে গাজার প্রশাসনিক প্রধান ইসাম আল-দাআলিস ইসরাইলি হামলায় নিহত হন। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় একটি ‘প্রশাসনিক শূন্যতা’ তৈরি করে বিকল্প শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই ইসরাইল এই হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউসের অনুমোদিত একটি যুদ্ধবিরতি ও অন্তর্বর্তী শাসন কাঠামোর আওতায় এ নতুন টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠিত হয়। গত ৬ জুলাই গাজার আল-আকসা শুনাহুদা হাসপাতালের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দেয় হামাস।

নতুন চুক্তি অনুযায়ী, গাজার স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা খাতের প্রায় ৪৫ হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের পদে বহাল থাকবেন, যাতে নাগরিক সেবা ব্যাহত না হয়। তবে এ পরিবর্তনকে বাঁকা চোখে দেখছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদন সার একে হামাসের একটি ‘চাল’ বলে অভিহিত করেছেন। তার দাবি, হামাস লেবাননের ‘হিজবুল্লাহ মডেল’ অনুসরণ করতে চাইছে, যেখানে বেসামরিক পৌরসেবা থাকবে টেকনোক্র্যাট সরকারের হাতে, কিন্তু মূল সামরিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে হামাসের কাছেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ নতুন কমিটি কাগজে-কলমে অরাজনৈতিক বলা হলেও এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই গঠিত হয়েছে। গাজার বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তি, স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবার এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বজনীন নীতি গ্রহণ করতে না পারলে এই নতুন অন্তর্বর্তী প্রশাসন গাজায় স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

ভোটের জয় থেকে রাজনৈতিক বিদায়

প্রকাশিত সময় : ১১:২৩:২৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘ ২০ বছর অবরুদ্ধ দশা, তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন এবং রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের পর অবসান ঘটল গাজায় হামাসের দীর্ঘদিনের বেসামরিক শাসনের। অবরুদ্ধ এ উপত্যকাটির প্রশাসনিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বাধীন টেকনোক্র্যাট (প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞ) পরিষদের কাছে হস্তান্তর করে নিজেদের ‘সরকারি জরুরি কমিটি’ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে হামাস। আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থনপুষ্ট ‘গাজা পিস কাউন্সিল’-এর অধীনে নবগঠিত ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ এখন থেকে এ ভূখণ্ডের প্রশাসনিক দেখভাল করবে।

২০০৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ফিলিস্তিনের সাধারণ নির্বাচনে হামাস এক অভূতপূর্ব সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৩২টি আসনের মধ্যে ৭৬টি আসনে জয়লাভ করে তারা তৎকালীন শাসকদল ফাতাহ-কে পরাজিত করে। নির্বাচনে অভাবনীয় জনসমর্থন থাকলেও পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েল এই গণতান্ত্রিক ফলাফল মেনে নেয়নি। এর পরপরই গাজার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অবরোধ আরোপ করা হয়। ২০০৭ সালে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর হামাস গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। জবাবে ইসরাইল জল, স্থল ও আকাশপথে সর্বাত্মক অবরোধ জোরালো করে, যার ফলে গাজার ৮০ শতাংশ মানুষ ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

অবরোধ ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযান মোকাবিলার পাশাপাশি গাজার বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনায় ২০১৪ সালে একটি প্রশাসনিক কমিটি গঠন করে হামাস। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে ২০১৭ সালে দলটির নতুন রাজনৈতিক ইশতেহার প্রকাশ এবং মিশরের চাপে ঐকমত্যের সরকার গঠনে ওই কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সমঝোতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ২০১৮ সালে সিভিল অ্যাফেয়ার্স পরিচালনার জন্য গঠিত হয় ‘গভর্নমেন্ট অ্যাকশন ফলোআপ কমিটি’।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর গাজায় ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। চলমান এই যুদ্ধে গাজার বেসামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি হামাসের প্রশাসনিক কাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তেহরানে হামাসের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ইসমাইল হানিয়াহ এবং ২০২৫ সালের মার্চে গাজার প্রশাসনিক প্রধান ইসাম আল-দাআলিস ইসরাইলি হামলায় নিহত হন। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় একটি ‘প্রশাসনিক শূন্যতা’ তৈরি করে বিকল্প শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই ইসরাইল এই হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউসের অনুমোদিত একটি যুদ্ধবিরতি ও অন্তর্বর্তী শাসন কাঠামোর আওতায় এ নতুন টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠিত হয়। গত ৬ জুলাই গাজার আল-আকসা শুনাহুদা হাসপাতালের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দেয় হামাস।

নতুন চুক্তি অনুযায়ী, গাজার স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা খাতের প্রায় ৪৫ হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের পদে বহাল থাকবেন, যাতে নাগরিক সেবা ব্যাহত না হয়। তবে এ পরিবর্তনকে বাঁকা চোখে দেখছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদন সার একে হামাসের একটি ‘চাল’ বলে অভিহিত করেছেন। তার দাবি, হামাস লেবাননের ‘হিজবুল্লাহ মডেল’ অনুসরণ করতে চাইছে, যেখানে বেসামরিক পৌরসেবা থাকবে টেকনোক্র্যাট সরকারের হাতে, কিন্তু মূল সামরিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে হামাসের কাছেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ নতুন কমিটি কাগজে-কলমে অরাজনৈতিক বলা হলেও এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই গঠিত হয়েছে। গাজার বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তি, স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবার এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বজনীন নীতি গ্রহণ করতে না পারলে এই নতুন অন্তর্বর্তী প্রশাসন গাজায় স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হতে পারে।