ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করলেই কি সুখের সংসার নিশ্চিত? সিনেমা, নাটক কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই এমন একটি ধারণা তুলে ধরা হয় যে, সত্যিকারের ভালোবাসা থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তব জীবন কি সত্যিই এতটা সহজ?
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি জরিপ বলছে, শুধু ভালোবাসা নয়—একটি সুখী ও দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্যের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া, খোলামেলা যোগাযোগ, মানসিক পরিপক্বতা এবং একে অপরের প্রতি সম্মান।
ইন্ডিয়া টুডে-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাচমেকিং অ্যাপ রিবাউন্স ২৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৯ হাজার ৬৮৪ জন বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া বা আলাদা থাকা নারী-পুরুষের ওপর একটি জরিপ চালায়। অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে, বিয়ে ও ভালোবাসা নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণাই বাস্তব জীবনের সঙ্গে মেলে না।
বিয়ের আয়োজনেই বেশি গুরুত্ব
জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের ৮ জন জানিয়েছেন, তারা বিয়ের অনুষ্ঠান, পোশাক, সাজসজ্জা ও আয়োজন নিয়ে যতটা সময় ব্যয় করেছেন, তার তুলনায় ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর সঙ্গে মানসিক, আর্থিক বা মূল্যবোধের মিল রয়েছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করেছেন অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের আগে শুধু ভালো লাগা নয়, বরং জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, দায়িত্ব ভাগাভাগি, সন্তান, ক্যারিয়ার কিংবা পারিবারিক প্রত্যাশা নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন।
এসব বিষয়ে আগেই পরিষ্কার ধারণা থাকলে ভবিষ্যতে ভুল-বোঝাবুঝি অনেকটাই কমে।
সঙ্গীকে জানার আগ্রহ হারিয়ে যায়?
জরিপে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৪৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তারা একসময় ধরে নিয়েছিলেন যে সঙ্গীকে পুরোপুরি জেনে ফেলেছেন। কিন্তু এই ধারণাই ধীরে ধীরে সম্পর্কের কৌতূহল কমিয়ে দেয়।
সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তা, স্বপ্ন, অভ্যাস ও চাহিদা বদলে যায়।
তাই সম্পর্ক ভালো রাখতে নিয়মিত কথা বলা, একে অপরের অনুভূতি জানার চেষ্টা করা এবং নতুন করে সঙ্গীকে আবিষ্কার করার মানসিকতা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু একজনের ত্যাগে সম্পর্ক টেকে না
জরিপে ৩৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, ভালোবাসার নামে বারবার একজন যদি নিজের ইচ্ছা বা প্রয়োজনকে বিসর্জন দেন, তাহলে একসময় সেই ত্যাগ ক্ষোভে পরিণত হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সুস্থ সম্পর্কে সমঝোতা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেটি যদি একতরফা হয়, তাহলে সম্পর্কে ভারসাম্য নষ্ট হয়। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দুজনেরই সমান দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন।
ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবতা
রিবাউন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রবি মিত্তল বলেন, অনেকেই প্রথম বিয়েতে এমন বিশ্বাস নিয়ে প্রবেশ করেন যে ভালোবাসা থাকলেই সব সমস্যা একসময় ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে অমীমাংসিত সমস্যা, যোগাযোগের ঘাটতি বা মূল্যবোধের অমিল উপেক্ষা করলে তা ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
তার মতে, ভালোবাসা একটি সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু সেই ভিত্তিকে শক্ত রাখতে প্রয়োজন বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নিয়মিত যোগাযোগ।
সুখী দাম্পত্যের জন্য কী জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের আগে এবং পরে কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ—
খোলামেলা ও নিয়মিত যোগাযোগ
অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা
একে অপরের মতামত ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান
মতবিরোধ হলে দোষারোপ না করে সমাধানের চেষ্টা
পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকেও মানিয়ে নেওয়ার মানসিকত
সম্পর্কের যত্নও প্রয়োজন
যেমন একটি গাছ শুধু রোপণ করলেই বেড়ে ওঠে না, নিয়মিত পরিচর্যাও প্রয়োজন হয়; তেমনি ভালোবাসাও শুধু প্রকাশ করলেই যথেষ্ট নয়। সময় দেওয়া, একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করা, সম্মান করা এবং ছোট ছোট বিষয়েও পাশে থাকা—এসবই একটি সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে।
উল্লেখ্য জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ভালোবাসার গুরুত্ব অস্বীকার করেননি। বরং তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, ভালোবাসার সঙ্গে যদি বিশ্বাস, বোঝাপড়া ও দায়িত্ববোধ যুক্ত হয়, তবেই একটি সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 























