সিলেটে পুলিশি নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদ হত্যা মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, দুজনের যাবজ্জীবন এবং মামলার বাকি তিন আসামির সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সাজাপ্রাপ্ত ছয় আসামির পাঁচজনই সাবেক পুলিশ সদস্য। ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর সিলেট মহানগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। পরদিন তার মৃত্যু হয়। তার শরীরে ৯৩টি আঘাতের চিহ্ন ছিল, আঘাতের ফলে তার চামড়ার ভেতর রক্ত জমে যায়। এ ছাড়া তার হাত ও পায়ের আঙলের নখ তুলে ফেলায় হয় বলে মামলার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের সরকারি কৌঁসুলী (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন জানান, মামলায় মোট ৬৩ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ৬ আসামির মধ্যে পুলিশের বহিস্কৃত এসআই আকবর হোসেন ভূঞার মৃত্যুদণ্ড এবং পুলিশের আরও দুই সদস্য কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস এবং কনস্টেবল হারুন অর রশীদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। বাকি তিন আসামির মধ্যে বহিস্কৃত এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই হাসান উদ্দিন ও সংবাদকর্মী আব্দুল্লাহ আল নোমানকে সাত বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে সংবাদকর্মী নোমান শুরু থেকেই পলাতক। এ ছাড়া বরখাস্তকৃত এএসআই আশেক এলাহী ছাড়া বাকিরা সবাই গ্রেপ্তারের পর উচ্চ আদালত খেকে জামিন নিয়ে পলাতক হন। সবশেষ হাইকোর্ট থেকে জামিন পান মামলার প্রধান আসামি তৎকালীন বন্দরবাজার ফাঁড়ির সাবেক ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়া। গত বছরের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে জামিন এবং ১০ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। পরে তার জামিন স্থগিত হলেও তিনি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ না করে পলাতক রয়েছেন। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে জানা গেছে।
রায় ঘোষণার জন্য দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কারাগারে থাকা মামলা একমাত্র আসামি পুলিশের বহিস্কৃত এএসআই আশেক এলাহীকে আদালতে আনা হয়।
আদালতে উপস্থিত রায়হান আহমদের মা সালমা বেগম ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘রায়ে প্রাথমিকভাবে আমরা সন্তুষ্ট। তবে রায় শুনে কী করবো! আমার রায়হানকে যারা নির্যতন করে মারছে তারা তো পালিয়ে গেছে। আজকে তো শুধু কাগজে কলমে রায় হবে। আসামিরা তো শাস্তি পাচ্ছে না। আসামিরা শাস্তি না পেলে তো আমার ৬ বছরের অপেক্ষা আর কষ্ট বিফলে গেলো।’
তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর একজনেরও জামিন হয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে মামলার আর্গুমেন্ট শেষ হওয়ার পরও কীভাবে প্রথম তিনজন আসামিই জামিন পায়? জামিন পেয়ে কীভাব তারা পালিয়ে যায়?’
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতের দিকে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। পরদিন ১১ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়। পুলিশ শুরুতে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে রায়হানের স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করলে তদন্তে নির্যাতনের সত্যতা পাওয়া যায়। এর পর এসআই আকবরসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়।
পরবর্তীতে কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই এবং ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর কানাইঘাট সীমান্ত থেকে প্রধান অভিযুক্ত আকবরকে আটক করে। ২০২১ সালের ৫ মে আদালতে পিবিআই অভিযোগপত্র জমা দেয়। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
২০২১ সালের ৫ মে আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পিবিআই। অভিযোগপত্রে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে (৩২) প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহী (৪৩), কনস্টেবল মো. হারুন অর রশিদ (৩২), টিটু চন্দ্র দাস (৩৮), এসআই মো. হাসান উদ্দিন (৩২) ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমান (৩২)।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 
























