বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পদত্যাগ করলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রুশনারা আলী

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রুশনারা আলী যুক্তরাজ্যের গৃহহীনবিষয়ক মিনিস্টারের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

শুক্রবার নিজের ফেসবুক পেইজে পদত্যাগপত্রের একটি ছবি প্রকাশ করেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ ডাউনিং স্ট্রিট এক বিবৃতিতে রুশনারা আলীর পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে নিজের মালিকানাধীন একটি টাউনহাউস থেকে ভাড়াটেদের উচ্ছেদ করে ভাড়া একলাফে ৭০০ পাউন্ড বাড়িয়ে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব লন্ডনের বো এলাকায় অবস্থিত রুশনারা আলীর ওই বাড়িতে মাসিক ৩ হাজার ৩০০ পাউন্ড ভাড়ায় ৪ জন ভাড়াটে থাকতেন। তাদের নির্ধারিত মেয়াদি চুক্তি শেষ হওয়ার পর গত নভেম্বর মাসে ৪ মাসের নোটিশ দিয়ে বাড়ি ছাড়তে বলা হয়। পরে বাড়িটি পুনরায় ভাড়ার জন্য ৪ হাজার পাউন্ড মাসিক ভাড়ায় তালিকাভুক্ত করা হয়। এ নিয়ে গৃহহীনদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী রুশনারা আলীর ব্যাপক সমালোচনা হয়।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে রুশনারা আলী লিখেছেন, সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী কাজের পথে আমার অবস্থান যেন বিভ্রান্তির কারণ না হয়, সে জন্য আমি এই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি।

তিনি আরও লেখেন, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি পদত্যাগ করছি। আমি দায়িত্ব পালনে আন্তরিক থেকেছি এবং আমার কাজের নথিই তার প্রমাণ। তবে এখন এটা স্পষ্ট, মন্ত্রিত্বে থাকলে তা সরকারের কাজের প্রতি মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাবে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিচ্ছি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার বেথনালগ্রিন ও স্টেপনি আসন থেকে তিনি ৫ম বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। পরে লেবার পার্টি সরকার গঠন করলে গৃহায়ণ, কমিউনিটি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি আন্ডার সেক্রেটারি (উপমন্ত্রী) হন রুশনারা আলী।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্য সরকারের এই পদটিকে ‘হোমলেসনেস মিনিস্টার’ বা গৃহহীনবিষয়ক মিনিস্টার বলা হয়।

এদিকে রুশনারা আলীর পক্ষ থেকে বলা হয়, ভাড়াটেরা চুক্তির পুরো মেয়াদ বসবাস করেছেন এবং চাইলে আরও থাকার সুযোগ ছিল। তবে তারা নিজ ইচ্ছায় চলে যান।

অন্যদিকে রেন্টার্স রিফর্ম কোয়ালিশন এবং ভাড়াটে অধিকার সংগঠন অ্যাকর্ন রুশনারা আলীর পদত্যাগ দাবি করে। অ্যাকর্নের কর্মকর্তা অ্যানি কুলাম বলেন, ‘তার কর্মকাণ্ড রেন্টার্স রাইটস (ভাড়াটে অধিকার) বিলের মূল উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।’

জানা গেছে, রুশনারা আলী নিজেই চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘রেন্টার্স রাইটস বিলের’ পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, যেখানে বলা হয়, কোনো বাড়িওয়ালা ভাড়াটেকে বের করে ৬ মাসের মধ্যে সেই বাড়ি বেশি দামে ভাড়া দিতে পারবেন না।

রুশনারার সমালোচনা করে কনজারভেটিভ পার্টির শ্যাডো হাউজিং (ছায়া আবাসন) সেক্রেটারি জেমস ক্লেভারলি বলেন, ‘এটি চরম ভণ্ডামির উদাহরণ। এমন একজনকে গৃহহীনবিষয়ক দায়িত্বে রাখা উচিত নয়।’

মূলত রুশনারার বাড়ি নিয়ে ওই ঘটনা প্রথম প্রকাশ করে আইপেপার। বাড়িটির এক সাবেক ভাড়াটিয়ার বরাতে পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নভেম্বরে চুক্তি নবায়ন করা হবে না জানিয়ে তাদের ৪ মাসের সময় দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনায় গ্রিন পার্টিও সমালোচনা করে বলে, এ ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, ভাড়াটেদের সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রয়োজন, যেখানে থাকবে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং কোনো দোষ না করলে ভাড়াটে উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করার বিধান থাকবে।

প্রসঙ্গত, রুশনারার সঙ্গে আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকী গত বছর যুক্তরাজ্য সরকারে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘সিটি মিনিস্টার’ করা হয়েছিল তাকে। তবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়ে সমালোচনার মুখে গত ১৪ জানুয়ারি তিনিও পদত্যাগ করেন।

উল্লেখ্য, রুশনারার জন্ম সিলেটে। রুশনারার বয়স যখন সাত বছর, তখন যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমায় তার পরিবার। তিনি অক্সফোর্ডের সেন্ট জনস কলেজ থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে স্নাতক করেছেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

পদত্যাগ করলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রুশনারা আলী

প্রকাশিত সময় : ১২:০৪:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ অগাস্ট ২০২৫

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রুশনারা আলী যুক্তরাজ্যের গৃহহীনবিষয়ক মিনিস্টারের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

শুক্রবার নিজের ফেসবুক পেইজে পদত্যাগপত্রের একটি ছবি প্রকাশ করেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ ডাউনিং স্ট্রিট এক বিবৃতিতে রুশনারা আলীর পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে নিজের মালিকানাধীন একটি টাউনহাউস থেকে ভাড়াটেদের উচ্ছেদ করে ভাড়া একলাফে ৭০০ পাউন্ড বাড়িয়ে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব লন্ডনের বো এলাকায় অবস্থিত রুশনারা আলীর ওই বাড়িতে মাসিক ৩ হাজার ৩০০ পাউন্ড ভাড়ায় ৪ জন ভাড়াটে থাকতেন। তাদের নির্ধারিত মেয়াদি চুক্তি শেষ হওয়ার পর গত নভেম্বর মাসে ৪ মাসের নোটিশ দিয়ে বাড়ি ছাড়তে বলা হয়। পরে বাড়িটি পুনরায় ভাড়ার জন্য ৪ হাজার পাউন্ড মাসিক ভাড়ায় তালিকাভুক্ত করা হয়। এ নিয়ে গৃহহীনদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী রুশনারা আলীর ব্যাপক সমালোচনা হয়।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে রুশনারা আলী লিখেছেন, সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী কাজের পথে আমার অবস্থান যেন বিভ্রান্তির কারণ না হয়, সে জন্য আমি এই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি।

তিনি আরও লেখেন, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি পদত্যাগ করছি। আমি দায়িত্ব পালনে আন্তরিক থেকেছি এবং আমার কাজের নথিই তার প্রমাণ। তবে এখন এটা স্পষ্ট, মন্ত্রিত্বে থাকলে তা সরকারের কাজের প্রতি মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাবে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিচ্ছি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার বেথনালগ্রিন ও স্টেপনি আসন থেকে তিনি ৫ম বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। পরে লেবার পার্টি সরকার গঠন করলে গৃহায়ণ, কমিউনিটি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি আন্ডার সেক্রেটারি (উপমন্ত্রী) হন রুশনারা আলী।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্য সরকারের এই পদটিকে ‘হোমলেসনেস মিনিস্টার’ বা গৃহহীনবিষয়ক মিনিস্টার বলা হয়।

এদিকে রুশনারা আলীর পক্ষ থেকে বলা হয়, ভাড়াটেরা চুক্তির পুরো মেয়াদ বসবাস করেছেন এবং চাইলে আরও থাকার সুযোগ ছিল। তবে তারা নিজ ইচ্ছায় চলে যান।

অন্যদিকে রেন্টার্স রিফর্ম কোয়ালিশন এবং ভাড়াটে অধিকার সংগঠন অ্যাকর্ন রুশনারা আলীর পদত্যাগ দাবি করে। অ্যাকর্নের কর্মকর্তা অ্যানি কুলাম বলেন, ‘তার কর্মকাণ্ড রেন্টার্স রাইটস (ভাড়াটে অধিকার) বিলের মূল উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।’

জানা গেছে, রুশনারা আলী নিজেই চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘রেন্টার্স রাইটস বিলের’ পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, যেখানে বলা হয়, কোনো বাড়িওয়ালা ভাড়াটেকে বের করে ৬ মাসের মধ্যে সেই বাড়ি বেশি দামে ভাড়া দিতে পারবেন না।

রুশনারার সমালোচনা করে কনজারভেটিভ পার্টির শ্যাডো হাউজিং (ছায়া আবাসন) সেক্রেটারি জেমস ক্লেভারলি বলেন, ‘এটি চরম ভণ্ডামির উদাহরণ। এমন একজনকে গৃহহীনবিষয়ক দায়িত্বে রাখা উচিত নয়।’

মূলত রুশনারার বাড়ি নিয়ে ওই ঘটনা প্রথম প্রকাশ করে আইপেপার। বাড়িটির এক সাবেক ভাড়াটিয়ার বরাতে পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নভেম্বরে চুক্তি নবায়ন করা হবে না জানিয়ে তাদের ৪ মাসের সময় দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনায় গ্রিন পার্টিও সমালোচনা করে বলে, এ ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, ভাড়াটেদের সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রয়োজন, যেখানে থাকবে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং কোনো দোষ না করলে ভাড়াটে উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করার বিধান থাকবে।

প্রসঙ্গত, রুশনারার সঙ্গে আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকী গত বছর যুক্তরাজ্য সরকারে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘সিটি মিনিস্টার’ করা হয়েছিল তাকে। তবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়ে সমালোচনার মুখে গত ১৪ জানুয়ারি তিনিও পদত্যাগ করেন।

উল্লেখ্য, রুশনারার জন্ম সিলেটে। রুশনারার বয়স যখন সাত বছর, তখন যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমায় তার পরিবার। তিনি অক্সফোর্ডের সেন্ট জনস কলেজ থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে স্নাতক করেছেন।