বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাত্র ১০ মিনিটেই ২৫৪ জনকে হত্যা করে ইসরায়েল, আহত ১১০০

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র লেবাননে তাণ্ডব চালিয়েছে ইসরায়েল। গত মাসে দখলদার বাহিনীর বর্বর হামলা শুরুর পর গতকাল বুধবার সবচেয়ে বড় আঘাত হানা হয়েছে লেবানিজ ভূখণ্ডে। এতে অন্তত ২৫৪ জন নিহত এবং ১১০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে।

মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রাজধানী বৈরুতে, যেখানে ৯১ জন নিহত হয়েছেন। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ১৮২ জন, যা চূড়ান্ত নয়।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, বুধবার বিকেলে বৈরুতে পরপর অন্তত পাঁচটি হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, এটি ছিল চলমান যুদ্ধে তাদের সবচেয়ে বড় সমন্বিত হামলা। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে বৈরুত, বেকা উপত্যকা এবং দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ১০০টিরও বেশি কমান্ড সেন্টার ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ভোরে হিজবুল্লাহ জানায়, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তারা মানারা নামের একটি ছোট কিবুতজে রকেট হামলা চালিয়েছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, “আমাদের দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি-মার্কিন আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।”

গত ২ মার্চ শুরু হওয়া যুদ্ধের মধ্যে বুধবার ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। এর দুই দিন আগে ইরান-এর ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে হিজবুল্লাহ তেহরানের সমর্থনে ইসরায়েলে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল পূর্ণাঙ্গ বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করে।

রয়টার্সের সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, বৈরুতের পশ্চিমাঞ্চলের একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্মীরা ক্রেন ব্যবহার করে এক বৃদ্ধাকে উদ্ধার করছেন। হামলায় ভবনটির অর্ধেক অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ওপরের তলার বাসিন্দারা আটকা পড়েন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় আহতদের মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, “লেবাননে আজ যে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তার মাত্রা ভয়াবহ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন ঘটনা অবিশ্বাস্য।”

এ দিকে বুধবার গভীর রাতে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে ধর্মঘট শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্য দিকে লেবানন যুদ্ধবিরতির অংশ নয় বলে জানিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার সন্ধ্যায় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত নয় এবং ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স-ও একই কথা জানিয়েছেন। ভ্যান্স বলেন, “আমার মনে হয় ভুল বোঝাবুঝি থেকেই এ ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। ইরান হয়তো ভেবেছিল যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা নয়।”

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী শাহবাজ শরীফ বলেছিলেন, এই যুদ্ধবিরতিতে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এদিকে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ তিনটি লেবানিজ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, বুধবার ভোরেই তারা ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বন্ধ করেছিল। সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম আল-মুসাউই বলেন, “আমাদের জানানো হয়েছিল এটি যুদ্ধবিরতির অংশ—তাই আমরা তা মেনে চলেছি। কিন্তু ইসরায়েল বরাবরের মতোই তা লঙ্ঘন করেছে এবং সারা লেবানন জুড়ে গণহত্যা চালিয়েছে।”

সূত্র: রয়টার্স

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

মাত্র ১০ মিনিটেই ২৫৪ জনকে হত্যা করে ইসরায়েল, আহত ১১০০

প্রকাশিত সময় : ১০:২৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র লেবাননে তাণ্ডব চালিয়েছে ইসরায়েল। গত মাসে দখলদার বাহিনীর বর্বর হামলা শুরুর পর গতকাল বুধবার সবচেয়ে বড় আঘাত হানা হয়েছে লেবানিজ ভূখণ্ডে। এতে অন্তত ২৫৪ জন নিহত এবং ১১০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে।

মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রাজধানী বৈরুতে, যেখানে ৯১ জন নিহত হয়েছেন। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ১৮২ জন, যা চূড়ান্ত নয়।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, বুধবার বিকেলে বৈরুতে পরপর অন্তত পাঁচটি হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, এটি ছিল চলমান যুদ্ধে তাদের সবচেয়ে বড় সমন্বিত হামলা। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে বৈরুত, বেকা উপত্যকা এবং দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ১০০টিরও বেশি কমান্ড সেন্টার ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ভোরে হিজবুল্লাহ জানায়, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তারা মানারা নামের একটি ছোট কিবুতজে রকেট হামলা চালিয়েছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, “আমাদের দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি-মার্কিন আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।”

গত ২ মার্চ শুরু হওয়া যুদ্ধের মধ্যে বুধবার ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। এর দুই দিন আগে ইরান-এর ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে হিজবুল্লাহ তেহরানের সমর্থনে ইসরায়েলে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল পূর্ণাঙ্গ বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করে।

রয়টার্সের সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, বৈরুতের পশ্চিমাঞ্চলের একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্মীরা ক্রেন ব্যবহার করে এক বৃদ্ধাকে উদ্ধার করছেন। হামলায় ভবনটির অর্ধেক অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ওপরের তলার বাসিন্দারা আটকা পড়েন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় আহতদের মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, “লেবাননে আজ যে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তার মাত্রা ভয়াবহ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন ঘটনা অবিশ্বাস্য।”

এ দিকে বুধবার গভীর রাতে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে ধর্মঘট শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্য দিকে লেবানন যুদ্ধবিরতির অংশ নয় বলে জানিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার সন্ধ্যায় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত নয় এবং ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স-ও একই কথা জানিয়েছেন। ভ্যান্স বলেন, “আমার মনে হয় ভুল বোঝাবুঝি থেকেই এ ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। ইরান হয়তো ভেবেছিল যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা নয়।”

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী শাহবাজ শরীফ বলেছিলেন, এই যুদ্ধবিরতিতে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এদিকে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ তিনটি লেবানিজ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, বুধবার ভোরেই তারা ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বন্ধ করেছিল। সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম আল-মুসাউই বলেন, “আমাদের জানানো হয়েছিল এটি যুদ্ধবিরতির অংশ—তাই আমরা তা মেনে চলেছি। কিন্তু ইসরায়েল বরাবরের মতোই তা লঙ্ঘন করেছে এবং সারা লেবানন জুড়ে গণহত্যা চালিয়েছে।”

সূত্র: রয়টার্স