সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রীলঙ্কায় ১১৮ বছরের প্রাচীন দৃষ্টিনন্দন মসজিদ

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা পেট্টাহতে অবস্থিত শত বছরের পুরনো লাল-সাদা ডোরাকাটা দৃষ্টিনন্দন এক মসজিদ, যার নাম জামি-উল-আলফার মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘রেড মসজিদ’, ‘রাথু পল্লিয়া’ বা ‘সাম্মান কোট্টু পল্লি’ নামেও পরিচিত। সেকেন্ড ক্রস স্ট্রিটে অবস্থিত এই মসজিদ শুধু একটি ইবাদতখানা নয়, বরং ইতিহাস, স্থাপত্য ও মুসলিম ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন।

ইতিহাসবিদদের মতে, কলম্বোর প্রাচীনতম মসজিদগুলোর একটি এই জামি-উল-আলফার মসজিদ।

১৯০৮ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং মাত্র এক বছরের মধ্যেই ১৯০৯ সালে তা সম্পন্ন হয়। তৎকালীন পেট্টাহ এলাকায় বসবাসকারী ভারতীয় মুসলিম ব্যবসায়ীরা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং শুক্রবারের জুমার নামাজ আদায়ের জন্য একটি উপযুক্ত স্থানের প্রয়োজন অনুভব করেন। তাঁদের উদ্যোগেই গড়ে ওঠে আজকের এই দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক মসজিদ।
মসজিদটির নকশা ও নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন মেধাবী শিল্পী হাবিবু লেব্বে সাইবু লেব্বে।

যদিও তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা ডিগ্রি ছিল না, তবু মহান আল্লাহ তাঁকে অসাধারণ প্রতিভাধর স্থপতি বানিয়েছিলেন। ফলে দক্ষিণ ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাঁকে ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্যশৈলীর বিভিন্ন নকশা ও চিত্র সরবরাহ করলে সেগুলোর ভিত্তিতেই তিনি এই অনন্য স্থাপত্য গড়ে তোলেন।
স্থাপত্যের দিক থেকে এই মসজিদ সত্যিই ব্যতিক্রম। এখানে দেশীয় ইন্দো-ইসলামিক ও ভারতীয় স্থাপত্যের উপাদানের সঙ্গে গথিক রিভাইভাল এবং নিও-ক্লাসিক্যাল শৈলীর এক চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়।

লাল-সাদা ক্যান্ডি-স্ট্রাইপ নকশার দুইতলা ভবন, সঙ্গে একটি ঘড়ির টাওয়ার—সব মিলিয়ে এটি যেন চোখ জুড়ানো এক শিল্পকর্ম। এর গঠনশৈলী মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থিত জামেক মসজিদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা নির্মিত হয়েছিল ১৯১০ সালে।
শুরুতে এই মসজিদে প্রায় দেড় হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন, যদিও সে সময় নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন প্রায় ৫০০ জন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় মসজিদটির সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে হাজি ওমর ট্রাস্টের সহযোগিতায় মসজিদ কর্তৃপক্ষ আশপাশের কিছু জমি ক্রয় করে এবং সম্প্রসারণ কাজ শুরু করে।

এর ফলে বর্তমানে মসজিদটির ধারণক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মুসল্লিতে উন্নীত হয়েছে।
একসময়, যখন কলম্বো শহরে তেমন উঁচু বা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা ছিল না, তখন সমুদ্রপথে আসা নাবিকদের কাছে এই মসজিদই ছিল শহরের প্রধান ল্যান্ডমার্ক। দূর থেকেই এর লাল-সাদা গঠন চোখে পড়ত, যা তাদের বন্দর শহরের অবস্থান চিনিয়ে দিত।

আজও জামি-উল-আলফার মসজিদ শুধু মুসল্লিদের ইবাদতের স্থান নয়, এটি কলম্বোর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। প্রতিদিন অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটক এর অনন্য স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেখতে এখানে আসেন। ধর্মীয় গুরুত্ব, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে এই মসজিদ নিঃসন্দেহে শ্রীলঙ্কার এক অমূল্য সম্পদ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

শ্রীলঙ্কায় ১১৮ বছরের প্রাচীন দৃষ্টিনন্দন মসজিদ

প্রকাশিত সময় : ১২:৪৯:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা পেট্টাহতে অবস্থিত শত বছরের পুরনো লাল-সাদা ডোরাকাটা দৃষ্টিনন্দন এক মসজিদ, যার নাম জামি-উল-আলফার মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘রেড মসজিদ’, ‘রাথু পল্লিয়া’ বা ‘সাম্মান কোট্টু পল্লি’ নামেও পরিচিত। সেকেন্ড ক্রস স্ট্রিটে অবস্থিত এই মসজিদ শুধু একটি ইবাদতখানা নয়, বরং ইতিহাস, স্থাপত্য ও মুসলিম ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন।

ইতিহাসবিদদের মতে, কলম্বোর প্রাচীনতম মসজিদগুলোর একটি এই জামি-উল-আলফার মসজিদ।

১৯০৮ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং মাত্র এক বছরের মধ্যেই ১৯০৯ সালে তা সম্পন্ন হয়। তৎকালীন পেট্টাহ এলাকায় বসবাসকারী ভারতীয় মুসলিম ব্যবসায়ীরা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং শুক্রবারের জুমার নামাজ আদায়ের জন্য একটি উপযুক্ত স্থানের প্রয়োজন অনুভব করেন। তাঁদের উদ্যোগেই গড়ে ওঠে আজকের এই দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক মসজিদ।
মসজিদটির নকশা ও নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন মেধাবী শিল্পী হাবিবু লেব্বে সাইবু লেব্বে।

যদিও তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা ডিগ্রি ছিল না, তবু মহান আল্লাহ তাঁকে অসাধারণ প্রতিভাধর স্থপতি বানিয়েছিলেন। ফলে দক্ষিণ ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাঁকে ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্যশৈলীর বিভিন্ন নকশা ও চিত্র সরবরাহ করলে সেগুলোর ভিত্তিতেই তিনি এই অনন্য স্থাপত্য গড়ে তোলেন।
স্থাপত্যের দিক থেকে এই মসজিদ সত্যিই ব্যতিক্রম। এখানে দেশীয় ইন্দো-ইসলামিক ও ভারতীয় স্থাপত্যের উপাদানের সঙ্গে গথিক রিভাইভাল এবং নিও-ক্লাসিক্যাল শৈলীর এক চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়।

লাল-সাদা ক্যান্ডি-স্ট্রাইপ নকশার দুইতলা ভবন, সঙ্গে একটি ঘড়ির টাওয়ার—সব মিলিয়ে এটি যেন চোখ জুড়ানো এক শিল্পকর্ম। এর গঠনশৈলী মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থিত জামেক মসজিদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা নির্মিত হয়েছিল ১৯১০ সালে।
শুরুতে এই মসজিদে প্রায় দেড় হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন, যদিও সে সময় নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন প্রায় ৫০০ জন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে থাকায় মসজিদটির সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে হাজি ওমর ট্রাস্টের সহযোগিতায় মসজিদ কর্তৃপক্ষ আশপাশের কিছু জমি ক্রয় করে এবং সম্প্রসারণ কাজ শুরু করে।

এর ফলে বর্তমানে মসজিদটির ধারণক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মুসল্লিতে উন্নীত হয়েছে।
একসময়, যখন কলম্বো শহরে তেমন উঁচু বা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা ছিল না, তখন সমুদ্রপথে আসা নাবিকদের কাছে এই মসজিদই ছিল শহরের প্রধান ল্যান্ডমার্ক। দূর থেকেই এর লাল-সাদা গঠন চোখে পড়ত, যা তাদের বন্দর শহরের অবস্থান চিনিয়ে দিত।

আজও জামি-উল-আলফার মসজিদ শুধু মুসল্লিদের ইবাদতের স্থান নয়, এটি কলম্বোর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। প্রতিদিন অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটক এর অনন্য স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেখতে এখানে আসেন। ধর্মীয় গুরুত্ব, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে এই মসজিদ নিঃসন্দেহে শ্রীলঙ্কার এক অমূল্য সম্পদ।