বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে লাভবান ইরান, প্রতিদ্বন্দ্বীরা শঙ্কিত

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ তিন মাসের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি অন্তর্র্বতীকালীন শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি রাষ্ট্রপতির মধ্যে সরাসরি এমন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে যাচ্ছে। চুক্তির ফলে ইরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং তারা আবার তেল রপ্তানি করতে পারবে। দেশ পুনর্গঠনের জন্য ইরান বিপুল তহবিল পাবে এবং আমেরিকার কাছ থেকে তাদের বর্তমান শাসনব্যবস্থার একটি পরোক্ষ স্বীকৃতি মিলবে।

চুক্তিটিকে এর সমর্থকরা ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ বললেও, ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে এটি একটি বড় ধাক্কা। ১৪ দফার এই চুক্তির মাধ্যমে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে আরো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হয়েছে, যাতে স্থায়ী শান্তির জন্য আলোচনা করা যায়।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ এই চুক্তিটিকে ইসরায়েলের জন্য একটি বড় পরাজয় বা বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যেখানে লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, সেখানে ওয়াশিংটন উল্টো তেহরানকে মেনে নিয়ে তাদের আরো শক্তিশালী করল।

এই চুক্তি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। ফলে ইসরায়েল এখন আন্তর্জাতিকভাবে আরো একা হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই চুক্তি লেবাননে ইরানের প্রভাব এবং তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে। লেবাননের রাষ্ট্রপতি অবশ্য অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, লেবাননের ভাগ্য নিয়ে ইরানের আলোচনা করা উচিত নয়। এ ছাড়া সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
আমেরিকার সুরক্ষার ওপর তাদের দীর্ঘদিনের যে ভরসা ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানকে সামরিকভাবে হারানো অসম্ভব ছিল। তাই একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প ট্রাম্পের হাতে ছিল না।
চুক্তিটি আপাতত শান্তি আনলেও এর আসল পরীক্ষা সামনে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি সফল হতে নাও দিতে পারে এবং লেবানন সীমান্তে আবারও ঝামেলা তৈরি করতে পারে। তবে একজন ইরানি কর্মকর্তা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘ইরান যা চেয়েছিল তা পেয়েছে। আমরা আমাদের বন্ধুদের (হিজবুল্লাহ) একা ফেলে যাইনি।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও লেবাননে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করা হয়। তিন মাস ধরে চলা এই তীব্র যুদ্ধে ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের বড় অংশই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অনেক বেড়ে যায় এবং খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে লাভবান ইরান, প্রতিদ্বন্দ্বীরা শঙ্কিত

প্রকাশিত সময় : ১০:৩৯:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ তিন মাসের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি অন্তর্র্বতীকালীন শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি রাষ্ট্রপতির মধ্যে সরাসরি এমন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে যাচ্ছে। চুক্তির ফলে ইরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং তারা আবার তেল রপ্তানি করতে পারবে। দেশ পুনর্গঠনের জন্য ইরান বিপুল তহবিল পাবে এবং আমেরিকার কাছ থেকে তাদের বর্তমান শাসনব্যবস্থার একটি পরোক্ষ স্বীকৃতি মিলবে।

চুক্তিটিকে এর সমর্থকরা ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ বললেও, ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে এটি একটি বড় ধাক্কা। ১৪ দফার এই চুক্তির মাধ্যমে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে আরো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হয়েছে, যাতে স্থায়ী শান্তির জন্য আলোচনা করা যায়।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ এই চুক্তিটিকে ইসরায়েলের জন্য একটি বড় পরাজয় বা বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যেখানে লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, সেখানে ওয়াশিংটন উল্টো তেহরানকে মেনে নিয়ে তাদের আরো শক্তিশালী করল।

এই চুক্তি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। ফলে ইসরায়েল এখন আন্তর্জাতিকভাবে আরো একা হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই চুক্তি লেবাননে ইরানের প্রভাব এবং তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে। লেবাননের রাষ্ট্রপতি অবশ্য অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, লেবাননের ভাগ্য নিয়ে ইরানের আলোচনা করা উচিত নয়। এ ছাড়া সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
আমেরিকার সুরক্ষার ওপর তাদের দীর্ঘদিনের যে ভরসা ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানকে সামরিকভাবে হারানো অসম্ভব ছিল। তাই একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প ট্রাম্পের হাতে ছিল না।
চুক্তিটি আপাতত শান্তি আনলেও এর আসল পরীক্ষা সামনে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি সফল হতে নাও দিতে পারে এবং লেবানন সীমান্তে আবারও ঝামেলা তৈরি করতে পারে। তবে একজন ইরানি কর্মকর্তা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘ইরান যা চেয়েছিল তা পেয়েছে। আমরা আমাদের বন্ধুদের (হিজবুল্লাহ) একা ফেলে যাইনি।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও লেবাননে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যা করা হয়। তিন মাস ধরে চলা এই তীব্র যুদ্ধে ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের বড় অংশই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অনেক বেড়ে যায় এবং খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়।