বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পাড় ধসে শিশু নিখোঁজ, জীবিত উদ্ধার ১

পদ্মা নদী তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। বাড়ির ঠিক পাশেই বয়ে চলা এই নদীর পাড়ে বসেই খেলায় মেতেছিল দুটি ছোট্ট শিশু। হাসিখুশি চপলতায় ভরপুর দুপুরটি যে মুহূর্তে কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি কেউ। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ভুরকাপাড়া গ্রামে পদ্মার ভয়াল রূপ কেড়ে নিল এক অবুঝ শিশুর শৈশব, আর অন্যজনকে ফিরিয়ে দিল মৃত্যুর মুখ থেকে।

বুধবার (৫ আগস্ট)  বেলা ১২টার দিকে ভুরকাপাড়া গ্রামের মো. ইজাজুল মন্ডলের সাড়ে পাঁচ বছরের মেয়ে মোছা. জামিলা খাতুন এবং প্রতিবেশী মো. আশিক শেখের ৬ বছরের মেয়ে মোছা. নূরিয়া খাতুন নদীর একদম পাড়ে বসে খেলাধুলায় ব্যস্ত ছিল। চোখের পলকে নদীর পাড়ের একটি অংশের মাটি ভেঙে পড়ে পদ্মায়। মুহূর্তের মধ্যে মাটির চাপ আর পানির স্রোতে তলিয়ে যায় নিষ্পাপ দুটি প্রাণ।

পাশের মানুষের হাঁকডাকে মুহূর্তেই পদ্মার পাড়ে জমে ওঠে ভিড়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্থানীয় কয়েকজন গ্রামবাসী। আপ্রাণ চেষ্টার পর নদী থেকে জামিলাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন তারা। তবে পদ্মার রাক্ষুসে স্রোত ততক্ষণে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অবুঝ নূরিয়াকে।

​ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় কৃষক এরশাদ আলী  বলেন, “আমি কাছেই জমিতে কাজ করছিলাম। হঠাৎ দেখতে পাই নদীর পাড়ের একটা বড় চাকা ভেঙে নিচে পড়ে গেল, আর সাথে সাথে বাচ্চাদের চিৎকারের শব্দ। আমি ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিল্লাইয়া দৌড়ে ঘাটের দিকে যাই। চোখের সামনেই পানি ওদের গিলে ফেলল।”

​জামিলাকে পানি থেকে তুলে আনা স্থানীয় যুবক লালন শেখ জানান, “আমরা পানিতে নেমেই জামিলাকে হাতের কাছে পাই। ও পানির ওপর হাবুডুবু খাচ্ছিল, দ্রুত টেনে তুলি। কিন্তু নূরিয়া একদম স্রোতের টানে পানিতে তলিয়ে যায়। আমরা অনেকদূর সাঁতরে গিয়েও তাকে আর ধরতে পারিনি।”

​জামিলা রক্ষা পেলেও নূরিয়ার মা নূরনাহার খাতুন ও বাবা আশিক শেখের বুকফাটা আর্তনাদে পদ্মার পাড়ের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। চোখের সামনে সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা নূরিয়ার মা বিলাপ করে বলছিলেন, “আমার নূরিয়া তো সাঁতার জানে না! সকালে ভাত খাইয়ে পাঠালাম, এখন নদী আমার বুক খালি করে দিল। আমার কলিজার ধনকে আইনা দাও তোমরা।”

সংবাদ পেয়ে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিস ও দৌলতপুর থানা পুলিশের টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম বলেন, “খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের টিম ভুরকাপাড়া এলাকায় পৌঁছায়। শিশুটিকে উদ্ধারে আমরা স্থানীয়দের সহায়তায় নদীতে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করছি। নদীতে পানির গভীরতা ও প্রবল স্রোতের কারণে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তবে খুলনা থেকে ডুবুরি দলকে খবর দেওয়া হয়েছে, তারা এসে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেবেন।”

​এদিকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে এবং ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরাও নিখোঁজ শিশুটিকে উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা ও নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন।

ঘটনার দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ায় নদীর পাড়ে থমথমে নীরবতা নেমে এসেছে। স্বজন ও স্থানীয়দের চেহারায় স্পষ্ট হতাশার ছাপ। নদীর ভেজা পলিমাটিতে পড়ে রয়েছে দুটি ছোট্ট শিশুর জুতোজোড়া, যার একটির মালিক আর কোনোদিন ঘরে ফিরবে কি না- সেই আশঙ্কায় বুক ফেটে চৌচির হচ্ছে স্বজনদের।

উল্লেখ্য গত দু সপ্তাহ ধরে ওই এলাকায় পদ্মার অংশে তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। গত কয়েকদিনে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পাড় ধসে শিশু নিখোঁজ, জীবিত উদ্ধার ১

প্রকাশিত সময় : ১০:২৬:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

পদ্মা নদী তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। বাড়ির ঠিক পাশেই বয়ে চলা এই নদীর পাড়ে বসেই খেলায় মেতেছিল দুটি ছোট্ট শিশু। হাসিখুশি চপলতায় ভরপুর দুপুরটি যে মুহূর্তে কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি কেউ। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ভুরকাপাড়া গ্রামে পদ্মার ভয়াল রূপ কেড়ে নিল এক অবুঝ শিশুর শৈশব, আর অন্যজনকে ফিরিয়ে দিল মৃত্যুর মুখ থেকে।

বুধবার (৫ আগস্ট)  বেলা ১২টার দিকে ভুরকাপাড়া গ্রামের মো. ইজাজুল মন্ডলের সাড়ে পাঁচ বছরের মেয়ে মোছা. জামিলা খাতুন এবং প্রতিবেশী মো. আশিক শেখের ৬ বছরের মেয়ে মোছা. নূরিয়া খাতুন নদীর একদম পাড়ে বসে খেলাধুলায় ব্যস্ত ছিল। চোখের পলকে নদীর পাড়ের একটি অংশের মাটি ভেঙে পড়ে পদ্মায়। মুহূর্তের মধ্যে মাটির চাপ আর পানির স্রোতে তলিয়ে যায় নিষ্পাপ দুটি প্রাণ।

পাশের মানুষের হাঁকডাকে মুহূর্তেই পদ্মার পাড়ে জমে ওঠে ভিড়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্থানীয় কয়েকজন গ্রামবাসী। আপ্রাণ চেষ্টার পর নদী থেকে জামিলাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন তারা। তবে পদ্মার রাক্ষুসে স্রোত ততক্ষণে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অবুঝ নূরিয়াকে।

​ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় কৃষক এরশাদ আলী  বলেন, “আমি কাছেই জমিতে কাজ করছিলাম। হঠাৎ দেখতে পাই নদীর পাড়ের একটা বড় চাকা ভেঙে নিচে পড়ে গেল, আর সাথে সাথে বাচ্চাদের চিৎকারের শব্দ। আমি ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিল্লাইয়া দৌড়ে ঘাটের দিকে যাই। চোখের সামনেই পানি ওদের গিলে ফেলল।”

​জামিলাকে পানি থেকে তুলে আনা স্থানীয় যুবক লালন শেখ জানান, “আমরা পানিতে নেমেই জামিলাকে হাতের কাছে পাই। ও পানির ওপর হাবুডুবু খাচ্ছিল, দ্রুত টেনে তুলি। কিন্তু নূরিয়া একদম স্রোতের টানে পানিতে তলিয়ে যায়। আমরা অনেকদূর সাঁতরে গিয়েও তাকে আর ধরতে পারিনি।”

​জামিলা রক্ষা পেলেও নূরিয়ার মা নূরনাহার খাতুন ও বাবা আশিক শেখের বুকফাটা আর্তনাদে পদ্মার পাড়ের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। চোখের সামনে সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা নূরিয়ার মা বিলাপ করে বলছিলেন, “আমার নূরিয়া তো সাঁতার জানে না! সকালে ভাত খাইয়ে পাঠালাম, এখন নদী আমার বুক খালি করে দিল। আমার কলিজার ধনকে আইনা দাও তোমরা।”

সংবাদ পেয়ে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিস ও দৌলতপুর থানা পুলিশের টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম বলেন, “খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের টিম ভুরকাপাড়া এলাকায় পৌঁছায়। শিশুটিকে উদ্ধারে আমরা স্থানীয়দের সহায়তায় নদীতে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করছি। নদীতে পানির গভীরতা ও প্রবল স্রোতের কারণে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তবে খুলনা থেকে ডুবুরি দলকে খবর দেওয়া হয়েছে, তারা এসে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেবেন।”

​এদিকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে এবং ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরাও নিখোঁজ শিশুটিকে উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা ও নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন।

ঘটনার দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ায় নদীর পাড়ে থমথমে নীরবতা নেমে এসেছে। স্বজন ও স্থানীয়দের চেহারায় স্পষ্ট হতাশার ছাপ। নদীর ভেজা পলিমাটিতে পড়ে রয়েছে দুটি ছোট্ট শিশুর জুতোজোড়া, যার একটির মালিক আর কোনোদিন ঘরে ফিরবে কি না- সেই আশঙ্কায় বুক ফেটে চৌচির হচ্ছে স্বজনদের।

উল্লেখ্য গত দু সপ্তাহ ধরে ওই এলাকায় পদ্মার অংশে তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। গত কয়েকদিনে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।