তৃতীয় পর্ব : যে পথটি শৈশবে নিয়ে যায়
নদী কখনো তার উৎসকে ভুলে যায় না। পাহাড় ছেড়ে, জনপদ পেরিয়ে, সমুদ্রের দিকে ছুটে চললেও তার বুকের গভীরে উৎসের জল বেঁচে থাকে। মানুষের জীবনও তেমনই। যত দূরেই যাই, আমাদের ভেতরে কোথাও একটি ছোট্ট পথ নীরবে অপেক্ষা করে—যে পথটি ফিরে যায় শৈশবের কাছে। আমার সেই পথটির শুরু সিরাজগঞ্জের মুজিব সড়কের এক লাল দালানের পাশ দিয়ে আমাদের ভাড়া বাড়িতে যাওয়া সরু পথ।
আজও চোখ বন্ধ করলেই আমি দেখতে পাই—বাড়ির সামনে হাতি ঢোকার মতো বিশাল একটি গেট। গেট পেরোলেই যেন অন্য এক জগৎ। রানী আপাদের সেই লাল দালান যা আমার চোখে সে সময় কোনো রাজপ্রাসাদের চেয়েও মহিমান্বিত ছিল। সকালের আলো পড়লে লাল দেয়ালগুলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠত। চারপাশে শিউলি, জবা, গোলাপ, গন্ধরাজ, পাতাবাহারের রঙিন সারি। বাতাসে মিশে থাকত ফুলের ঘ্রাণ আর শিশিরভেজা পাতার নির্মল গন্ধ। ছোটবেলায় আমরা বাড়ির আকার বুঝি না, কিন্তু কিছু বাড়ি আমাদের মনে এমনভাবে জায়গা করে নেয়, যেন তারা ইট-সুরকির নয়—স্বপ্ন দিয়ে গড়া।
তখন আমি হাফপ্যান্ট পরা এক দুরন্ত বালক। স্কুলে যাওয়ার পথে কিংবা বিকেলের খেলায়, সেই লাল দালানের পাশের সরু পথটি ছিল আমার প্রতিদিনের সঙ্গী। পথটি খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার দুই পাশে ছড়িয়ে ছিল আমার বিস্ময়ের পৃথিবী। সেই পথের শেষেই ছিল আমাদের ছোট্ট ভাড়া বাড়ি। আজ ভাবি, বাড়িটি ছিল ভাড়া; কিন্তু সেখানে যে দিনগুলো কাটিয়েছি, সেগুলোকে কখনো কেউ ভাড়া নিতে পারেনি। মানুষ হয়তো বাড়ি বদলায়, কিন্তু শৈশব কখনো ঠিকানা বদলায় না।
বাড়ির পেছন দিয়ে বয়ে গেছে একটি খাল। বড় খাল নয়, কিন্তু আমার ছোট্ট চোখে সেটিই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর জলরেখা। খালের বুকজুড়ে ভেসে বেড়াত সবুজ কচুরিপানা। তাদের ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা নীল ফুলগুলোকে আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখতাম। মনে হতো, আকাশ বুঝি নিজের কয়েকটি নীল তারা পানির ওপর নামিয়ে দিয়েছে। খালের ধারে একটি চিকন আমলকি গাছ ছিল। কত বিকেল যে তার ডালে বসে কাটিয়েছি! নিচে পানি, ওপরে আকাশ, আর মাঝখানে আমি—একটি ছোট্ট ছেলে।
কচুরিপানাগুলো স্রোতের টানে ধীরে ধীরে ভেসে যেত। তখন মনে হতো, পৃথিবীতে কোথাও কোনো তাড়া নেই। সময়ও বুঝি নদীর পানির মতো ধীরে ধীরে বয়ে চলে।
আজ বুঝি, প্রকৃতিই ছিল আমার প্রথম শিক্ষক। প্রবাহমান পানি আমাকে শিখিয়েছে চলতে, গাছ শিখিয়েছে দাঁড়িয়ে থাকতে, আর কচুরিপানা শিখিয়েছে—জীবন কখনো কখনো ভেসে চলার মধ্যেও নিজের সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারে। সকালের আলো, দুপুরের রোদ, বিকেলের ছায়া, সবকিছু সেই পথটিকে প্রতিদিন নতুন করে সাজিয়ে দিত। বর্ষাকালে কাদামাটির গন্ধ, শরতে সাদা মেঘ, হেমন্তে নরম রোদ, শীতে কুয়াশা—প্রতিটি ঋতু যেন সেই পথের বুকেই নিজের প্রথম স্বাক্ষর রেখে যেত।
তবে সেই পথের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল শুধু গাছ, কিংবা ফুল নয়—ছিল মানুষ। বিকেল নামলেই পুরো পাড়াটা যেন একসঙ্গে জেগে উঠত। হাতের বই রেখে, হোমওয়ার্কের তাড়া ভুলে আমরা ছুটে যেতাম খেলতে। টপি, রানী আপা, মিলি আপা, রুনা, লিমন, রুনু—আরও কত নাম! আজ অনেকের মুখ স্পষ্ট মনে নেই, কিন্তু তাদের হাসির শব্দ এখনো কানে বাজে। খেলতে খেলতে কখন সন্ধ্যা নেমে আসত, টেরই পেতাম না। মনে হতো, বিকেলগুলো বুঝি রঙিন প্রজাপতির ডানায় ভর করে উড়ে যাচ্ছে।রুনু ছিল আমাদের সবার ছোট। তখনো সে স্কুলে ভর্তি হয়নি। বড়দের খেলার মাঝেও সে নিজের ছোট্ট পৃথিবী নিয়ে ঘুরে বেড়াত। আজ সে আর আমাদের মাঝে নেই। কয়েক বছর আগে পৃথিবীর সব খেলাধুলা শেষ করে সে অন্য এক অনন্ত আকাশের পথে চলে গেছে। কিন্তু স্মৃতির মাঠে সে আজও ছোট্ট পায়ে দৌড়ে বেড়ায়।
আর আমাদের মায়েরা, খালারা? বিকেল হলেই টিনের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে গল্পে মেতে উঠতেন। এক বাড়ির খবর আরেক বাড়িতে পৌঁছাতে কোনো মোবাইল ফোনের প্রয়োজন হতো না; প্রয়োজন হতো শুধু আন্তরিকতার। তাঁদের হাসির শব্দ, গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ভেসে আসা ডাক, আর আমাদের নির্ভার ছুটে বেড়ানো—সব মিলিয়ে সেই বিকেলগুলো ছিল এক অদৃশ্য উৎসব। আজ মনে হয়, আমরা বড় হয়েছিলাম একটি পরিবারের ভেতরে। যে পরিবারের সদস্যরা একই ছাদের নিচে থাকতেন না, কিন্তু একই ভালোবাসার ভেতরে বাস করতেন।
আজ যখন জীবনের ব্যস্ত শহুরে রাস্তায় হাঁটি, তখন হঠাৎ মনে হয়—সব রাস্তার শেষ কোনো গন্তব্যে হয় না। কিছু রাস্তা শেষ হয় মানুষের ভেতরে। আমার কাছে সেই লাল দালানের পাশ দিয়ে গলির শেষে টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে যাওয়ার পথটি ঠিক তেমনই একটি পথ। আজও সেখানে একটি হাফপ্যান্ট পরা ছেলে হেঁটে যাচ্ছে। তার হাতে বই, চোখে বিস্ময়, হৃদয়ে পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কারের আনন্দ। সে জানে না সামনে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। তবু সে নির্ভয়ে হাঁটছে। কারণ তার পাশে আছে একটি পথ, একটি পাড়া, কিছু মানুষ, আর অফুরন্ত ভালোবাসা।
আমি আজ অনেক দূরে চলে এসেছি। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি আসলে কোথাও যাইনি। আমার হৃদয়ের ভেতর সেই ছেলেটি আজও হাঁটছে। আজও কচুরিপানার নীল ফুল ভেসে যাচ্ছে। আজও বিকেলের খেলায় টপি, রানী আপা, মিলি আপা, লিমন, রুনা আর রুনুর হাসি বাতাসে মিশে আছে। আজও টিনের বেড়ার ধারে মায়েরা গল্প করছেন। সময় শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় বদলেছে। আমার শৈশবের ঠিকানাগুলো নয়। তাই আজও আমি বিশ্বাস করি – শৈশব কোনো হারিয়ে যাওয়া সময় নয়। মানুষ যত বড় হয়, শৈশব তত গভীরে গিয়ে তার ভেতর বাসা বাঁধে।”

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 
























