শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মৃতির পথে ফিরে দেখা: সিরাজগঞ্জের শৈশবের ঠিকানাগুলো

প্রথম পর্ব:

মুকুল ফৌজ — আমার দ্বিতীয় বিদ্যালয়।

মানুষের জীবনে দুটি বিদ্যালয় থাকে। একটি তাকে পড়তে শেখায়, অন্যটি মানুষ হতে শেখায়। প্রথম বিদ্যালয়ের ঠিকানা সবাই জানে। দ্বিতীয় বিদ্যালয়ের ঠিকানা থাকে হৃদয়ের ভেতরে। আমার জীবনের সেই দ্বিতীয় বিদ্যালয়ের নাম মুকুল ফৌজ।

সিরাজগঞ্জের মুজিব সড়কে অবস্থিত। তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। ছোট্ট কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। চোখভরা বিস্ময় আর পৃথিবীকে জানার অদম্য কৌতূহল। স্কুল শেষে আমার পা যেন নিজে থেকেই চলে যেত মুকুল ফৌজের অফিসে।

আজও মনে হয়, সেটি কোনো সংগঠনের অফিস ছিল না, ছিল স্বপ্ন দেখতে শেখার একটি আশ্রয়। সেখানে প্রথম শিখেছিলাম, মানুষ শুধু পাঠ্যবই পড়ে বড় হয় না গান, কবিতা, নাটক, আবৃত্তি, শিল্প, সাহিত্য আর সুন্দর মানুষের সান্নিধ্যও একজন মানুষকে গড়ে তোলে।

মাহবুব ভাইয়ের কাছে গান শিখতাম। তিনি শুধু সুর শেখাতেন না, শেখাতেন মন দিয়ে শুনতে। একটি গান কীভাবে মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালায়, তার প্রথম পাঠ পেয়েছিলাম তাঁর কাছেই।

আজ মাহবুব ভাই আমাদের মাঝে নেই। বহু বছর আগে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ চলে গিয়েও চলে যান না। তাঁদের কণ্ঠস্বর, তাঁদের শেখানো সুর, তাঁদের স্নেহমাখা নির্দেশনা শিষ্যদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

আজও কোনো পরিচিত সুর কানে ভেসে এলে মনে হয়, হারমোনিয়ামের সামনে বসে মাহবুব ভাই মৃদু হেসে বলছেন “আরেকবার ধরো… এবার মন দিয়ে গাও।” বাবু মামা (মোমিন বাবু) ছিলেন আমাদের নাটকের প্রাণ। তাঁর মহড়ায় দাঁড়িয়ে প্রথম বুঝেছিলাম, মঞ্চ শুধু অভিনয়ের জায়গা নয়, মানুষের অনুভূতি প্রকাশেরও একটি ভাষা।

আর ছিলেন সুব্রত(দুলাল)দা। আমাদের সবার প্রিয় দুলাল দা। আমার জীবনের গল্পে তাঁর নামটি আলাদা করে লিখতেই হয়। কারণ তিনি শুধু আমার শৈশবের একজন বড় ভাই নন, তিনি আমার লেখকজীবনের প্রথম বিশ্বাসী পাঠক।

আমার লেখা তখন শিশুর মতোই ছোট। কয়েকটি লাইন, কয়েকটি ছন্দ। খুব সাধারণ একটি কবিতা। দুলাল দা আমার ছোট্ট কবিতাটি পড়লেন।

তারপর নিজের হাতে দেয়ালিকার জন্য সুন্দর করে লিখলেন। চারপাশে ছবি আঁকলেন। রঙ করলেন। সবার দেখার জন্য টাঙিয়ে দিলেন। সেদিন অনেকে কবিতাটি পড়েছিল।

কেউ বলেছিলেন, “ভালো লিখেছ।” কেউ হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। সেই প্রশংসাগুলো আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু আজও মনে আছে, একটি ছোট্ট ছেলের বুকের ভেতর কী প্রবল আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। সেদিন আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত হয়েছিল আমার নিজের ওপর বিশ্বাস।

এখন বুঝি, একজন মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার জন্য সব সময় বড় কোনো পুরস্কারের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় একটি উৎসাহ, একটি প্রশংসা, কিংবা দেয়ালিকায় প্রকাশিত হওয়ার মতো যথেষ্ট অনুপ্রেরণা। দুলাল দা সেটিই করেছিলেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, সময়ের এত দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তিনি থেমে যাননি।

আজও যখন লিখি, নতুন কোনো ভাবনা নিয়ে এগোই, কিংবা কোনো সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়াই, তখন তাঁর পরামর্শ, তাঁর উৎসাহ, তাঁর আন্তরিক শুভকামনা আমাকে সাহস দেয়।

সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক এটাই, সময় তাকে পুরোনো না করে আরও গভীর করে। জীবনের পথে আমরা অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই। খুব অল্প মানুষ আছেন, যারা একটি পুরো বইয়ের মতো আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকেন। দুলাল দা আমার কাছে তেমনই একজন। মধ্য বয়সে এসে শৈশবের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখি, মুকুল ফৌজ আমাকে শুধু গান শেখায়নি, নাটক শেখায়নি, কবিতা শেখায়নি।

মুকুল ফৌজ আমাকে শিখিয়েছে, একজন তরুন কীভাবে একটি শিশুর হাত ধরে তার ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। আজ আমি শব্দের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে, নতুন স্বপ্ন দেখতে গিয়ে দেখি সেই পথের একেবারে শুরুতে, সেই স্বপ্নের একেবারে শুরুতে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন মানুষ। মাহবুব ভাই। নজরুল ভাই।

বাবু মামা। ক্ষিতিশ দা। আমার বড় ভাই বিদ্যুৎ আর দুলাল দা। শৈশবের মুকুল ফৌজের সেই ছোট্ট অফিসটি আগের মতো নেই। দেয়ালিকাগুলো নেই। মহড়ার কণ্ঠস্বরও আর শোনা যায় না। কিন্তু আমার হৃদয়ের ভেতরে মুকুল ফৌজ এখনো খোলা আছে। সেখানে আজও এক ছোট্ট ছেলে লাজুক হাতে একটি কবিতা এগিয়ে দিচ্ছে।হারমনিয়াম টেনে গান গাইছে। আর মুকুল ফৌজের বড় ভাইরা, মমতা আর বিশ্বাসভরা হাসি নিয়ে বলছেন “লিখে যাও। গেয়ে যাও।

একদিন এই শব্দগুলোই তোমার পথ হয়ে উঠবে।” তাইতো আমি বিশ্বাস করি “যে শৈশব মানুষকে মানুষ হতে শেখায়, সে শৈশব কখনো পুরোনো হয় না।”

লেখক : মাহবুব সিদ্দিকী

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মার্কিন বিমানবাহী রণতরিতে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ, নিহত ৭

স্মৃতির পথে ফিরে দেখা: সিরাজগঞ্জের শৈশবের ঠিকানাগুলো

প্রকাশিত সময় : ০৫:৩২:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

প্রথম পর্ব:

মুকুল ফৌজ — আমার দ্বিতীয় বিদ্যালয়।

মানুষের জীবনে দুটি বিদ্যালয় থাকে। একটি তাকে পড়তে শেখায়, অন্যটি মানুষ হতে শেখায়। প্রথম বিদ্যালয়ের ঠিকানা সবাই জানে। দ্বিতীয় বিদ্যালয়ের ঠিকানা থাকে হৃদয়ের ভেতরে। আমার জীবনের সেই দ্বিতীয় বিদ্যালয়ের নাম মুকুল ফৌজ।

সিরাজগঞ্জের মুজিব সড়কে অবস্থিত। তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। ছোট্ট কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। চোখভরা বিস্ময় আর পৃথিবীকে জানার অদম্য কৌতূহল। স্কুল শেষে আমার পা যেন নিজে থেকেই চলে যেত মুকুল ফৌজের অফিসে।

আজও মনে হয়, সেটি কোনো সংগঠনের অফিস ছিল না, ছিল স্বপ্ন দেখতে শেখার একটি আশ্রয়। সেখানে প্রথম শিখেছিলাম, মানুষ শুধু পাঠ্যবই পড়ে বড় হয় না গান, কবিতা, নাটক, আবৃত্তি, শিল্প, সাহিত্য আর সুন্দর মানুষের সান্নিধ্যও একজন মানুষকে গড়ে তোলে।

মাহবুব ভাইয়ের কাছে গান শিখতাম। তিনি শুধু সুর শেখাতেন না, শেখাতেন মন দিয়ে শুনতে। একটি গান কীভাবে মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালায়, তার প্রথম পাঠ পেয়েছিলাম তাঁর কাছেই।

আজ মাহবুব ভাই আমাদের মাঝে নেই। বহু বছর আগে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ চলে গিয়েও চলে যান না। তাঁদের কণ্ঠস্বর, তাঁদের শেখানো সুর, তাঁদের স্নেহমাখা নির্দেশনা শিষ্যদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

আজও কোনো পরিচিত সুর কানে ভেসে এলে মনে হয়, হারমোনিয়ামের সামনে বসে মাহবুব ভাই মৃদু হেসে বলছেন “আরেকবার ধরো… এবার মন দিয়ে গাও।” বাবু মামা (মোমিন বাবু) ছিলেন আমাদের নাটকের প্রাণ। তাঁর মহড়ায় দাঁড়িয়ে প্রথম বুঝেছিলাম, মঞ্চ শুধু অভিনয়ের জায়গা নয়, মানুষের অনুভূতি প্রকাশেরও একটি ভাষা।

আর ছিলেন সুব্রত(দুলাল)দা। আমাদের সবার প্রিয় দুলাল দা। আমার জীবনের গল্পে তাঁর নামটি আলাদা করে লিখতেই হয়। কারণ তিনি শুধু আমার শৈশবের একজন বড় ভাই নন, তিনি আমার লেখকজীবনের প্রথম বিশ্বাসী পাঠক।

আমার লেখা তখন শিশুর মতোই ছোট। কয়েকটি লাইন, কয়েকটি ছন্দ। খুব সাধারণ একটি কবিতা। দুলাল দা আমার ছোট্ট কবিতাটি পড়লেন।

তারপর নিজের হাতে দেয়ালিকার জন্য সুন্দর করে লিখলেন। চারপাশে ছবি আঁকলেন। রঙ করলেন। সবার দেখার জন্য টাঙিয়ে দিলেন। সেদিন অনেকে কবিতাটি পড়েছিল।

কেউ বলেছিলেন, “ভালো লিখেছ।” কেউ হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। সেই প্রশংসাগুলো আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু আজও মনে আছে, একটি ছোট্ট ছেলের বুকের ভেতর কী প্রবল আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। সেদিন আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত হয়েছিল আমার নিজের ওপর বিশ্বাস।

এখন বুঝি, একজন মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার জন্য সব সময় বড় কোনো পুরস্কারের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় একটি উৎসাহ, একটি প্রশংসা, কিংবা দেয়ালিকায় প্রকাশিত হওয়ার মতো যথেষ্ট অনুপ্রেরণা। দুলাল দা সেটিই করেছিলেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, সময়ের এত দীর্ঘ পথ পেরিয়েও তিনি থেমে যাননি।

আজও যখন লিখি, নতুন কোনো ভাবনা নিয়ে এগোই, কিংবা কোনো সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়াই, তখন তাঁর পরামর্শ, তাঁর উৎসাহ, তাঁর আন্তরিক শুভকামনা আমাকে সাহস দেয়।

সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক এটাই, সময় তাকে পুরোনো না করে আরও গভীর করে। জীবনের পথে আমরা অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই। খুব অল্প মানুষ আছেন, যারা একটি পুরো বইয়ের মতো আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকেন। দুলাল দা আমার কাছে তেমনই একজন। মধ্য বয়সে এসে শৈশবের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখি, মুকুল ফৌজ আমাকে শুধু গান শেখায়নি, নাটক শেখায়নি, কবিতা শেখায়নি।

মুকুল ফৌজ আমাকে শিখিয়েছে, একজন তরুন কীভাবে একটি শিশুর হাত ধরে তার ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। আজ আমি শব্দের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে, নতুন স্বপ্ন দেখতে গিয়ে দেখি সেই পথের একেবারে শুরুতে, সেই স্বপ্নের একেবারে শুরুতে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন মানুষ। মাহবুব ভাই। নজরুল ভাই।

বাবু মামা। ক্ষিতিশ দা। আমার বড় ভাই বিদ্যুৎ আর দুলাল দা। শৈশবের মুকুল ফৌজের সেই ছোট্ট অফিসটি আগের মতো নেই। দেয়ালিকাগুলো নেই। মহড়ার কণ্ঠস্বরও আর শোনা যায় না। কিন্তু আমার হৃদয়ের ভেতরে মুকুল ফৌজ এখনো খোলা আছে। সেখানে আজও এক ছোট্ট ছেলে লাজুক হাতে একটি কবিতা এগিয়ে দিচ্ছে।হারমনিয়াম টেনে গান গাইছে। আর মুকুল ফৌজের বড় ভাইরা, মমতা আর বিশ্বাসভরা হাসি নিয়ে বলছেন “লিখে যাও। গেয়ে যাও।

একদিন এই শব্দগুলোই তোমার পথ হয়ে উঠবে।” তাইতো আমি বিশ্বাস করি “যে শৈশব মানুষকে মানুষ হতে শেখায়, সে শৈশব কখনো পুরোনো হয় না।”

লেখক : মাহবুব সিদ্দিকী