শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মৃতির পথে ফিরে দেখা সিরাজগঞ্জের শৈশবের ঠিকানাগুলো

পঞ্চম পর্ব: সম্ভুর মিষ্টির দোকান ও বড় হওয়ার স্বপ্ন
শৈশবে আমাদের সবারই এমন একটি জায়গা থাকে, যেখানে আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখি। আমার কাছে সেই জায়গাটির নাম ছিল সম্ভুর মিষ্টির দোকান।
রানী আপাদের বাড়ির (লাল দালানের ) ঠিক সামনেই রাস্তার বিপরীতে ছিল দোকানটি। খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু আমার ছোট্ট পৃথিবীতে সেটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণবন্ত ঠিকানা। ভোরবেলায় দুধ জ্বাল দেওয়ার গন্ধ, সদ্য ছানা কাটা, বড় কড়াইয়ে টগবগ করে ফুটতে থাকা চিনির রস, আর চুলোর ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে থাকা গরম চায়ের সুবাস সব মিলিয়ে দোকানটির নিজস্ব একটি প্রাণ ছিল। মনে হতো, সকাল শুরু হয় সম্ভুর দোকানের দরজা খোলার শব্দে।
কাচের শোকেসে সারি সারি সাজানো থাকত রসগোল্লা, রাজভোগ, চমচম, লাড্ডু, সন্দেশ। শিশুমনের কাছে সেগুলো শুধু মিষ্টি ছিল না, ছিল রূপকথার রাজ্যের ধনভান্ডার। কাচের ওপাশে দাঁড়িয়ে আমি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকতাম। সবকিছু কেনার সামর্থ্য ছিল না, কিন্তু সবকিছু দেখে আনন্দ পাওয়ার ক্ষমতা ছিল অঢেল।
দোকানের আরেকটি আকর্ষণ ছিল চা। চায়ের কাপ ঘিরে মানুষের গল্পের স্বাদ বুঝতে শুরু করেছিলাম। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে শহরের বাইরে পড়তে যাওয়া বড় ভাইয়েরা এসে জড়ো হতেন সম্ভুর দোকানে। এদের মধ্যে আমার ফুফাতো ভাই মান্নান হীরাও থাকতেন। কেউ হাতে খবরের কাগজ, কেউ রাজনীতি নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা করছেন, কেউ নতুন শহরের গল্প বলছেন, কেউ ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকছেন। হাসি, তর্ক, ঠাট্টা সব মিলিয়ে দোকানটি যেন ছোট্ট একটি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখতাম। মনে মনে ভাবতাম কবে হীরা ভাইয়ের মতো বড় হবো, ওইখানে আড্ডা দিব।
মনে হতো, বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পৃথিবী বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখা, আর নিজের ভবিষ্যৎকে নিয়ে নিশ্চিন্তে হাসতে পারার নামই বুঝি বড় হওয়া। তখন কতবার মনে হয়েছে, আর কতদিন? কবে আমিও বড় হব? কবে আমিও ওদের মতো একটি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গল্প করব? আজ এত বছর পরে মনে হয়, সম্ভুর দোকান আমাকে শুধু মিষ্টির স্বাদ দেয়নি, দিয়েছিল মানুষের কাছে বসার শিক্ষা। শিখিয়েছিল, একটি চায়ের কাপও মানুষকে কাছাকাছি এনে দিতে পারে।
সম্ভুর সেই দোকানের হয়তো কাচের শোকেস পাল্টেছে, বেঞ্চ পাল্টেছে, মুখগুলো পাল্টেছে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে দোকানটি আজও আগের মতোই আছে। চুলোর আগুন জ্বলছে। চায়ের কেতলি থেকে ধোঁয়া উঠছে। আর আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ভরা চোখে বড় ভাইদের আড্ডা দেখছি। আর মনে মনে বলছি “একদিন আমিও বড় হব।”
এখন আমি বড় হয়েছি, তবুও আমার শৈশবের একটি চিরস্থায়ী ঠিকানা হয়ে আছে সিরাজগঞ্জের মুজিব সড়কের “সম্ভুর মিষ্টির দোকান”।
সেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমি বুঝেছিলাম মানুষ শুধু নিজের জন্য বড় হয় না। বড় হওয়া মানে নিজের চারপাশের মানুষ, গল্প, সম্পর্ক আর স্বপ্নের ভেতরও একটু একটু করে বেড়ে ওঠা।

লেখক : মাহবুব সিদ্দিকী

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

স্মৃতির পথে ফিরে দেখা সিরাজগঞ্জের শৈশবের ঠিকানাগুলো

প্রকাশিত সময় : ০৫:২৬:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পঞ্চম পর্ব: সম্ভুর মিষ্টির দোকান ও বড় হওয়ার স্বপ্ন
শৈশবে আমাদের সবারই এমন একটি জায়গা থাকে, যেখানে আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখি। আমার কাছে সেই জায়গাটির নাম ছিল সম্ভুর মিষ্টির দোকান।
রানী আপাদের বাড়ির (লাল দালানের ) ঠিক সামনেই রাস্তার বিপরীতে ছিল দোকানটি। খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু আমার ছোট্ট পৃথিবীতে সেটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণবন্ত ঠিকানা। ভোরবেলায় দুধ জ্বাল দেওয়ার গন্ধ, সদ্য ছানা কাটা, বড় কড়াইয়ে টগবগ করে ফুটতে থাকা চিনির রস, আর চুলোর ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে থাকা গরম চায়ের সুবাস সব মিলিয়ে দোকানটির নিজস্ব একটি প্রাণ ছিল। মনে হতো, সকাল শুরু হয় সম্ভুর দোকানের দরজা খোলার শব্দে।
কাচের শোকেসে সারি সারি সাজানো থাকত রসগোল্লা, রাজভোগ, চমচম, লাড্ডু, সন্দেশ। শিশুমনের কাছে সেগুলো শুধু মিষ্টি ছিল না, ছিল রূপকথার রাজ্যের ধনভান্ডার। কাচের ওপাশে দাঁড়িয়ে আমি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকতাম। সবকিছু কেনার সামর্থ্য ছিল না, কিন্তু সবকিছু দেখে আনন্দ পাওয়ার ক্ষমতা ছিল অঢেল।
দোকানের আরেকটি আকর্ষণ ছিল চা। চায়ের কাপ ঘিরে মানুষের গল্পের স্বাদ বুঝতে শুরু করেছিলাম। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে শহরের বাইরে পড়তে যাওয়া বড় ভাইয়েরা এসে জড়ো হতেন সম্ভুর দোকানে। এদের মধ্যে আমার ফুফাতো ভাই মান্নান হীরাও থাকতেন। কেউ হাতে খবরের কাগজ, কেউ রাজনীতি নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা করছেন, কেউ নতুন শহরের গল্প বলছেন, কেউ ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকছেন। হাসি, তর্ক, ঠাট্টা সব মিলিয়ে দোকানটি যেন ছোট্ট একটি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখতাম। মনে মনে ভাবতাম কবে হীরা ভাইয়ের মতো বড় হবো, ওইখানে আড্ডা দিব।
মনে হতো, বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পৃথিবী বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখা, আর নিজের ভবিষ্যৎকে নিয়ে নিশ্চিন্তে হাসতে পারার নামই বুঝি বড় হওয়া। তখন কতবার মনে হয়েছে, আর কতদিন? কবে আমিও বড় হব? কবে আমিও ওদের মতো একটি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গল্প করব? আজ এত বছর পরে মনে হয়, সম্ভুর দোকান আমাকে শুধু মিষ্টির স্বাদ দেয়নি, দিয়েছিল মানুষের কাছে বসার শিক্ষা। শিখিয়েছিল, একটি চায়ের কাপও মানুষকে কাছাকাছি এনে দিতে পারে।
সম্ভুর সেই দোকানের হয়তো কাচের শোকেস পাল্টেছে, বেঞ্চ পাল্টেছে, মুখগুলো পাল্টেছে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে দোকানটি আজও আগের মতোই আছে। চুলোর আগুন জ্বলছে। চায়ের কেতলি থেকে ধোঁয়া উঠছে। আর আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ভরা চোখে বড় ভাইদের আড্ডা দেখছি। আর মনে মনে বলছি “একদিন আমিও বড় হব।”
এখন আমি বড় হয়েছি, তবুও আমার শৈশবের একটি চিরস্থায়ী ঠিকানা হয়ে আছে সিরাজগঞ্জের মুজিব সড়কের “সম্ভুর মিষ্টির দোকান”।
সেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমি বুঝেছিলাম মানুষ শুধু নিজের জন্য বড় হয় না। বড় হওয়া মানে নিজের চারপাশের মানুষ, গল্প, সম্পর্ক আর স্বপ্নের ভেতরও একটু একটু করে বেড়ে ওঠা।

লেখক : মাহবুব সিদ্দিকী