মনোনয়ন পাওয়ার দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে সাহিত্য পুরস্কার। সুইডিশ একাডেমির সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য ও ভাষার প্রফেসর, অগ্রজ নোবেল পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক, সাহিত্য সংগঠনের প্রধান—এই ধরনের ব্যক্তিরা নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়ে থাকেন।
এসব আনুমানিক বাস্তবতা বের করা হয়ে থাকে প্রধানত পাঠকদের বিচার-বিশ্লেষণ থেকে। পাঠকদের আলোচনা থেকে পাওয়া অনুমান অনেক সময় সঠিক হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো দেখা যায়, পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিক পাঠকের কাছে একেবারেই পরিচিত নন, কিংবা কম পরিচিত। নোবেল পুরস্কার ঘিরে বাজির কারবারও চলে বেশ জোরেশোরে।
মাঝে মাঝে তাদের অনুমানও ঠিক হয়ে যায়। তবে লেখক সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যায় তাঁর লেখা পড়তে পড়তে। সে কারণে পাঠক-সমালোচকের মনে গড়ে ওঠা ধারণার ভিত্তিটাই শক্ত। সেটাই লেখকের পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে বেশি মিলতে পারে।
তাঁকে মনে করা হয় চীনের নিরীক্ষাধর্মী কথাসাহিত্যের সবচেয়ে অগ্রগণ্য লেখক। তাঁর সাহিত্য সমালোচনার আওতায় অন্যদের কাজের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন দান্তে, কাফকা ও বোর্হেসের লেখা। তাঁর কথাসাহিত্য নৃত্য ও দৃশ্যমান শিল্পের মতো বলে মনে করা হয়। তাঁর সাহিত্য মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমেরিকার ঔপন্যাসিক ও সম্পাদক ব্র্যাডফোর্ড মরো বলেন, সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে যাঁরা নতুনত্ব এনেছেন এবং আন্তর্জাতিক পাঠক ও সমালোচকদের কাছে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছেন, তাঁদের অন্যতম সান শুয়ে। তাঁর লেখা অন্য ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে। প্রধানত ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লেখেন তিনি। ক্যারেন জারনান্ট ও চেন জেপিং অনূদিত তাঁর উপন্যাস ‘ফাইভ স্পাইস স্ট্রিট’, ‘ফ্রন্টিয়ার’ ও ‘বেয়ারফুট ডক্টর’। অ্যানেলাইস ফিনেগান ওয়াসমোয়েন অনূদিত তাঁর উপন্যাস ‘দ্য লাস্ট লাভার’ ও ‘লাভ ইন দ্য নিউ মিলেনিয়াম’। এ বছর চীনের লেখক ইয়ান লিয়াংকের নামও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যঙ্গাত্মক সুর তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর অনেক লেখা এযাবৎ নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে গেছে। প্রধানত উপন্যাস ও ছোটগল্প লেখেন তিনি। চীনের কথাসাহিত্যের মেটাফিকশন ও উত্তরাধুনিক ধারার লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় লেখক হিসেবে পরিচিতি পান ইউ হুয়া। কথাসাহিত্য ছাড়াও তিনি প্রবন্ধ লেখেন। তাঁর লেখা এশিয়া ও ইউরোপের প্রায় ১৫টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। চীনের কোনো লেখক নোবেল পেলে অস্বাভাবিক মনে হবে না।
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে আছেন জাপানের কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামি। কোনো রহস্যজনক কারণে তাঁকে এখন পর্যন্ত বাছাই করেনি নোবেল কমিটি। বলা বাহুল্য, মুরাকামির উপন্যাস, প্রবন্ধ ও ছোটগল্পের বই জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বেস্ট সেলার হয়েছে বহুবার। ৫০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা। ফ্রাঞ্জ কাফকা পুরস্কার, ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। আর সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো পাঠকের ভালোবাসা; সেটা পেয়েছেন অপরিমেয়। তাঁর নাম বহু বছর ধরে নোবেল মৌসুমে পাঠকের মুখে উচ্চারিত হয়ে আসছে। দেখা যাক, এবার কী হয়। তাঁর দেশের আরো কয়েকজন লেখক জাপানে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ জনপ্রিয়। ১৯৮৬ সালে নাইজেরিয়ার ওলে সোয়েংকা নোবেল পুরস্কার পান। চিনুয়া আচেবেকে বাদ দিয়ে সোয়েংকাকে পুরস্কার দেওয়ার মতো কাজ করে নোবেল কমিটি। সেভাবে জাপানের অন্য কোনো লেখককে পুরস্কার দিয়ে দিতেও পারে মুরাকামিকে বাদ দিয়ে। জাপানের সমসাময়িক কালের প্রভাবশালী নারী লেখকদের অন্যতম হিরোমি ইতো। প্রধানত কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন ইতো। জাপানের বড় বড় সাহিত্য পুরস্কারের অনেকগুলো পেয়েছেন তিনি। জাপানের আরেকজন নোবেলসম্ভাব্য লেখক হলেন ইওকো ওগাউয়া। কথাসাহিত্যিক ওগাউয়া জাপানের প্রধান সাহিত্য পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২০ সালে ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল তাঁর নাম। অন্যদিকে কবি-কথাসাহিত্যিক ইয়োকো তাওয়াদার নামও চলে আসে আলোচনায়। তিনি বর্তমানে বাস করেন জার্মানিতে। জাপানি ও জার্মান উভয় ভাষায়ই লেখেন তাওয়াদা। ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা। লেখার স্বীকৃতি হিসেবে জাপানের এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। জাপানের কথাসাহিত্যিক ও প্রবন্ধকার মাহোকো ইয়োশিমোতোর লেখক নাম বানানা ইয়োশিমোতো। জাপানসহ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয় তিনি। মুরাকামি আর জাপানের ভৌগোলিক অবস্থান অবশ্যই চীনের লেখকদের মতোই আরেকটা বিষয় মনে করিয়ে দেয়—দুই বছর আগে হান কাংয়ের নোবেলপ্রাপ্তি।
মেক্সিকোর কথাসাহিত্যিক কিস্টিনা রিভেরা গারজা আছেন এবারের তালিকার তৃতীয় স্থানে। গারজা বর্তমান সময়ে মেক্সিকোর প্রধান লেখকদের অন্যতম। লেখালেখির পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশার সঙ্গেও যুক্ত তিনি। মেক্সিকোসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর কারণে দুই দেশের নানা জায়গায় বসবাস করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব পড়েছে তাঁর লেখায়। উপন্যাসের সঙ্গে তিনি কবিতা, ছোটগল্প, স্মৃতিকথাও লিখেছেন। তাঁর বিশ্বাস, লেখার মধ্যে তথ্য প্রচার করা লেখকের কাজ নয়; ভালো লেখক পাঠকের চিন্তাশক্তিকে উসকে দিয়ে থাকেন। গারজা অন্য লেখকের লেখা অনুবাদ করেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন। ‘নো ওয়ান উইল সি মি ক্রাই’, ‘ডেথ টেকস মি’, ‘দি ইলিয়াক ক্রেস্ট’, ‘ভার্দে সাংহাই’, ‘দ্য টাইগা সিনড্রোম’, ‘লিলিয়ানাস ইনভিনসিবল সামার’ তাঁর লেখা বইয়ের অন্যতম। গারজা পুলিত্জার পুরস্কার, শার্লি জ্যাকসন পুরস্কার, হোসে রুবেন রোমেরো ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডসহ দেশে এবং দেশের বাইরে আরো অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি বিবিসির ১০০ জন প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। গারজার লেখা ইংরেজি, পর্তুগিজ, জার্মান, ইতালীয়, কোরীয় এবং অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সম্ভাবনা বেশ জোরালো এবার।
তালিকার চতুর্থ স্থানে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের কথাসাহিত্যিক টমাস পিনশন। মারাত্মক রকমের নিভৃতচারী পিনশনের উত্তরাধুনিক কথাসাহিত্য প্রধানত ঘন ও জটিল। তাঁর কথাসাহিত্যে সহজেই চোখে পড়ে উদ্ভট হাস্যরস আর সংশয়ী সুরের উপস্থিতি। অতীতের শিল্প-সাহিত্যের পরোক্ষ উল্লেখও তাঁর লেখার সাধারণ বৈশিষ্ট্যের অন্যতম। ১৯৬০-এর দশক থেকে এ পর্যন্ত নিভৃতেই আছেন তিনি। এমনকি তাঁর কোনো সমসাময়িক ফটোগ্রাফও কেউ দেখেননি। তাঁর স্কুল-কলেজজীবনের কয়েকটি ফটোগ্রাফ মাত্র পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। তাঁর কয়েকটি উপন্যাসের নাম ‘গ্র্যাভিটিস রেইনবো’, ‘স্লো লার্নার’, ‘ভাইনল্যান্ড’, ‘এগেইনস্ট দ্য ডে’, ‘ইনহারেন্ট ভাইস’, ‘ব্লিডিং এজ’, ‘শ্যাডো টিকিট’। বিশ্বপাঠকের ভালোবাসায় সিক্ত যুক্তরাষ্ট্রের জয়েস ক্যারল ওটস, ডন ডেলিলো, এন টাইলার, রিচার্ড ফোর্ড, ডেভ এগারস, মেরিলিন রবিনসন, জনাথান ফ্রানজেন প্রমুখ। আমেরিকার কথা কিংবা শুধু ইংরেজির কথা উঠলেও ডন ডেলিলোর নাম আসতেই পারে। সমসাময়িক মানুষের জটিল জীবনের বয়ান খুব নিচু স্বরে তুলে ধরেন তিনি। আবেগের আহামরি ঢেউ নেই এই কসমোপলিটন লেখকের লেখায়। যদি এবার তিনি পেয়েই যান এই পুরস্কার তাতে বোদ্ধা নোবেল কমিটির মানদণ্ড টলবে না বলা যায়। কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটস বহুলপ্রজ হলেও তাঁর লেখার মধ্যে প্রাণের উপস্থিতি বেশ জোরালো। আমেরিকার সমসাময়িক ভুবনের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা তাঁর লেখার প্রধান বিষয়। তাঁর নিজের ভাষাও বিষয়বস্তুর সঙ্গে দারুণভাবে মানানসই। অ্যান্টিগুয়ান-আমেরিকান ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার জ্যামেইকা কিনকেইডও নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচ্য হতে পারেন। আফ্রিকান ও আফ্রিকান-আমেরিকান স্টাডিজের হার্ভার্ড প্রফেসর কিনকেইড লিখে থাকেন উপনিবেশবাদ, ব্রিটিশ ও আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, ঔপনিবেশিক শিক্ষা, লিঙ্গবাদ, শ্রেণি, ক্ষমতা—এসব বিষয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের কথাসাহিত্যিক স্টিফেন কিংকে বলা হয় ‘কিং অব হরর’। কল্পবিজ্ঞান, অপরাধবিষয়ক ও লোমহর্ষক কাহিনি লেখার কারণেই তাঁর এমন নাম। তাঁর বই এরই মধ্যে ৩৫০ মিলিয়ন কপির বেশি বিক্রি হয়ে গেছে। সুতরাং তিনি পাঠকের কাছে কত প্রিয় তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তাঁদের মধ্যে কেউ এবার নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতেও পারেন।
তালিকার পঞ্চম স্থানে আছেন কানাডার লেখক, কবি, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সমালোচক মার্গারেট অ্যাটউড। বিশ্বসাহিত্যের পাঠকের খুব প্রিয় লেখক তিনি। লিঙ্গ পরিচয়, ধর্ম, পুরাণ, ভাষার শক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন—এসব বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে অ্যাটউডের লেখায়। ১৮টি কবিতার বই, ১৮টি উপন্যাস, ১১টি প্রবন্ধের বই, ৯টি ছোটগল্পের সংকলন, আটটি শিশুতোষ বইসহ আরো অনেক প্রকাশনা রয়েছে বহুলপ্রজ এই লেখকের। শুধু ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’ উপন্যাসের কথা বললেই সারা বিশ্বের পাঠকের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তার বিষয় বোঝা যায়। দুইবার বুকার পুরস্কারসহ বেশ কিছু মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কার তিনি এরই মধ্যে পেয়ে গেছেন। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের জন্য তাঁর লেখা ব্যবহার করেছেন অনেকে। এবারের নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য লেখক হিসেবে আছেন কানাডার আরেকজন সাহিত্যিক। তিনি কবি, প্রবন্ধকার, অনুবাদক প্রফেসর এন কারসন। নিজ দেশের এবং টি এস এলিয়ট পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন কারসন। আরো আছেন আধুনিক রাশিয়ার মানবতাবাদী কথাসাহিত্যিক লুদমিলা উলিত্স্কায়া। অন্য বছরের তুলনায় তাঁর নাম বেশি গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে এবার। আছেন রুমানিয়ার কথাসাহিত্যিক, কবি, প্রবন্ধকার ও সাহিত্য সমালোচক মারশিয়া কার্টারেস্কুও। আর্জেন্টিনার কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক সিজার আয়রা একজন বহুলপ্রজ লেখক। অনুবাদক হিসেবে তিনি সমান পরিচিত ও জনপ্রিয়। ফরাসি, ইংরেজি, ইতালীয়, ব্রাজিলীয়, স্প্যানিস, মেক্সিকান ও ভেনেজুয়েলান সাহিত্য অনুবাদ করে তিনি নিজের মৌলিক লেখার সমান গুরুত্ব অর্জন করেছেন। সুতরাং নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য লেখক হিসেবে তাঁকে বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
বিদেশি উপন্যাসের জন্য ভিলা-মাতাস ২০০১ সালে ফ্রান্সের প্রেমিও রোমুলো গোলেগোস এবং প্রিক্স মেডিসি পুরস্কার পান। ২০০২ সালে পান ফেরনান্দো অ্যাকুইরে-লাইব্রেলিরে পুরস্কার, ইন্টারন্যাশনালে এনিও ফ্লাইয়ানো পুরস্কার, দ্য ফান্দাসিয়ঁ হোসে মানুয়েল লারা পুরস্কার এবং রিয়েল একাডেমিয়া এস্পানিওলা পুরস্কার। আরো বিভিন্নভাবে সম্মানিত ও পুরস্কৃত হয়েছেন ভিলা-মাতাস। ‘লা অ্যাসেসিনা ইলাস্ত্রাদা’, ‘ইম্পোস্তুরা’, ‘লেহোস দে ভেরাক্রুজ’, ‘ডক্টর পাসাভেন্তো’, ‘এল ভিয়াহে ভার্টিকাল’, ‘ডাব্লিনেস্কা’. এন্টেভিডিও’ তাঁর অন্যতম উপন্যাস। তিনি ছোটগল্প ও প্রবন্ধের বইও লিখেছেন। এখনো অনেক এলাকার পাঠকের কাছে কম পরিচিত মনে হলেও ভিলা-মাতাস নোবেল পুরস্কার পেলে খুব অস্বাভাবিক মনে হবে না।
অস্ট্রেলিয়ার বর্ষীয়ান লেখক জেরাল্ড মারনেন উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা লিখে থাকেন। তিনি বাইরের জগতে পরিচিতি পেয়েছেন প্রধানত তাঁর ১৯৮২ সালের উপন্যাস ‘দ্য প্লেইনস’ লিখে। এরপর ১৯৮৫ সালে প্রকাশ করেন ‘ল্যান্ডস্কেপ উইথ ল্যান্ডস্কেপ’; ১৯৮৮ সালে প্রকাশ করেন ‘ইনল্যান্ড’; ১৯৯০ সালে লেখেন ‘ভেলভেট ওয়াটার্স’ এবং ১৯৯৫ সালে লেখেন ‘এমারাল্ড ব্লু’। এই সময়ে প্রকাশিত তাঁর বইগুলো মোটামুটি স্মৃতি ও চিত্রকল্পের সঙ্গে জন্মভূমির সম্পর্ক নিয়ে কথা বলে। আর এ বইগুলোতে তিনি কথাসাহিত্যের সঙ্গে প্রবন্ধের মিশেল দিয়েছেন অবলীলায়। তাঁর পাঠকপ্রিয়তার আরো কারণ হলো তাঁর বিশেষ গদ্যশৈলী এবং অস্ট্রেলিয়ার ভূমির নিজস্বতা, সেখানকার বাসিন্দাদের শিকড়ের পরিচয় এবং স্মৃতি তুলে আনার কাজ। লেখার মধ্যে তিনি প্রায়ই বিভিন্ন শাখার মাঝের বিভাজনরেখা মুছে ফেলেন। বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য লেখক হিসেবে পাঠকদের আলোচনার কেন্দ্রে আছেন। ২০১৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার বিচারে, ‘ইংরেজি ভাষার সেরা লেখকদের মধ্যে যাঁরা কম পরিচিতি পেয়েছেন, মারনেন তাঁদের অন্যতম।’ সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের দৃষ্টিতে, ‘অস্ট্রেলিয়ার জীবিত লেখকদের মধ্যে তাঁর মতো আর কেউ পাঠকমনে দীর্ঘস্থায়িত্ব পাওয়া কিংবা অনন্য হওয়ার গুণাবলিসম্পন্ন নন।’ মারনেন এবারের নোবেল পেলে তাঁর ক্রমবর্ধমান পরিচিতি দ্রুত প্রসারিত হবে এবং বিশ্বপাঠক একজন গুণী লেখকের পরিচয় ভালো করে জানতে পারবেন।
২০১৮, ২০১৯, ২০২৩ ও ২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার তাঁর দেশ থেকে এবং খুব কাছাকাছি ভৌগোলিক অবস্থানের চারজন লেখককে দেওয়া হয়েছে বলে হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক, নাট্যকার পিটার নাদাস এবার নোবেল পুরস্কার পাবেন বলে মনে হয় না। তবে ফরাসি কিংবা ব্রিটিশ লেখক-কবিদের নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা আছে। নোবেল কমিটির খেয়ালের কারণে তাঁরাও কেউ পেতে পারেন পুরস্কার। ব্রিটিশদের মধ্যে সালমান রুশদি, ইয়ান ম্যাকইউয়ান, বানার্ডো এভারিস্টো কিংবা জ্যাডি স্মিথ এবারের নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতেও পারেন।
এবারের নোবেল পুরস্কারের জন্য আইরিশ কথাসাহিত্যিক জন বানভিল, সেবাস্টিয়ান ব্যারি এবং ‘ব্রুকলিন’ খ্যাত কলাম টোইবিন গুরুত্বপূর্ণ। ব্যারির উপন্যাস ‘আ লং লং ওয়ে’ ও ‘দ্য সিক্রেট স্ক্রিপচার’ তাঁকে দুইবার ম্যান বুকার প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান দিয়েছে। সমালোচকরা বানভিলকে প্রুস্তের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে তিনি নিজে মনে করেন, ইয়েটস ও হেনরি জেমস তাঁর ওপর বেশি প্রভাব ফেলেছেন। তিনি নোবেল পেলে অগ্রজ কবি-লেখকদের ভক্তরাও খুশি হবেন। টোইবিনের মসৃণ ভাষার সঙ্গে তাঁর কাহিনির ঘনত্বের চমৎকার মিশেল যেকোনো পাঠককে মুগ্ধ করে।
অনেক দিন ধরেই আলোচনায় আছেন সিরিয়ার কবি আলী সাইদ অ্যাডোনিস। এই সময়ের আরব সাহিত্যের প্রধান কবিদের অন্যতম তিনি। আরববিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি। তাঁর কবিতার মধ্যে রাজনীতির যথেষ্ট স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় এলে প্রতিবছরই তাঁর নাম আলোচনায় আসে।
আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে বেশ প্রিয় চিলিয়ান-আমেরিকান কথাসাহিত্যিক ইসাবেল আয়েন্দে। তিনি স্প্যানিশভাষী সর্বাধিক পঠিত লেখকদের অন্যতম বলে বিবেচিত। লেখায় জাদুবাস্তবতার ব্যবহার এবং গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর দখলে। পাঠকদের পছন্দের সঙ্গে নোবেল কমিটির পছন্দের মিল হয়ে গেলে আয়েন্দে এবার নোবেল পুরস্কার পেয়ে যাবেন।
ভাষার দিক বিবেচনায় ইংরেজির বাইরে দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উনের সম্ভাবনা একেবারে কমে গেছে, তা নয়। বরং কথাসাহিত্যের নোবেল পুরস্কারের বিশাল কাতারের মাঝে কবিতার রং আরো একবার লাগতে পারে। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে বহুবার কারাগারে গেছেন কবি কো উন। মানসিক দৃঢ়তার সঙ্গে মিল রয়েছে তাঁর কবিতার। সুতরাং কো উন এবারের নোবেল পুরস্কার পেলে এশিয়াবাসীর জন্য সংগত কারণেই খুশির খবর হতো। কিন্তু এখানেও সাম্প্রতিক সময়ের একটা নেতিবাচক বিষয় বাধা হয়ে আছে। বয়স কম হলেও নাইজেরিয়ার চিমামন্দা নগোজি আদিচি পাঠকদের কাছে এরই মধ্যে লেখার মানের জন্যই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তাঁর লেখার ওজন কোনো দিক থেকেই কম নয়। আচেবের যোগ্য উত্তরসূরি তিনি। অগ্রজর অপ্রাপ্তি হয়তো তাঁর মাধ্যমেই পূরণ হতে পারে এ বছর।
নোবেল পুরস্কারের প্রাপক হিসেবে সোমালিয়ার ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহ, চীনের কবি বেই দাও, ইরানের কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ দৌলতাবাদী প্রমুখের যে কারো নাম উচ্চারিত হতেই পারে। পূর্ব আফ্রিকার অগ্রগণ্য লেখকদের অন্যতম নুরুদ্দিন ফারাহ উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও নাটক লেখেন। তিনি রেডিও ও মঞ্চের জন্য নাটক লেখেন। নিরীক্ষাধর্মী শৈলীর লেখক নুরুদ্দিন ফারাহ ইউরোপ-আমেরিকার অনেক সম্মানজনক পুরস্কার এরই মধ্যে পেয়ে গেছেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়া তাঁর পাঠকদের কাছে যথার্থই কাঙ্ক্ষিত। অনেক বছর ধরেই তাঁর নাম নোবেল মৌসুমে উচ্চারিত হয়ে আসছে।
ইসরায়েলের অন্যতম জনপ্রিয় কবি অগি মিশোলও আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে বেশ পরিচিত। নোবেল কমিটি তাঁকে বেছে নিলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু হবে না। তাঁর কবিতা একাধিক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। এহুদা আমিচাই পুরস্কারসহ আরো অনেক পুরস্কার তিনি পেয়েছেন কবিতার জন্য। ২০১৭ সালে ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পান ইসরায়েলি লেখক ডেভিড গ্রসমান। এবার তাঁর পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টা বেশ জোরালো। জন্মস্থান, সেখানকার রাজনীতি ও ইতিহাস তাঁর লেখক মানস তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর বই ত্রিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের কথা তুলে ধরেছেন তাঁর ২০০৮ সালের ‘টু দি এন্ড অব দ্য ল্যান্ড’ উপন্যাসে। যুদ্ধের ভয়াবহ ফলাফলের কথাসহ এখানে ইসরায়েলের সমসাময়িক জীবনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালের উপন্যাস ‘ফলিং আউট অব টাইম’ লিখেছেন সন্তানহারা মা-বাবার শোক-দুঃখ নিয়ে।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী লেখক অ্যালেক্সিস রাইটও নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতে পারেন। অ্যালেক্সিস বিশ্বের অন্যান্য নামকরা পুরস্কার পেয়েছেন বেশ কয়েকটি—জেমস টেইট, মাইলস ফ্রাংকলিন পুরস্কার ও স্টেলা পুরস্কার অন্যতম। স্টেলা পুরস্কার পেয়েছেন ২ বার। গত ২০ বছরে পরিবেশ ও মানুষের শিকড়ের কথা তিনি অনেক লিখেছেন। কথাসাহিত্য ছাড়াও তাঁর প্রবন্ধের বইগুলোতেও অ্যালেক্সিসের শক্তি প্রকাশ পেয়েছে।
এ বছর ইউক্রেনের কিংবা রাশিয়ার ভিন্নমতাবলম্বী কোনো লেখকও পেতে পারেন নোবেল। সেরহি ভিক্টরোভিচ ঝাদান ইউক্রেনের কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক, প্রবন্ধকার, সংগীতজ্ঞ ও সমাজকর্মী। সম্ভাব্য আরেকজন ইউক্রেনীয় লেখক ইউরি আঁদ্রেখোভিচ কবিতা, অনুবাদ ও কথাসাহিত্যের জন্য পাঠকমহলে পরিচিত। তাঁর লেখার অনুবাদ প্রকাশ করা হয়েছে পোল্যান্ড, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, রাশিয়া ও স্পেন থেকে। ইউক্রেনের কবি, গদ্য লেখক, সাংবাদিক ও প্রকাশক লিনা ভাসিলিভনা কোস্তেনকো সাবেক সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে পরিচিত। সিক্সটিয়ার কবিতা আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি তিনি। ইউক্রেনের গীতিকবিতার ধারা ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। আরেকজন ইউক্রেনীয় লেখক ও বুদ্ধিজীবী আঁদ্রে কুরকভও নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো পরিচিত। ইউক্রেনীয় ও রুশ উভয় ভাষায়ই লিখে থাকেন তিনি। চীনা, জার্মান, ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি,তালীয়, সুইডিশ, হিব্রু, ফারসিসহ ৩৭টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা।
এই আলোচনার মধ্যে কিংবা বাইরে আমাদের পরিচিত কেউ নোবেল পুরস্কার পেলে আমাদের ভালো লাগবে। একেবারে অপরিচিত কেউ পেলে তখন বিবেচ্য বিষয় হবে, তিনি পাঠক বিচারে কতখানি গ্রহণযোগ্য। অবশ্য আমাদের ভালোলাগা মন্দলাগা নিয়ে নোবেল কমিটির কিছু যায়-আসে না। শেষ পর্যন্ত আমরা অপেক্ষায় রইলাম নোবেল কমিটির খেয়ালের প্রতিফলন দেখার জন্য

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 























