বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মৃতির পথে ফিরে দেখা সিরাজগঞ্জের শৈশবের ঠিকানাগুলো

  • রায়হান রোহানঃ
  • প্রকাশিত সময় : ০৯:১০:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১০

চতুর্থ পর্ব : কুয়োর জলে আকাশের মুখ

শৈশবের স্মৃতির ভেতরে কিছু দৃশ্য কখনো পুরোনো হয় না। চোখ বন্ধ করলেই তারা আবার জেগে ওঠে— অবিকল, জীবন্ত ভাবে । আমার শৈশবের তেমনই এক নীরব সঙ্গী, সিরাজগঞ্জ মুজিব সড়কের সেই ভাড়া বাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কুয়ো। যা অজান্তেই আমার ভেতরে বাস করছে ।
আজকের শিশুরা হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, একটি কুয়োও কারও শৈশবের বন্ধু হতে পারে। এখন পানি আসে কলের মুখ ঘুরালেই অথবা হাতের ইশারায়। কিন্তু আমাদের সময়ে পানি মানে ছিল অপেক্ষা, শ্রম, আর এক টুকরো আনন্দ। সেই আনন্দের নাম ছিল—কুয়ো।
সানবাঁধানো সেই কুয়োটি আমার কাছে ছিল এক বিস্ময়। হাতির পেটের মতো গোল আর বিশাল তার শরীর। তার ভেতরের পানি এত গভীর, এত স্থির, যেন শত বছরের নীরবতা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। দড়িতে বাঁধা রূপার মতো চকচকে ঘটি ধীরে ধীরে নিচে নামত। তারপর একসময় ছপ্ করে পানিতে পড়ার সেই শব্দ—আজও কানে বাজে। সেই একটি শব্দ যেন নীরবতার বুক চিরে জন্ম নেওয়া একটি ছোট্ট সুর। ঘটি ভরে পানি তুলে আনতে আনতে মনে হতো, শুধু পানি নয়, কুয়োর গভীর থেকে যেন শীতলতা, প্রশান্তি আর অদ্ভুত এক শান্তিও তুলে আনছি।
গ্রীষ্মের দুপুরগুলো ছিল কুয়োর সবচেয়ে আপন সময়। কুয়োর পানি থাকত অবিশ্বাস্য রকম ঠান্ডা। কোনো কারণ ছাড়াই পা ডুবিয়ে বসে থাকা, একটু পরে পুরো শরীর ভিজিয়ে ফেলা, কিংবা পানির ছোট ছোট ঢেউ গুনে সময় কাটিয়ে দেওয়া—এসবের কোনো কারণ ছিল না। শৈশবের আনন্দের তো কখনো কারণ লাগে না; লাগে শুধু একটি বিকেল আর একটু অবসর।
কুয়োর ঘাটের ওপর ঝুঁকে থাকত সোহেল ভাইদের বাড়ির একটি বিশাল বড়ই গাছ। আজও মনে হয়, গাছটি যেন আমাদের জন্যই নুয়ে পড়েছিল। তার ডাল ছুঁয়ে যেত টিনের চাল, পাতার চেয়ে বড়ই-ই যেন বেশি ছিল।
সামান্য বাতাস উঠলেই টুপ… টাপ… করে পাকা বড়ই পড়ত।
সেই শব্দ শুনেই আমরা ছুটে যেতাম। আমরা বড়ই কুড়োচ্ছি বলে মনে হতো না।
মনে হতো, আকাশ ছোট ছোট সোনালি আনন্দ মাটির বুকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর আমরা সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছি।
কুয়ো থেকে একটু দূরে ছিল একটি রঙ্গন গাছ। দিনের আলোয়ও তার গাঢ় সবুজ পাতাগুলোকে রহস্যময় মনে হতো। যেন কোনো বৃদ্ধ সাধু সবুজ চাদর মুড়ি দিয়ে গভীর ধ্যানে বসে আছেন। সন্ধ্যা নামলে গাছটির ছায়া আরও ঘন হয়ে উঠত।
আধো আলোয় তাকালে বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি জেগে উঠত। মনে হতো, সেখানে বুঝি অদেখা কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ভূত মনে করে ভয় পেতাম, আবার পরদিন সেই একই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে খেলতাম।
আজও মনে মনে সেই কুয়োর ধারে গিয়ে বসি। দেখি স্থির কালো জলের বুকে নেমে এসেছে আকাশের মুখ, নীরব বিকেল, অব্যক্ত বিস্ময়। মনে হয়, জীবনের গভীরতম সৌন্দর্য শব্দে নয়, নীরবতায় বাস করে।

লেখক : মাহবুব সিদ্দিকী

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

স্মৃতির পথে ফিরে দেখা সিরাজগঞ্জের শৈশবের ঠিকানাগুলো

প্রকাশিত সময় : ০৯:১০:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চতুর্থ পর্ব : কুয়োর জলে আকাশের মুখ

শৈশবের স্মৃতির ভেতরে কিছু দৃশ্য কখনো পুরোনো হয় না। চোখ বন্ধ করলেই তারা আবার জেগে ওঠে— অবিকল, জীবন্ত ভাবে । আমার শৈশবের তেমনই এক নীরব সঙ্গী, সিরাজগঞ্জ মুজিব সড়কের সেই ভাড়া বাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কুয়ো। যা অজান্তেই আমার ভেতরে বাস করছে ।
আজকের শিশুরা হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, একটি কুয়োও কারও শৈশবের বন্ধু হতে পারে। এখন পানি আসে কলের মুখ ঘুরালেই অথবা হাতের ইশারায়। কিন্তু আমাদের সময়ে পানি মানে ছিল অপেক্ষা, শ্রম, আর এক টুকরো আনন্দ। সেই আনন্দের নাম ছিল—কুয়ো।
সানবাঁধানো সেই কুয়োটি আমার কাছে ছিল এক বিস্ময়। হাতির পেটের মতো গোল আর বিশাল তার শরীর। তার ভেতরের পানি এত গভীর, এত স্থির, যেন শত বছরের নীরবতা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। দড়িতে বাঁধা রূপার মতো চকচকে ঘটি ধীরে ধীরে নিচে নামত। তারপর একসময় ছপ্ করে পানিতে পড়ার সেই শব্দ—আজও কানে বাজে। সেই একটি শব্দ যেন নীরবতার বুক চিরে জন্ম নেওয়া একটি ছোট্ট সুর। ঘটি ভরে পানি তুলে আনতে আনতে মনে হতো, শুধু পানি নয়, কুয়োর গভীর থেকে যেন শীতলতা, প্রশান্তি আর অদ্ভুত এক শান্তিও তুলে আনছি।
গ্রীষ্মের দুপুরগুলো ছিল কুয়োর সবচেয়ে আপন সময়। কুয়োর পানি থাকত অবিশ্বাস্য রকম ঠান্ডা। কোনো কারণ ছাড়াই পা ডুবিয়ে বসে থাকা, একটু পরে পুরো শরীর ভিজিয়ে ফেলা, কিংবা পানির ছোট ছোট ঢেউ গুনে সময় কাটিয়ে দেওয়া—এসবের কোনো কারণ ছিল না। শৈশবের আনন্দের তো কখনো কারণ লাগে না; লাগে শুধু একটি বিকেল আর একটু অবসর।
কুয়োর ঘাটের ওপর ঝুঁকে থাকত সোহেল ভাইদের বাড়ির একটি বিশাল বড়ই গাছ। আজও মনে হয়, গাছটি যেন আমাদের জন্যই নুয়ে পড়েছিল। তার ডাল ছুঁয়ে যেত টিনের চাল, পাতার চেয়ে বড়ই-ই যেন বেশি ছিল।
সামান্য বাতাস উঠলেই টুপ… টাপ… করে পাকা বড়ই পড়ত।
সেই শব্দ শুনেই আমরা ছুটে যেতাম। আমরা বড়ই কুড়োচ্ছি বলে মনে হতো না।
মনে হতো, আকাশ ছোট ছোট সোনালি আনন্দ মাটির বুকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর আমরা সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছি।
কুয়ো থেকে একটু দূরে ছিল একটি রঙ্গন গাছ। দিনের আলোয়ও তার গাঢ় সবুজ পাতাগুলোকে রহস্যময় মনে হতো। যেন কোনো বৃদ্ধ সাধু সবুজ চাদর মুড়ি দিয়ে গভীর ধ্যানে বসে আছেন। সন্ধ্যা নামলে গাছটির ছায়া আরও ঘন হয়ে উঠত।
আধো আলোয় তাকালে বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি জেগে উঠত। মনে হতো, সেখানে বুঝি অদেখা কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ভূত মনে করে ভয় পেতাম, আবার পরদিন সেই একই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে খেলতাম।
আজও মনে মনে সেই কুয়োর ধারে গিয়ে বসি। দেখি স্থির কালো জলের বুকে নেমে এসেছে আকাশের মুখ, নীরব বিকেল, অব্যক্ত বিস্ময়। মনে হয়, জীবনের গভীরতম সৌন্দর্য শব্দে নয়, নীরবতায় বাস করে।

লেখক : মাহবুব সিদ্দিকী