প্রকাশিত সময় :
০৯:৫০:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
৫
বর্তমানে দেশে ৬০ বছরের বেশি প্রবীণ জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ। যা মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ ভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সাল শেষে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ৬৮ লাখে। অথচ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য নেই কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা। সরকারি-বেসরকারিভাবে তাদের আবাসনের ব্যবস্থাও অপ্রতুল। সরকার তাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করলেও পর্যাপ্ত নয়। এ সুবিধা পেতে অনেকেই ভোগান্তির শিকার হন। জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা কোনো মন্ত্রণালয় না থাকায় তাদের যেকোনো সেবা নিতে পদে পদে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। মোটাদাগে অবহেলা-অনাদরে প্রবীণ জনগোষ্ঠী।
এই অবস্থায় আজ দেশে পালিত হবে ‘বিশ্ব প্রবীণ দিবস’। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘায়ুর যুগ : দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোর পুনর্চিন্তা’।
নেই প্রবীণ নিবাস : সরকারি উদ্যোগে প্রবীণদের আবাসনের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে দেশের আটটি বিভাগে একটি করে সরকারি শিশু পরিবারের ভিতরে শান্তি নিবাস নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান অধিশাখা) মোহা. কামরুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ প্রকল্প সম্পন্ন হলেও শান্তি নিবাসের যাত্রা শুরু করা যায়নি। তবে নতুনভাবে এই সেবা চালু করতে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে সচিব কমিটিতে অনুমোদনের জন্য বিবেচনাধীন। বিদ্যমান জনবল দিয়েই শিশু পরিবারগুলোতে প্রবীণদের আবাসন ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে পরিকল্পনা করছি। দেশের ৮৫টি শিশু পরিবারের প্রতিটিতে ১০ জন করে প্রবীণ রাখার নির্দেশনা আছে। কিন্তু অনেক প্রবীণ সেখানে থাকতে আগ্রহী নন। আপাতত দেশের আটটি বিভাগে এই কার্যক্রম শুরুর পর যদি চাহিদা থাকে তখন আরও আবাসনব্যবস্থা করা হবে। সাধারণত বেসরকারি নিবাসগুলোতে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন সেবা পাওয়া যায়। এজন্য সেখানে প্রবীণদের রাখার ব্যাপারে মানুষ আগ্রহী। এ ছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট প্রবীণ নিবাস স্থাপন করা হয়েছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ এস এম আতিকুর রহমান বলেন, ‘ইসলামিক রীতি অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রবীণ নিবাসের ব্যবস্থা নেই। পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ও প্রবীণ নীতিমালা বাস্তবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ২০১৭ সালে প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছিলাম। যা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু এখনো সেটি পড়ে আছে। সরকারকে আগামী দিনে প্রবীণদের জন্য সর্বজনীন সামাজিক পেনশন কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির টাকা দরিদ্র প্রবীণদের প্রিমিয়াম হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। আর প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইন প্রণয়ন করতে হবে। এই আইনে প্রবীণদের আর্থিক, মানসিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত বিষয় রয়েছে। এর অধীনে একটি ফাউন্ডেশন হবে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো অর্থ প্রবীণদের জন্য আলাদাভাবে বরাদ্দ নেই। দেড় কোটির বেশি প্রবীণ যে দেশে সেখানে প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত কোনো মন্ত্রণালয়ও নেই। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যদি প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন হয় তাহলে তাঁদের জন্য আলাদাভাবে কাজ করা যাবে। প্রবীণদের মধ্যে নারীরা বেশি কষ্টে আছেন। এজন্য প্রবীণ পুরুষদের মৃত্যুর আগে তাঁর স্ত্রীর জন্য সম্পদ রেখে যাওয়া উচিত।
বয়স্ক ভাতা পেতে ভোগান্তি : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট অনুযায়ী বর্তমানে একজন প্রবীণকে মাসে ৭০০ টাকা বয়স্ক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ৯০ বছরের বেশি হলে ভাতা পান ১ হাজার টাকা। সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বয়স্ক ভাতার ক্ষেত্রে অনেক সময় বয়স্করা নিজের নাতিনাতনি, ছেলে বা ছেলের বউসহ অন্য আত্মীয়দের মোবাইল ফোনের নাম্বার দিয়ে ভাতা তোলেন। এ ক্ষেত্রে কিছু বয়স্ক ব্যক্তির স্বজনরাই সেই টাকা আত্মসাৎ করেন। এজন্য সরকার নিয়ম করেছে যিনি বয়স্ক ভাতা পাবেন, তাঁর মোবাইল নাম্বারেই টাকা পাঠানো হবে। ফলে গত অর্থবছরের শেষ দিকে প্রতারণা ও ভোগান্তি ঠেকাতে ভাতাভোগীদের নিজ নামে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভাতার অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা চালু করে সরকার। কিন্তু নাম্বার পরিবর্তনে অনেকেই টাকা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি প্রতারক চক্র ভাতাভোগীদের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের আরও বেশি অর্থ দেওয়া হবে এমন প্রলোভনে পিন ও কোড নম্বর সংগ্রহ করে। পরে ভাতাভোগীর অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা তারা হাতিয়ে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘জনসংখ্যায় প্রবীণদের বৃদ্ধির হার দ্রুতগতিতে হচ্ছে। ২০২৭ সালের দিকেই আমরা এজিং সোসাইটিতে রূপ নেব। ২০৪৭-এ গিয়ে জাপানের মতো এইজড সোসাইটিতে পরিণত হব। দেশে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রতি ১০ জনে একজন আছে। এই অনুযায়ী প্রবীণদের নিয়ে যে পরিকল্পনা আছে তাকে ঢেলে সাজাতে হবে। সবকিছু প্রবীণবান্ধব করতে হবে।’
নেই বিশেষায়িত সেবা : চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রবীণদের চিকিৎসার বিশেষ শাখাকে বলা হয় ‘জেরিয়াট্রিক মেডিসিন’। দেশে এই বিশেষায়িত সেবা খুবই কম। মানুষ এ সেবা সম্পর্কে কম জানে। এতে প্রবীণদের অন্য রোগীদের মতো দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেলে প্রবীণদের জন্য বিশেষ সেবা চালুর চেষ্টা করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। অন্য হাসপাতালগুলোতেও বিচ্ছিন্নভাবে এ বিশেষায়িত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য একটি জেরিয়াট্রিক ডে কেয়ার ইউনিট রয়েছে। এ ইউনিটের প্রধান ডা. মো. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্রবীণ হিতৈষী সংঘের একটি হাসপাতাল ঢাকার আগারগাঁওয়ে আছে। বারডেমেও একটি জেরিয়াট্রিক ডে কেয়ার আছে। শুক্রবার বাদে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রবীণদের সব ধরনের সেবা দেওয়া হয়। বারডেমে “ফল ক্লিনিক” নামে দ্রুত সেবা চালু করছি। প্রতি শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ক্লিনিকে সেবা দেওয়া হবে।’
প্রবীণ মন্ত্রণালয় চান প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব : প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইন্তেজার রহমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণার্থে দেশে একটি প্রবীণ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নানা মন্ত্রণালয় থাকলেও দেশের বিশাল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয় নেই। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। মুক্তিযোদ্ধা মো. ইন্তেজার রহমান বলেন, একটি প্রবীণ মন্ত্রণালয় গঠিত হলে কেবল রাজধানী নয়, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থেকে শুরু করে চাঁদপুরের শাহরাস্তি পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা অসুস্থ ও অসহায় প্রবীণরা সরকারি সেবার আওতায় আসতে পারবেন। আমার জীবন সায়াহ্নে একটাই চাওয়া-সরকার যেন প্রবীণদের অধিকার ও কল্যাণে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্রবীণ মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করে।