বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পশ্চিমবঙ্গের ঈদে আজ আনন্দ নেই

এ বছর পশ্চিমবঙ্গের ঈদুল আজহার চিত্রে দেখা গেল এক ভিন্ন বাস্তবতা। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেড রোডে ঈদের প্রধান জামাত না হয়ে তা অনুষ্ঠিত হয় ব্রিগেড ময়দানে। সকাল সাড়ে ৮টায় শুরু হওয়া এই জামাতে উপস্থিত ছিলেন ইমামে ঈদাইন ক্বারী ফজলুর রহমান। কিন্তু চেনা ভিড়টা আজ ছিল না। মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক অনেকটাই কম। চোখে-মুখে উৎসাহ বা উদ্দীপনা নেই। উৎসবের সেই চিরাচরিত ঢেউ এবার যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এক অব্যক্ত বিষাদে আজ হৃদয় ভারাক্রান্ত। দেড়-দুই লাখের জায়গায় কয়েক হাজার মানুষ হাজির হয়েছিলেন ঈদ জামাতে। রাজ্যজুড়ে কোরবানিও প্রায় বন্ধ। পুরো পশ্চিমবঙ্গে আজ উৎসবহীন ঈদুল আজহা।

রেড রোডের ঈদের জামাতের এক সুদীর্ঘ এবং ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে খিলাফত কমিটির উদ্যোগে এখানে নামাজ শুরু হয়। তখন আজকের এই ঝকঝকে রাস্তা ছিল না। পরে কলকাতা মহানগরীর পরিকাঠামোগত উন্নতি করে ব্রিটিশরা। তৈরি হয় রেড রোড। খিলাফত কমিটি তখন এই রাস্তায় কোনো আপত্তি করেনি। আবার ব্রিটিশ সরকারও কিন্তু ব্রিগেড মাঠে নামাজের জন্য জোর করেনি। তারাই রেড রোডে নামাজ বহাল রেখেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সেই রীতিই বহাল ছিল।
সবকিছুরই তো একটা শেকড় থাকে। নবাবী আমলের ইতিহাসটা একটু ফিরে দেখা যাক। বঙ্গ-বিহার-উড়িশার নবাব ছিলেন আলীবর্দী খাঁ। তিনি এক বিশাল সম্পত্তি ওয়াকফ করে দেন। ফোর্ট উইলিয়াম, ব্রিগেড মাঠ, ময়দান ও বাবুঘাট। এর সঙ্গে ইডেন গার্ডেন, আকাশবাণী ভবন, বিধানসভা ভবন, রাজভবন ও মহাকরণ। সব মিলিয়ে মোট ২৫৫৫ বিঘা জমি। হুগলি জেলার মৌলানা আমসুদ্দিন ও মৌলানা মসিউদ্দিনকে এই জমি দান করা হয়েছিল। ১৭৫৭ সালের পর বাংলায় ব্রিটিশ সরকার এলো। কিন্তু এই জমির ভাড়া তাদেরও মেটাতে হতো। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত যিনি রক্ষণাবেক্ষণকারী বা মোতোয়ালি ছিলেন, তাকে নিয়ম করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। শেষ তদারককারী আবুল‌ বরকত মারা যান। এরপর আর ভাড়া পাওয়া যায়নি। শুনলে অবাক হতে হয়, খোদ রাজভবন থেকে ভাড়া দেওয়া হতো মাত্র ১৯৯ টাকা।

আজ এই কলকাতা শহরের বুকে বহু ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখল হয়ে পড়ে আছে। জবরদখলকারীদের দৌরাত্ম্য সর্বত্র। সাচার কমিটির রিপোর্টের অন্যতম সুপারিশ ছিল সুস্পষ্ট। বলা হয়েছিল, এই ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো সামাজিক কাজে লাগাতে হবে। মুসলিমদের শিক্ষা বিস্তারে ব্যবহার করতে হবে। সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের বয়স আজ ২০ বছর হয়ে গেল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কি সেই সুপারিশ আদৌ বাস্তবায়িত হয়েছে? এই প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

ইতিহাস কেবল বঞ্চনার নয়। ইতিহাস ছিল প্রবল সম্প্রীতিরও। নবাবী আমলেরও আগে কলকাতা যখন মোগলদের অধীনে, তখনকার কথা। সম্রাট জাহাঙ্গীর কালীঘাটের মন্দিরের জন্য জায়গা দান করেছিলেন। আবার এই কলকাতারই পার্ক সার্কাস এলাকার কথা ধরা যাক। বীরেশ গুহ রোডের শিবমন্দির তৈরির জন্য জমি দিয়েছিলেন মুসলিমরা। একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এই ইতিবাচক ইতিহাসগুলো আজ বড় বেশি ম্লান। বর্তমানের কোলাহলে সেই মিলনের সুর আর শোনা যায় না। পড়ে থাকে কেবল বিষাদ। আর পড়ে থাকে উৎসবের জৌলুসহীন এক ব্রিগেড ময়দান।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পশ্চিমবঙ্গের ঈদে আজ আনন্দ নেই

প্রকাশিত সময় : ০৮:০৯:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
এ বছর পশ্চিমবঙ্গের ঈদুল আজহার চিত্রে দেখা গেল এক ভিন্ন বাস্তবতা। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেড রোডে ঈদের প্রধান জামাত না হয়ে তা অনুষ্ঠিত হয় ব্রিগেড ময়দানে। সকাল সাড়ে ৮টায় শুরু হওয়া এই জামাতে উপস্থিত ছিলেন ইমামে ঈদাইন ক্বারী ফজলুর রহমান। কিন্তু চেনা ভিড়টা আজ ছিল না। মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক অনেকটাই কম। চোখে-মুখে উৎসাহ বা উদ্দীপনা নেই। উৎসবের সেই চিরাচরিত ঢেউ এবার যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এক অব্যক্ত বিষাদে আজ হৃদয় ভারাক্রান্ত। দেড়-দুই লাখের জায়গায় কয়েক হাজার মানুষ হাজির হয়েছিলেন ঈদ জামাতে। রাজ্যজুড়ে কোরবানিও প্রায় বন্ধ। পুরো পশ্চিমবঙ্গে আজ উৎসবহীন ঈদুল আজহা।

রেড রোডের ঈদের জামাতের এক সুদীর্ঘ এবং ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে খিলাফত কমিটির উদ্যোগে এখানে নামাজ শুরু হয়। তখন আজকের এই ঝকঝকে রাস্তা ছিল না। পরে কলকাতা মহানগরীর পরিকাঠামোগত উন্নতি করে ব্রিটিশরা। তৈরি হয় রেড রোড। খিলাফত কমিটি তখন এই রাস্তায় কোনো আপত্তি করেনি। আবার ব্রিটিশ সরকারও কিন্তু ব্রিগেড মাঠে নামাজের জন্য জোর করেনি। তারাই রেড রোডে নামাজ বহাল রেখেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সেই রীতিই বহাল ছিল।
সবকিছুরই তো একটা শেকড় থাকে। নবাবী আমলের ইতিহাসটা একটু ফিরে দেখা যাক। বঙ্গ-বিহার-উড়িশার নবাব ছিলেন আলীবর্দী খাঁ। তিনি এক বিশাল সম্পত্তি ওয়াকফ করে দেন। ফোর্ট উইলিয়াম, ব্রিগেড মাঠ, ময়দান ও বাবুঘাট। এর সঙ্গে ইডেন গার্ডেন, আকাশবাণী ভবন, বিধানসভা ভবন, রাজভবন ও মহাকরণ। সব মিলিয়ে মোট ২৫৫৫ বিঘা জমি। হুগলি জেলার মৌলানা আমসুদ্দিন ও মৌলানা মসিউদ্দিনকে এই জমি দান করা হয়েছিল। ১৭৫৭ সালের পর বাংলায় ব্রিটিশ সরকার এলো। কিন্তু এই জমির ভাড়া তাদেরও মেটাতে হতো। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত যিনি রক্ষণাবেক্ষণকারী বা মোতোয়ালি ছিলেন, তাকে নিয়ম করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। শেষ তদারককারী আবুল‌ বরকত মারা যান। এরপর আর ভাড়া পাওয়া যায়নি। শুনলে অবাক হতে হয়, খোদ রাজভবন থেকে ভাড়া দেওয়া হতো মাত্র ১৯৯ টাকা।

আজ এই কলকাতা শহরের বুকে বহু ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখল হয়ে পড়ে আছে। জবরদখলকারীদের দৌরাত্ম্য সর্বত্র। সাচার কমিটির রিপোর্টের অন্যতম সুপারিশ ছিল সুস্পষ্ট। বলা হয়েছিল, এই ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো সামাজিক কাজে লাগাতে হবে। মুসলিমদের শিক্ষা বিস্তারে ব্যবহার করতে হবে। সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের বয়স আজ ২০ বছর হয়ে গেল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কি সেই সুপারিশ আদৌ বাস্তবায়িত হয়েছে? এই প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

ইতিহাস কেবল বঞ্চনার নয়। ইতিহাস ছিল প্রবল সম্প্রীতিরও। নবাবী আমলেরও আগে কলকাতা যখন মোগলদের অধীনে, তখনকার কথা। সম্রাট জাহাঙ্গীর কালীঘাটের মন্দিরের জন্য জায়গা দান করেছিলেন। আবার এই কলকাতারই পার্ক সার্কাস এলাকার কথা ধরা যাক। বীরেশ গুহ রোডের শিবমন্দির তৈরির জন্য জমি দিয়েছিলেন মুসলিমরা। একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এই ইতিবাচক ইতিহাসগুলো আজ বড় বেশি ম্লান। বর্তমানের কোলাহলে সেই মিলনের সুর আর শোনা যায় না। পড়ে থাকে কেবল বিষাদ। আর পড়ে থাকে উৎসবের জৌলুসহীন এক ব্রিগেড ময়দান।