শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে এসে কেঁদেছিলেন বিশ্বকাপ মাতানো শাকিরা

বিশ্বকাপের উন্মাদনায় যখন পুরো বিশ্ব মাতোয়ারা, তখন লাতিন পপ কুইন শাকিরাকে নিয়ে আবারও আলোচনা তুঙ্গে। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ ও ‘লা লা লা’র মতো গান দিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপের সঙ্গে যিনি গভীরভাবে জড়িয়ে গেছেন, সেই শাকিরা একসময় নীরবে এসেছিলেন বাংলাদেশে—এ কথা অনেকেরই অজানা।

ঘটনাটা ২০০৭ সালের। তখন প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সেই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন শাকিরা।

১৬ ডিসেম্বরের রাতে ঢাকায় পৌঁছে তিনি খুব বেশি সময় রাজধানীতে না থেকে সরাসরি ছুটে যান সিডরে বিধ্বস্ত উপকূলীয় অঞ্চলে। সফরের দ্বিতীয় দিনে তিনি পটুয়াখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে শিশু ও পরিবারগুলোর সঙ্গে সময় কাটান, তাদের দুর্দশা নিজ চোখে দেখেন এবং তাদের গল্প শোনেন।

সেই সফরের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত ছিল ১১ বছর বয়সী এক শিশু নিপার সঙ্গে তার দেখা। সিডরে বাবা-মাকে হারানো নিপার গান শোনে শাকিরা গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হন। পরে তিনি স্মৃতিচারণে বলেন, সেই শিশুর কণ্ঠে শোনা শোকগাথা তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না।

শাকিরা আরও জানান, ধ্বংসস্তূপের মাঝেও শিশুদের খেলতে, গান গাইতে এবং স্বপ্ন দেখতে দেখে তিনি আশান্বিত হয়েছিলেন। অনেক শিশু তখন ডাক্তার বা নার্স হওয়ার স্বপ্নের কথা বলেছিল, যা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

তিনি সিডরের ভয়াবহতা কাছ থেকে দেখে অত্যন্ত মর্মাহত হন। পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, মানুষের প্রিয়জন হারানোর কষ্ট—সবকিছুই তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।

পরবর্তীতে তিনি রাজশাহীতে ইউনিসেফের একটি প্রকল্পও পরিদর্শন করেন, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা বিভিন্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে সহায়তা পাচ্ছিল। শিশুদের কল্যাণে কাজ করার এই মানসিকতা তার দীর্ঘদিনের, যা তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘পিয়েস দেসকালসোস’ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করেছেন।

শৈশবে দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা থেকেই শিশুদের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন শাকিরা। সেই অভিজ্ঞতা তাকে সবসময়ই সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

ইউনিসেফ কর্মকর্তাদের মতে, তার এই সফর ছিল অনেকটাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে করা, প্রচারণার বাইরে গিয়ে তিনি বাস্তব পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সফর শেষে শাকিরা আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানান, বাংলাদেশের দুর্যোগপীড়িত শিশু ও মানুষের পাশে আরও বেশি সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য।

আজ যখন বিশ্বমঞ্চে শাকিরার পারফরম্যান্স নিয়ে আবারও আলোচনা চলছে, তখন অনেকেই হয়তো ভুলে যান—প্রায় দুই দশক আগে এই তারকাই বাংলাদেশের সিডরবিধ্বস্ত এলাকায় গিয়ে শিশুদের গল্প শুনেছিলেন, তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন এবং তাদের কষ্টকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

বাংলাদেশে এসে কেঁদেছিলেন বিশ্বকাপ মাতানো শাকিরা

প্রকাশিত সময় : ১০:০১:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় যখন পুরো বিশ্ব মাতোয়ারা, তখন লাতিন পপ কুইন শাকিরাকে নিয়ে আবারও আলোচনা তুঙ্গে। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ ও ‘লা লা লা’র মতো গান দিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপের সঙ্গে যিনি গভীরভাবে জড়িয়ে গেছেন, সেই শাকিরা একসময় নীরবে এসেছিলেন বাংলাদেশে—এ কথা অনেকেরই অজানা।

ঘটনাটা ২০০৭ সালের। তখন প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সেই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন শাকিরা।

১৬ ডিসেম্বরের রাতে ঢাকায় পৌঁছে তিনি খুব বেশি সময় রাজধানীতে না থেকে সরাসরি ছুটে যান সিডরে বিধ্বস্ত উপকূলীয় অঞ্চলে। সফরের দ্বিতীয় দিনে তিনি পটুয়াখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে শিশু ও পরিবারগুলোর সঙ্গে সময় কাটান, তাদের দুর্দশা নিজ চোখে দেখেন এবং তাদের গল্প শোনেন।

সেই সফরের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত ছিল ১১ বছর বয়সী এক শিশু নিপার সঙ্গে তার দেখা। সিডরে বাবা-মাকে হারানো নিপার গান শোনে শাকিরা গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হন। পরে তিনি স্মৃতিচারণে বলেন, সেই শিশুর কণ্ঠে শোনা শোকগাথা তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না।

শাকিরা আরও জানান, ধ্বংসস্তূপের মাঝেও শিশুদের খেলতে, গান গাইতে এবং স্বপ্ন দেখতে দেখে তিনি আশান্বিত হয়েছিলেন। অনেক শিশু তখন ডাক্তার বা নার্স হওয়ার স্বপ্নের কথা বলেছিল, যা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

তিনি সিডরের ভয়াবহতা কাছ থেকে দেখে অত্যন্ত মর্মাহত হন। পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, মানুষের প্রিয়জন হারানোর কষ্ট—সবকিছুই তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।

পরবর্তীতে তিনি রাজশাহীতে ইউনিসেফের একটি প্রকল্পও পরিদর্শন করেন, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা বিভিন্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে সহায়তা পাচ্ছিল। শিশুদের কল্যাণে কাজ করার এই মানসিকতা তার দীর্ঘদিনের, যা তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘পিয়েস দেসকালসোস’ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করেছেন।

শৈশবে দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা থেকেই শিশুদের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন শাকিরা। সেই অভিজ্ঞতা তাকে সবসময়ই সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

ইউনিসেফ কর্মকর্তাদের মতে, তার এই সফর ছিল অনেকটাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে করা, প্রচারণার বাইরে গিয়ে তিনি বাস্তব পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সফর শেষে শাকিরা আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানান, বাংলাদেশের দুর্যোগপীড়িত শিশু ও মানুষের পাশে আরও বেশি সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য।

আজ যখন বিশ্বমঞ্চে শাকিরার পারফরম্যান্স নিয়ে আবারও আলোচনা চলছে, তখন অনেকেই হয়তো ভুলে যান—প্রায় দুই দশক আগে এই তারকাই বাংলাদেশের সিডরবিধ্বস্ত এলাকায় গিয়ে শিশুদের গল্প শুনেছিলেন, তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন এবং তাদের কষ্টকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন।