শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এমবাপে বনাম হলান্ড, সাম্রাজ্য দখলের লড়াই

বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের একটা ম্যাচ। অথচ ফুটবল দুনিয়ার সব আলো এসে পড়েছে ফক্সবরোর একটি মাত্র সবুজ গালিচায়। যেখানে রাত ১টায় মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও নরওয়ে। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে দুই দলই ইতোমধ্যে নকআউটের টিকিট পকেটে পুরেছে। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে টেবিলের শীর্ষে ফ্রান্স। তবে আজকের লড়াই শুধু গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নয়, আজকের রাত নতুন যুগের দুই ফুটবল সম্রাটের সিংহাসন দখলের লড়াই। কিলিয়ান এমবাপে বনাম এর্লিং হলান্ড। চার গোল বনাম চার গোল। গোল্ডেন বুটের দৌড় আর ফুটবলের ভবিষ্যৎ কার হাতে উঠবে, সেই হিসাব মেলানোর রাত।

এক পাশে ফরাসি গতি আর শিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেছেন এমবাপে, দেম্বেলে ও ওলিসে। অন্য পাশে নরওয়েজিয়ান শক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন হলান্ড, ওডেগার্ড আর নুসা। তারকায় তারকায় ঠাসা বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা এই লড়াই যেন দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এক রোমাঞ্চকর সংঘর্ষ।

পরিসংখ্যানের আড়ালে দুই ঘাতক

ক্লাব মৌসুমের পরিসংখ্যানই বলে দেয় কেন এই দ্বৈরথকে বলা হচ্ছে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্ট্রাইকার যুদ্ধ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে হলান্ড ৩৫ ম্যাচে করেছেন ২৭ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট, তার রেটিং ৭.৬৮। অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে স্প্যানিশ লা লিগায় এমবাপে ৩১ ম্যাচে ২৫ গোল আর ৫ অ্যাসিস্ট নিয়ে ৮.০২ রেটিং নিয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন। প্রতি ৯০ মিনিটে ৩.৮০ শট, ৬৫টি সুযোগ সৃষ্টি এবং ২.৭০ সফল ড্রিবল নিয়ে এমবাপে শুধু একজন ফিনিশার নন, তিনি আক্রমণের স্থপতি। গতি বাড়িয়ে, জায়গা বানিয়ে নিজে বল টেনে নিয়ে যান প্রতিপক্ষের বক্সে।

হলান্ডের গল্পটা আবার একদম আলাদা। ৩.১০ শট, ২৫টি সুযোগ তৈরি করলেও তার আসল শক্তি বক্সে নিখুঁত ও কার্যকর উপস্থিতি। প্রতিপক্ষের রক্ষণের জন্য তিনি এক মূর্তিমান আতঙ্ক। গোল করার ধরনেও রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত। হলান্ডের ২১টি গোল এসেছে বাম পা থেকে এবং তার সিংহভাগই বক্সের ভেতর থেকে শরীর ব্যবহার করে ছিটকে দেওয়া বুলেটের মতো। অন্যদিকে এমবাপের ২৩ গোল এসেছে ডান পায়ে, যার মধ্যে বক্সের বাইরে থেকেই করেছেন ৬টি চোখ ধাঁধানো গোল। একজন আক্রমণ তৈরি করেন, অন্যজন নিখুঁত ফিনিশিংয়ে তার শেষ অধ্যায় লেখেন।

বিশ্বকাপে একে অপরের প্রতিবিম্ব

চলতি বিশ্বকাপে এসে অবশ্য দুজনই একে অপরের ছায়া হয়ে উঠেছেন। সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচেই দেখা গেছে সেই রুদ্ররূপ। দুজনেই করেছেন জোড়া গোল, দুজনেই পেয়েছেন ৯.০ রেটিং। এমবাপে সেখানে ১০০ শতাংশ শট অন টার্গেট, ৯৪ শতাংশ নিখুঁত পাস আর ৩৭ বার বল ছুঁয়েও একবারও বল না হারানোর অবিশ্বাস্য নজির গড়েন। ঠিক একই ম্যাচে কম টাচ করেও দুই গোল তুলে নেন হলান্ড, দেখান এরিয়াল ডুয়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য।

এরপর ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচেও যেন একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটল। দুজনেরই আবার জোড়া গোল এবং ৯.২ রেটিং। তবে সেখানেও নিজস্ব স্টাইল ধরে রেখেছিলেন দুজনে। এমবাপে ৫৯ টাচ, ৩৫ সফল পাস আর ৬টি বল রিকভারি করে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ সামলেছেন। আর হলান্ড কম বল পায়ে নিয়েও বেশি ক্ষতি করেছেন প্রতিপক্ষের, অবদান রেখেছেন ক্লিয়ারেন্স ও ডিফেন্সিভ ডুয়েলে।

আজ রাতের লড়াই তাই শুধু কম স্পর্শে ধ্বংস বনাম বেশি স্পর্শে নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা নয়। ফিনিশার বনাম নির্মাতার এই মহাযুদ্ধের শেষ বাঁশির পর স্কোরবোর্ডে হয়তো একটি দল বিজয়ী হিসেবে হাসবে। কিন্তু ফক্সবরোর এই রাতের আসল রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে অন্য এক প্রশ্নে, ফুটবলের নতুন যুগের আসল রাজা কে হতে যাচ্ছেন? এমবাপে নাকি হলান্ড?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

এমবাপে বনাম হলান্ড, সাম্রাজ্য দখলের লড়াই

প্রকাশিত সময় : ১১:০৬:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের একটা ম্যাচ। অথচ ফুটবল দুনিয়ার সব আলো এসে পড়েছে ফক্সবরোর একটি মাত্র সবুজ গালিচায়। যেখানে রাত ১টায় মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও নরওয়ে। প্রথম দুই ম্যাচ জিতে দুই দলই ইতোমধ্যে নকআউটের টিকিট পকেটে পুরেছে। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে টেবিলের শীর্ষে ফ্রান্স। তবে আজকের লড়াই শুধু গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নয়, আজকের রাত নতুন যুগের দুই ফুটবল সম্রাটের সিংহাসন দখলের লড়াই। কিলিয়ান এমবাপে বনাম এর্লিং হলান্ড। চার গোল বনাম চার গোল। গোল্ডেন বুটের দৌড় আর ফুটবলের ভবিষ্যৎ কার হাতে উঠবে, সেই হিসাব মেলানোর রাত।

এক পাশে ফরাসি গতি আর শিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেছেন এমবাপে, দেম্বেলে ও ওলিসে। অন্য পাশে নরওয়েজিয়ান শক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন হলান্ড, ওডেগার্ড আর নুসা। তারকায় তারকায় ঠাসা বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা এই লড়াই যেন দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এক রোমাঞ্চকর সংঘর্ষ।

পরিসংখ্যানের আড়ালে দুই ঘাতক

ক্লাব মৌসুমের পরিসংখ্যানই বলে দেয় কেন এই দ্বৈরথকে বলা হচ্ছে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্ট্রাইকার যুদ্ধ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে হলান্ড ৩৫ ম্যাচে করেছেন ২৭ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট, তার রেটিং ৭.৬৮। অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে স্প্যানিশ লা লিগায় এমবাপে ৩১ ম্যাচে ২৫ গোল আর ৫ অ্যাসিস্ট নিয়ে ৮.০২ রেটিং নিয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন। প্রতি ৯০ মিনিটে ৩.৮০ শট, ৬৫টি সুযোগ সৃষ্টি এবং ২.৭০ সফল ড্রিবল নিয়ে এমবাপে শুধু একজন ফিনিশার নন, তিনি আক্রমণের স্থপতি। গতি বাড়িয়ে, জায়গা বানিয়ে নিজে বল টেনে নিয়ে যান প্রতিপক্ষের বক্সে।

হলান্ডের গল্পটা আবার একদম আলাদা। ৩.১০ শট, ২৫টি সুযোগ তৈরি করলেও তার আসল শক্তি বক্সে নিখুঁত ও কার্যকর উপস্থিতি। প্রতিপক্ষের রক্ষণের জন্য তিনি এক মূর্তিমান আতঙ্ক। গোল করার ধরনেও রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত। হলান্ডের ২১টি গোল এসেছে বাম পা থেকে এবং তার সিংহভাগই বক্সের ভেতর থেকে শরীর ব্যবহার করে ছিটকে দেওয়া বুলেটের মতো। অন্যদিকে এমবাপের ২৩ গোল এসেছে ডান পায়ে, যার মধ্যে বক্সের বাইরে থেকেই করেছেন ৬টি চোখ ধাঁধানো গোল। একজন আক্রমণ তৈরি করেন, অন্যজন নিখুঁত ফিনিশিংয়ে তার শেষ অধ্যায় লেখেন।

বিশ্বকাপে একে অপরের প্রতিবিম্ব

চলতি বিশ্বকাপে এসে অবশ্য দুজনই একে অপরের ছায়া হয়ে উঠেছেন। সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচেই দেখা গেছে সেই রুদ্ররূপ। দুজনেই করেছেন জোড়া গোল, দুজনেই পেয়েছেন ৯.০ রেটিং। এমবাপে সেখানে ১০০ শতাংশ শট অন টার্গেট, ৯৪ শতাংশ নিখুঁত পাস আর ৩৭ বার বল ছুঁয়েও একবারও বল না হারানোর অবিশ্বাস্য নজির গড়েন। ঠিক একই ম্যাচে কম টাচ করেও দুই গোল তুলে নেন হলান্ড, দেখান এরিয়াল ডুয়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য।

এরপর ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচেও যেন একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটল। দুজনেরই আবার জোড়া গোল এবং ৯.২ রেটিং। তবে সেখানেও নিজস্ব স্টাইল ধরে রেখেছিলেন দুজনে। এমবাপে ৫৯ টাচ, ৩৫ সফল পাস আর ৬টি বল রিকভারি করে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ সামলেছেন। আর হলান্ড কম বল পায়ে নিয়েও বেশি ক্ষতি করেছেন প্রতিপক্ষের, অবদান রেখেছেন ক্লিয়ারেন্স ও ডিফেন্সিভ ডুয়েলে।

আজ রাতের লড়াই তাই শুধু কম স্পর্শে ধ্বংস বনাম বেশি স্পর্শে নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা নয়। ফিনিশার বনাম নির্মাতার এই মহাযুদ্ধের শেষ বাঁশির পর স্কোরবোর্ডে হয়তো একটি দল বিজয়ী হিসেবে হাসবে। কিন্তু ফক্সবরোর এই রাতের আসল রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে অন্য এক প্রশ্নে, ফুটবলের নতুন যুগের আসল রাজা কে হতে যাচ্ছেন? এমবাপে নাকি হলান্ড?