টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির সার্বিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা এবং সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুর্গত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার ১০টি উপজেলায় ২১২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে জেলা প্রশাসন। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ শতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাঙামাটিতে পৌঁছে আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল। তিনি দুর্গত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সমন্বিতভাবে উদ্ধার, ত্রাণ ও আশ্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এদিকে, টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ধসের ঝুঁকির কারণে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে সেখানে যাওয়া পাঁচ শতাধিক পর্যটক এখনো সাজেকে অবস্থান করছেন। প্রশাসন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে রাঙামাটির সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবারও শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নিতে বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটিতে পৌঁছান প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল। পরে তিনি শহরের ভেদভেদী এলাকায় বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খোলা আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
এ সময় তিনি আশ্রয় নেওয়া মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী ও খাবার বিতরণ করেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়েও খোঁজখবর নেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের সব সংস্থা নিরলসভাবে কাজ করছে এবং দুর্গত মানুষের পাশে সরকার সবসময় রয়েছে।’
তিনি জানান, সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁর সরাসরি নির্দেশনায় রাঙামাটির জন্য ৫০০ মেট্রিক টন, খাগড়াছড়ির জন্য ৪০০ মেট্রিক টন এবং বান্দরবানের জন্য ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলার জন্য মোট ১ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে। খাদ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে দুর্গত মানুষের জন্য নগদ সহায়তারও প্রয়োজন রয়েছে এবং সরকার সে বিষয়েও উদ্যোগ নিয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন যখন আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলছে, তখন কেউ যেন সেটিকে অবহেলা না করেন। অনেক সময় সতর্কবার্তা অমান্য করার কারণেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক দশকের মধ্যে এমন ভারী বর্ষণ খুব কমই দেখা গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও অতিবৃষ্টি ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। এটি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। তবে মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
মীর হেলাল বলেন, ‘সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার। জনগণের সেবা করাই আমাদের দায়িত্ব। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং অন্যান্য সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
গণমাধ্যমের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণকে সচেতন করতে আপনাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করুন। মানুষের জীবন রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আবহাওয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নতুন করে কোথাও পাহাড়ধস বা বন্যার ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























