মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন ফজিলতপূর্ণ ইবাদত

মানুষের চোখে অশ্রু আসার অনেক কারণ হতে পারে। কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনায়, কখনো ব্যর্থতার কষ্টে, কখনো আনন্দেও চোখ ভিজে ওঠে। কিন্তু যে অশ্রু আল্লাহর ভয়ে, তাঁর মহত্ত্ব উপলব্ধি করে এবং তাঁর রহমতের আশায় ঝরে—তার মর্যাদা ভিন্ন ও আকাশচুম্বী। এটি নিছক আবেগ নয়; বরং ইবাদতের এক গোপন ও মহামূল্যবান রূপ। এমন অশ্রু যা, শুধুমাত্র আল্লাহর ভালোবাসা ও ভয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে ঝরে, যেখানে কোনো মাখলুকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উদ্দেশ্য হয় না।

মহান আল্লাহর স্মরণে কান্না করা মানুষদের প্রশংসা করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তাদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ পাঠ করা হত, তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত।’ (সুরা মারইয়াম, আয়াত :৫৮)

অন্য আয়াতে বলেন, ‘আর তারা কাঁদতে কাঁদতে ভূমিতে চেহারা লুটিয়ে (সিজদা) দেয় এবং এ (কোরআন) তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে।’ (সুরা ইসরা, আয়াত :১০৯)

মুমিনের মধ্যে এই বিনয় আসে, মহান আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা থেকে। যেই ভালোবাসা মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয়।
ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি, জাহান্নামের আগুন দুটি চোখকে স্পর্শ করবে না। আল্লাহর ভয়ে যে চোখ ক্রন্দন করে এবং আল্লাহর রাস্তায় যে চোখ (নিরাপত্তার জন্য) পাহারা দিয়ে ঘুমবিহীনভাবে রাত পার করে দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৯)
এখানেই শেষ নয়, কঠিন কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিশেষ ছায়া লাভকারী সাত শ্রেণির একজন হলো সেই ব্যক্তি, ‘সে ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর জিকির করে, ফলে তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৬০)

সুবহানাল্লাহ! একান্ত নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে চোখের পানি ফেলা ঈমানের গভীরতার পরিচয়। কারণ সেখানে প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে না, থাকে শুধু রবের সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক। মহান রাব্বুল আলামীনের সামনে এক অসহায় ও গুনাহগার বান্দার আত্মসমর্পন। কারণ গুনাহ মানুষের অন্তরকে গাফেল করে দেয়। কঠিন করে দেয়। আর বান্দা যখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে ক্রন্দন করে, তখন তার অন্তর নরম হতে থাকে। তখন আল্লাহর স্মরণ, কোরআনের তিলাওয়াত তাকে প্রভাবিত করে, তার হূদয় ভয় ও প্রেমের ঢেউ তৈরি করে। ফলে সে আল্লাহর মুহাব্বতে ও ভালোবাসায় অশ্রুবিসর্জন দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল হূদয় নরম করার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) তাঁর সামনে সুরা নিসার ৪১ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করলে তিনি বললেন, ‘থামো।’ তখন দেখা গেল, তাঁর দুই চোখ অশ্রুসিক্ত। (বুখারি, হাদিস: ৪৫৮২)। উসমান (রা.) কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এত কাঁদতেন যে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। (তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৮)

তাই মুমিনের উচিত, অন্তরে মহান আল্লাহর মুহাব্বত ও ভয় তৈরি করা। কিছু সময় নির্জনে বসে কোরআন তিলাওয়াত করা, নিজের গুনাহ স্মরণ করা, আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের কথা ভাবা, কবর ও কিয়ামতের কথা স্মরণ করা এবং জান্নাত-জাহান্নামের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করা—এসব হূদয়কে নরম করে।
হয়তো একদিন এসব ভাবতে গিয়ে চোখ থেকে একটি অশ্রুবিন্দু ঝরে পড়বে। সেই অশ্রু হয়তো সারা জীবনের গুনাহ ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিপূর্ণ হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করুন। পাপাচারের প্রভাবে কঠিন হয়ে যাওয়া অন্তরগুলোকে আল্লাহর ভালোবাসা ও ভয়ে নরম করে তুলুন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আর্জেন্টিনার ৩ ম্যাচের সূচি প্রকাশ, খেলবেন মেসি?

আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন ফজিলতপূর্ণ ইবাদত

প্রকাশিত সময় : ১০:১০:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানুষের চোখে অশ্রু আসার অনেক কারণ হতে পারে। কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনায়, কখনো ব্যর্থতার কষ্টে, কখনো আনন্দেও চোখ ভিজে ওঠে। কিন্তু যে অশ্রু আল্লাহর ভয়ে, তাঁর মহত্ত্ব উপলব্ধি করে এবং তাঁর রহমতের আশায় ঝরে—তার মর্যাদা ভিন্ন ও আকাশচুম্বী। এটি নিছক আবেগ নয়; বরং ইবাদতের এক গোপন ও মহামূল্যবান রূপ। এমন অশ্রু যা, শুধুমাত্র আল্লাহর ভালোবাসা ও ভয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে ঝরে, যেখানে কোনো মাখলুকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উদ্দেশ্য হয় না।

মহান আল্লাহর স্মরণে কান্না করা মানুষদের প্রশংসা করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তাদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ পাঠ করা হত, তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত।’ (সুরা মারইয়াম, আয়াত :৫৮)

অন্য আয়াতে বলেন, ‘আর তারা কাঁদতে কাঁদতে ভূমিতে চেহারা লুটিয়ে (সিজদা) দেয় এবং এ (কোরআন) তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে।’ (সুরা ইসরা, আয়াত :১০৯)

মুমিনের মধ্যে এই বিনয় আসে, মহান আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা থেকে। যেই ভালোবাসা মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয়।
ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি, জাহান্নামের আগুন দুটি চোখকে স্পর্শ করবে না। আল্লাহর ভয়ে যে চোখ ক্রন্দন করে এবং আল্লাহর রাস্তায় যে চোখ (নিরাপত্তার জন্য) পাহারা দিয়ে ঘুমবিহীনভাবে রাত পার করে দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৯)
এখানেই শেষ নয়, কঠিন কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিশেষ ছায়া লাভকারী সাত শ্রেণির একজন হলো সেই ব্যক্তি, ‘সে ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর জিকির করে, ফলে তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৬০)

সুবহানাল্লাহ! একান্ত নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে চোখের পানি ফেলা ঈমানের গভীরতার পরিচয়। কারণ সেখানে প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে না, থাকে শুধু রবের সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক। মহান রাব্বুল আলামীনের সামনে এক অসহায় ও গুনাহগার বান্দার আত্মসমর্পন। কারণ গুনাহ মানুষের অন্তরকে গাফেল করে দেয়। কঠিন করে দেয়। আর বান্দা যখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে ক্রন্দন করে, তখন তার অন্তর নরম হতে থাকে। তখন আল্লাহর স্মরণ, কোরআনের তিলাওয়াত তাকে প্রভাবিত করে, তার হূদয় ভয় ও প্রেমের ঢেউ তৈরি করে। ফলে সে আল্লাহর মুহাব্বতে ও ভালোবাসায় অশ্রুবিসর্জন দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল হূদয় নরম করার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) তাঁর সামনে সুরা নিসার ৪১ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করলে তিনি বললেন, ‘থামো।’ তখন দেখা গেল, তাঁর দুই চোখ অশ্রুসিক্ত। (বুখারি, হাদিস: ৪৫৮২)। উসমান (রা.) কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এত কাঁদতেন যে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। (তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৮)

তাই মুমিনের উচিত, অন্তরে মহান আল্লাহর মুহাব্বত ও ভয় তৈরি করা। কিছু সময় নির্জনে বসে কোরআন তিলাওয়াত করা, নিজের গুনাহ স্মরণ করা, আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের কথা ভাবা, কবর ও কিয়ামতের কথা স্মরণ করা এবং জান্নাত-জাহান্নামের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করা—এসব হূদয়কে নরম করে।
হয়তো একদিন এসব ভাবতে গিয়ে চোখ থেকে একটি অশ্রুবিন্দু ঝরে পড়বে। সেই অশ্রু হয়তো সারা জীবনের গুনাহ ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিপূর্ণ হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করুন। পাপাচারের প্রভাবে কঠিন হয়ে যাওয়া অন্তরগুলোকে আল্লাহর ভালোবাসা ও ভয়ে নরম করে তুলুন।