বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুদকের মামলার পরও স্বপদে গোদাগাড়ী সার্কেলের এএসপি

আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রাজশাহীর গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মীর্জা মো. আব্দুস ছালাম ও তাঁর স্ত্রী শাহানা পারভীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা হয়েছে সাত মাস আগে। তবে মামলা হওয়ার পরও একই পদে বহাল রয়েছেন আব্দুস ছালাম। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়টিই জানেন না বলে জানিয়েছেন পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আশিক সাঈদ ও রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মামুন অর রশিদ।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটি করেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন। মামলায় এএসপি আব্দুস ছালাম ও তাঁর স্ত্রী শাহানা পারভীনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলা দায়েরের সময়ও আব্দুস ছালাম গোদাগাড়ী সার্কেলের এএসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাত মাস পরও তিনি একই পদে রয়েছেন।

দুদকের এজাহার সূত্রে জানা গেছে, শাহানা পারভীন তাঁর সম্পদ বিবরণীতে ২১ লাখ ৭৪ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেছিলেন। তবে তদন্তে তাঁর নামে ৯৫ লাখ ১৬ হাজার টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সন্ধান পায় দুদক। এর বিপরীতে তাঁর বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায় ৭ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ৭৩ লাখ ৪২ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, শাহানা পারভীন একজন গৃহিণী। তাঁর স্বামী এএসপি আব্দুস ছালাম ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন এবং সেই অর্থ স্ত্রীর নামে বিনিয়োগ করেন। পরে ওই সম্পদ বৈধ করার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর অভিযোগ পাওয়ার পর দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে প্রমাণ সংগ্রহ করে মামলাটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল বারী বলেন, দীর্ঘ অনুসন্ধানে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়ায় এএসপি আব্দুস ছালাম ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ সিদ্দিক তদন্ত করছেন। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, এএসপি আব্দুস ছালাম উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে পুলিশে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ পরিদর্শক হন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি রাজশাহী ও নাটোরের বিভিন্ন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ই তিনি এএসপি পদে পদোন্নতি পান। বর্তমানে দুর্নীতির মামলার পরও ‘বগুড়া বাড়ি’ পরিচয়ে গোদাগাড়ী সার্কেলের এএসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পুলিশের সূত্রগুলো আরও জানায়, স্বপদে বহাল থেকে আব্দুস ছালাম দুদকের মামলার তদন্তেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। মামলা হওয়ার কারণে তাঁর ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে বলেও তিনি বিভিন্নজনকে জানিয়েছেন বলে সূত্রগুলোর দাবি।

গোদাগাড়ী নাগরিক স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘গোদাগাড়ী মাদকপ্রবণ এলাকা। আমরা শুনেছি, এএসপি মীর্জা মো. আব্দুস ছালামের সঙ্গে মাদক কারবারিদের সখ্যতা আছে। রাতে অবৈধ টাকার লেনদেন হয়। তিনি সবকিছু ম্যানেজ করে রাখেন। তাই দুর্নীতির মামলার পরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তিনি বহাল আছেন। অথচ এই মামলা হওয়ার পরই তাঁকে প্রত্যাহার করা উচিত ছিল।’

তবে মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এএসপি মীর্জা মো. আব্দুস ছালাম। তিনি বলেন, ‘মাদক কারবারিদের সঙ্গে আমার কোনো কাজ নেই। অভিযোগ সঠিক না।’

দুদকের মামলার বিষয়ে আব্দুস ছালাম বলেন, ‘অভিযোগ অনুসন্ধানের পর আমার স্ত্রী দুদকের কর্মকর্তাকে বলেছিলেন যে তাঁরাই দুর্নীতি করেন। এই মন্তব্যের কারণেই প্রতিহিংসাবশত মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। দুদকের মামলার ভিত্তি নেই। আমি লিখিত দিয়েছি।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

রাজশাহীর পুলিশ সুপার মো. মামুন অর রশিদ বলেন, ‘আমি রাজশাহীতে নতুন এসেছি। এএসপি আব্দুস ছালামের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা করার বিষয়টি আমার জানা নেই। আমাকে খোঁজ নিতে হবে।’

পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদও মামলার বিষয়ে জানেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

‘বিয়ে শুধুই কাগজের সম্পর্ক নয়, পরস্পরের ভালোবাসা ও সম্মান জরুরি’

দুদকের মামলার পরও স্বপদে গোদাগাড়ী সার্কেলের এএসপি

প্রকাশিত সময় : ১০:১১:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রাজশাহীর গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মীর্জা মো. আব্দুস ছালাম ও তাঁর স্ত্রী শাহানা পারভীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা হয়েছে সাত মাস আগে। তবে মামলা হওয়ার পরও একই পদে বহাল রয়েছেন আব্দুস ছালাম। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়টিই জানেন না বলে জানিয়েছেন পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আশিক সাঈদ ও রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মামুন অর রশিদ।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটি করেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন। মামলায় এএসপি আব্দুস ছালাম ও তাঁর স্ত্রী শাহানা পারভীনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলা দায়েরের সময়ও আব্দুস ছালাম গোদাগাড়ী সার্কেলের এএসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাত মাস পরও তিনি একই পদে রয়েছেন।

দুদকের এজাহার সূত্রে জানা গেছে, শাহানা পারভীন তাঁর সম্পদ বিবরণীতে ২১ লাখ ৭৪ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেছিলেন। তবে তদন্তে তাঁর নামে ৯৫ লাখ ১৬ হাজার টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সন্ধান পায় দুদক। এর বিপরীতে তাঁর বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায় ৭ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ৭৩ লাখ ৪২ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, শাহানা পারভীন একজন গৃহিণী। তাঁর স্বামী এএসপি আব্দুস ছালাম ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন এবং সেই অর্থ স্ত্রীর নামে বিনিয়োগ করেন। পরে ওই সম্পদ বৈধ করার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর অভিযোগ পাওয়ার পর দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে প্রমাণ সংগ্রহ করে মামলাটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল বারী বলেন, দীর্ঘ অনুসন্ধানে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়ায় এএসপি আব্দুস ছালাম ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ সিদ্দিক তদন্ত করছেন। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, এএসপি আব্দুস ছালাম উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে পুলিশে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ পরিদর্শক হন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি রাজশাহী ও নাটোরের বিভিন্ন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ই তিনি এএসপি পদে পদোন্নতি পান। বর্তমানে দুর্নীতির মামলার পরও ‘বগুড়া বাড়ি’ পরিচয়ে গোদাগাড়ী সার্কেলের এএসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পুলিশের সূত্রগুলো আরও জানায়, স্বপদে বহাল থেকে আব্দুস ছালাম দুদকের মামলার তদন্তেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। মামলা হওয়ার কারণে তাঁর ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে বলেও তিনি বিভিন্নজনকে জানিয়েছেন বলে সূত্রগুলোর দাবি।

গোদাগাড়ী নাগরিক স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘গোদাগাড়ী মাদকপ্রবণ এলাকা। আমরা শুনেছি, এএসপি মীর্জা মো. আব্দুস ছালামের সঙ্গে মাদক কারবারিদের সখ্যতা আছে। রাতে অবৈধ টাকার লেনদেন হয়। তিনি সবকিছু ম্যানেজ করে রাখেন। তাই দুর্নীতির মামলার পরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তিনি বহাল আছেন। অথচ এই মামলা হওয়ার পরই তাঁকে প্রত্যাহার করা উচিত ছিল।’

তবে মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এএসপি মীর্জা মো. আব্দুস ছালাম। তিনি বলেন, ‘মাদক কারবারিদের সঙ্গে আমার কোনো কাজ নেই। অভিযোগ সঠিক না।’

দুদকের মামলার বিষয়ে আব্দুস ছালাম বলেন, ‘অভিযোগ অনুসন্ধানের পর আমার স্ত্রী দুদকের কর্মকর্তাকে বলেছিলেন যে তাঁরাই দুর্নীতি করেন। এই মন্তব্যের কারণেই প্রতিহিংসাবশত মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। দুদকের মামলার ভিত্তি নেই। আমি লিখিত দিয়েছি।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

রাজশাহীর পুলিশ সুপার মো. মামুন অর রশিদ বলেন, ‘আমি রাজশাহীতে নতুন এসেছি। এএসপি আব্দুস ছালামের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা করার বিষয়টি আমার জানা নেই। আমাকে খোঁজ নিতে হবে।’

পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদও মামলার বিষয়ে জানেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।’