বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং পার্টনার ‘সহজ ডটকম’ এবং রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেট। সার্ভার খোলার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে টিকিট উধাও হয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে সেই টিকিটগুলো দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে বিক্রির মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটছে এই চক্র।
সম্প্রতি আদালতের কঠোর নির্দেশনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় এই সিন্ডিকেটের ভেতরের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এই চক্রের সদস্য সংখ্যা শতাধিকের ওপরে এবং নেতৃত্বে আছেন ৩০ জন। বাংলাদেশ রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ একটি অনুসন্ধান নথি (নথি শিরোনাম: পিপি-২৯) এবং সিলেটের আদালতের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অনুসন্ধানে এই ভয়ংকর টিকিট ব্লকিং সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
পিবিআই সূত্র জানায়, চলতি মাসেই সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে অনলাইনে টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম ও মুহূর্তের মধ্যে টিকিট গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা (মিস কেস নং-০১/২০২৬) দায়ের করেন এবং পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। গত ২২ সেপ্টেম্বর সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমান স্বপ্রণোদিত হয়ে এই টিকিট কারসাজির ঘটনায় মামলাটি দায়ের করেন। পিবিআইর অনুসন্ধানে এই সিন্ডিকেটের মূলহোতা নেতাদের যে নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— সহজ ডটকমের পিয়ন মিজান ঢালী, কালোবাজারি চক্রের সেলিম, উত্তম চন্দ্র দাস, মোজাম্মেল ও রহিম। এদের মধ্যে মিজান, সেলিম ও উত্তম একাধিকবার গ্রেপ্তারও হয়েছিল। এ ছাড়া বুক মাই রেইল বিডি ডটকম-এর মতো কিছু অবৈধ ও অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও টিকিট কালোবাজারি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। -রূপালী বাংলাদেশ
পিবিআই সূত্র জানায়, কালোবাজারি চক্রের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক ও কারিগরি সহায়তাকারী মিজান ঢালী। সহজ ডটকমের ভেতরের তথ্য এবং সিস্টেমের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে টিকিট বুকিংয়ের মূল দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মাঠপর্যায়ের টিকিট সংগ্রহ ও কালোবাজারি নেটওয়ার্কের অন্যতম শীর্ষ নিয়ন্ত্রক ও সিন্ডিকেট প্রধান হচ্ছে সেলিম ও তার সহযোগী রহিম।
সেলিম সিন্ডিকেটের সমান্তরালে আরেকটি শক্তিশালী চক্রের নেতৃত্ব দিতেন উত্তম চন্দ্র দাস, যার নেটওয়ার্ক বিভিন্ন স্টেশনের বুকিং কাউন্টার পর্যন্ত বিস্তৃত। তার প্রধান সহযোগী হচ্ছেন মোজাম্মেল। এই সিন্ডিকেটে কয়েকশ সক্রিয় সদস্য যুক্ত রয়েছেন।
সূত্র আরও জানায়, চক্রটির নেটওয়ার্ক মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত। একটি হচ্ছে আইটি ও টেকনিক্যাল টিম। এই টিমে আছে সহজ ডটকমের কয়েকজন অসাধু আইটি কর্মী এবং বাইরের হ্যাকার, যারা সার্ভার নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘বট’ ও বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করে।
আরেকটি স্তর হচ্ছে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ। এরা হচ্ছেন স্টেশনের অসাধু কর্মকর্তা ও বুকিং কাউন্টারের কর্মচারী, যারা কোটার টিকিট এবং অবিক্রীত টিকিট কালোবাজারিদের হাতে তুলে দেন। আরেকটি হচ্ছে, মাঠপর্যায়ের দালাল ও অনলাইন বিক্রেতা। ফেসবুক গ্রুপ, মেসেঞ্জার এবং বিভিন্ন অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যারা যাত্রীদের কাছে চড়া দামে টিকিট বিক্রি করে।
সিন্ডিকেটটি প্রধানত দুটি কৌশলে সাধারণ যাত্রীদের টিকিট থেকে বঞ্চিত করে থাকে। একটি হচ্ছে বট প্রযুক্তির ব্যবহার। সকাল ৮টায় টিকিট বুকিং চালু হওয়ার সাথে সাথেই সাধারণ মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্বয়ংক্রিয় ‘বট’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেকেন্ডের মধ্যে শত শত টিকিট লক করে ফেলা হয়। আরেক কৌশল হচ্ছে অননুমোদিত ওয়েবসাইটের ফাঁদ। রেলওয়ের অফিশিয়াল সিস্টেমের বাইরে বুক মাই রেইল বিডিডটকমের মতো বিভিন্ন অবৈধ ও অননুমোদিত ওয়েবসাইট তৈরি করে সমান্তরাল ব্ল্যাক মার্কেট চালানো।
বাংলাদেশ রেলওয়েও এই অভিযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে। (নথি শিরোনাম: পিপি-২৯) তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হাতে আসা সার্ভার লগ এবং প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানী তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ যখন একটি টিকিটের জন্য নাম, এনআইডি এবং ওটিপি টাইপ করতে অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ সেকেন্ড সময় নিচ্ছেন, সেখানে সিন্ডিকেটের ব্যবহৃত বট বা স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট মাত্র ০.৫ সেকেন্ডে একই সাথে শত শত এনআইডি ব্যবহার করে সিট ব্লক করে ফেলছে।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ পিপি-২৯ নথির তদন্ত তথ্যমতে, বুক মাই রেইল বিডিডটকম নামের একটি অননুমোদিত ওয়েব পোর্টাল ও স্বয়ংক্রিয় বটের মাধ্যমে এই টিকিট ব্লকিংয়ের কারসাজি চালানো হয়। কালোবাজারিদের ব্যবহৃত বুকিং আইডির সাথে ‘সহজ’-এর ইন্টারনাল আইপি অ্যাড্রেস ও ব্যাক-অ্যান্ড কোডের সরাসরি অনৈতিক সংযোগ রয়েছে। কাউন্টার থেকে সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট ছাড়ার আগেই অনলাইনের ব্যাক-অ্যান্ড সুবিধা ব্যবহার করে আসনগুলো পকেটস্থ করা হয়। পরবর্তীতে ফেসবুকের বিভিন্ন গোপন গ্রুপ, টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং কাউন্টারের আশপাশে এই টিকিটগুলো মূল দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের প্রাপ্ত উপাত্ত ও সার্ভার স্ট্রাকচার বিশ্লেষণে এই সিন্ডিকেটের কাজের ধরনকেও কয়েকটি ধাপে ভাগ করেছে। যেমন— ব্যাক-অ্যান্ড এপিআই এক্সেস) ও বাইপাস। সাধারণ ব্যবহারকারীকে অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে রিফ্রেশ করে ক্যাপচা ও ওটিপি পার হতে হয়। কিন্তু কারিগরি চক্রটি সহজের মূল সার্ভারের ‘ডেভেলপার এপিআই’-এ সরাসরি এক্সেস নিয়ে স্ক্রিপ্ট বা বট চালিয়ে দেয়। ফলে ইন্টারফেস ছাড়াই সরাসরি সার্ভার ডেটাবেজে রিকোয়েস্ট পৌঁছায়। আরও আছে অটো-ফিল ও এনআইডি ক্লোনিং। বট সফটওয়্যারে পূর্ব থেকেই শত শত ভুয়া বা চুরি করা এনআইডি এবং মোবাইল নম্বর সেভ করা থাকে। সকাল ৮টা বাজার ১ সেকেন্ড আগেই মিলিফ্রেকশনে এসব এনআইডি অটো-ইনপুট হয়ে ০.৫ সেকেন্ডে সিট ‘পেন্ডিং হোল্ড’ বা ‘বুকড’ করে ফেলে। এ ছাড়াও আছে, অননুমোদিত পোর্টাল ও ফেক আইপি ব্যবহার। অভ্যন্তরীণ পিপি-২৯ নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ থাকা বুক মাই রেল বিডিডটকমের মতো প্রক্সি পোর্টালের মাধ্যমে এই ট্রাফিক ঘুরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে সাধারণ ফায়ারওয়াল বা সিকিউরিটি ফিল্টার একে সাধারণ ইউজার ভেবে বিভ্রান্ত হয়।
রেল সূত্র জানায়, রেলওয়ের প্রধান সহকারী, উপপরিচালক (টিসি) এবং যুগ্ম মহাপরিচালক (অপারেশন) স্বাক্ষরিত ‘পিপি-২৯’ নথির ভিত্তিতে সহজ ডটকম-এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তবে তারা বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন, তাদের সিকিউরিটি সিস্টেম অত্যন্ত শক্তিশালী। কোনো বট বা স্ক্রিপ্ট দিয়ে টিকিট কাটার সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষের বিপুল চাহিদার কারণেই টিকিট দ্রুত শেষ হয়। তবে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধের প্রমাণ মিললে তারা সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই সংকটকে প্রাতিষ্ঠানিক ডাকাতি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এটি কেবল সাধারণ কালোবাজারি নয়, এটি একটি পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার অপরাধ। যখনই কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে রেলের মতো বড় পাবলিক সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন রেলের নিজস্ব একটি শক্তিশালী আইটি অডিট টিম থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। রেল কর্তৃপক্ষ সহজ-এর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে নিজেদের দায় এড়াতে পারে না। প্রতি মিনিটে কত টিকিট ইস্যু হচ্ছে এবং কোন আইপি থেকে রিকোয়েস্ট আসছে, তার লাইভ ড্যাশবোর্ড জনগণের জন্য উন্মুক্ত না করলে এই টিকিট চুরির সিন্ডিকেট কখনো ভাঙা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিন্ডিকেট প্রতিরোধে অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। রেলের আইটি অবকাঠামো ও সহজের কোডবেস সরাসরি জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বা কোনো স্বাধীন আইটি অডিট টিমের মাধ্যমে নিয়মিত স্ক্যান করা। কোন কাউন্টার বা কোন আইপি থেকে প্রতি সেকেন্ডে কতটি টিকিট কাটা হচ্ছে, তা সর্বসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত করা। এপিআই রিকোয়েস্টে কঠোর রেট-লিমিটিং এবং ডিভাইস বায়োমেট্রিক বা কঠোর ওটিপি যাচাই নিশ্চিত করা দরকার।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 























