মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাহ্নবী-সুনয়না-কীর্তির আপত্তিকর ছবি, কঠোর আইনের দাবি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিনোদনজগতে। জাহ্নবী কাপুর, সুনয়না ও কীর্তি সুরেশের মতো অভিনেত্রীরাও তাদের ছবি ও ভিডিও বিকৃত করে আপত্তিকর ডিপফেক কনটেন্ট তৈরির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে স্পষ্ট ও বড় করে সতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়টি আইন করে বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন ভিএফএক্স বিশেষজ্ঞ সিবি অরুণ কুমার।

হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পার্ল একাডেমির কমিউনিকেশন, ফিল্ম অ্যান্ড গেমিং বিভাগের ডিন অরুণ কুমার এআই ব্যবহারের নৈতিক দিক, শিল্পীদের স্বত্ব এবং প্রযুক্তিটির অপব্যবহার নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, এআইয়ের সব ধরনের ব্যবহারকে একসঙ্গে দোষারোপ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর অপব্যবহার রোধে কার্যকর আইনও জরুরি।

আপত্তিকর কনটেন্ট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

অরুণ কুমার জানান, এআই কিংবা উন্নত ডিপফেক প্রযুক্তির প্রচলনের আগেও ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করা হতো। কখনো বডি ডাবল, কখনো ফটোশপ, আবার কখনো ভিএফএক্সের ক্লোনিং ও মরফিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব কাজ করা হতো। এখন দ্রুত অর্থ উপার্জনের জন্য সেই তালিকায় নতুন হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত হয়েছে এআই।

তিনি বলেন, “এ ধরনের আপত্তিকর কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার জন্য আগে থেকেই অনেক আইনি উপায় রয়েছে।”

তবে, তার মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এআইয়ের কারণে দর্শকদের পক্ষে আসল ও নকল কনটেন্টের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “ইনস্টাগ্রামের মতো বৈধ প্ল্যাটফর্মেও এআই কনটেন্টের সতর্কবার্তা খুব ছোট করে, আড়ালে দেওয়া থাকে। ফলে দর্শকের চোখে তা সহজে পড়ে না।”

অরুণ কুমারের ভাষায়, “আমাদের আরো কঠোর আইন প্রয়োজন, যেখানে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে স্পষ্ট ও বড় করে সতর্কবার্তা দেওয়া বাধ্যতামূলক থাকবে। তাহলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া কিছু দুর্যোগের ভিডিওর মতো এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট আর নিজেদের সংবাদ বলে চালিয়ে দিতে পারবে না। আসল সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন দর্শক বুঝতে পারেন না কোনটি সত্য আর কোনটি নকল।”

তবে, এআই প্রযুক্তির সামগ্রিক সমালোচনাকে বোকামি বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, এআইয়ের সাধারণ ব্যবহার এবং কোনো শিল্পীর অনুমতি ছাড়া তার কাজ দিয়ে এআই প্রশিক্ষণ দিয়ে অবৈধভাবে কনটেন্ট তৈরির বিষয় দুটি আলাদা করে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, “এআইয়ের ঢালাও সমালোচনা করা এবং কোনো শিল্পীর অনুমতি ছাড়া তার কাজ ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত এআইয়ের অবৈধ ব্যবহার নিয়ে প্রতিবাদ করা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। প্রথমটি বোকামি, আর দ্বিতীয়টি সত্যিকারের আইনি ও নৈতিক উদ্বেগের বিষয়। প্রযুক্তিবিরোধী অবস্থান নিয়ে সব এআইকে খারাপ বলা এবং এর তৈরি সব কাজকে মানুষের কাছ থেকে চুরি করা বলে দাবি করার কোনো অর্থ নেই।”

ডিজিটাল শিল্পীদের জন্যও উদ্বেগের কারণ এআই

অরুণ কুমারের মতে, মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে অন্য মানুষের কাজ থেকে শেখা, অনুকরণ করা এবং নতুন কিছু তৈরি করার ভূমিকা রয়েছে। যেমন শিল্পশিক্ষার্থীরা বড় শিল্পীদের কাজ দেখে ও অনুকরণ করে নিজেদের দক্ষতা বাড়ান। তার মতে, মানুষের তৈরি সব শিল্পকর্মই আগের কোনো না কোনো কাজের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

বিষয়টি বোঝাতে তিনি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ এবং ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’-এর উদাহরণ দেন।

তিনি বলেন, “মানুষের সব শিল্পকর্মই আগের কাজের ভিত্তির ওপর তৈরি। আইনগতভাবে কোনো হুবহু অনুলিপি তখনই জালিয়াতি হবে, যখন শিল্পী সেটিকে মূল শিল্পীর কাজ বলে দাবি করবেন। আমি যদি মোনালিসা বা দ্য স্টারি নাইট আঁকি এবং বলি, এটি আমার তৈরি একটি পুনরুৎপাদন, তাহলে সেটি পুনরুৎপাদনই হবে। মূল শিল্পকর্মের মূল্য সেই আসল ছবিতেই থাকবে, যা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।”

তবে, এআইয়ের বিস্তারে শুধু অভিনেতারাই নন, ডিজিটাল শিল্পীরাও নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি। তার মতে, একজন শিল্পী অনেক সময় ও শ্রম দিয়ে যে কাজ তৈরি করেন, বাণিজ্যিকভাবে তার মূল্য এখন আগের মতো থাকছে না।

অরুণ বলেন, “গণমাধ্যম, ব্যবসা, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, স্থাপত্য কিংবা ফ্যাশন খাতে কাজ করা অনেক গ্রাফিক শিল্পীর কাজকে এআইয়ের তৈরি নিম্নমানের কাজের সঙ্গে তুলনা করা হতে পারে। বাস্তবতা হলো, এআই বিপ্লব অনেক শিল্পীকে কাজ হারানোর ঝুঁকিতে ফেলছে। কারণ, এআই অনেক দ্রুত একই ধরনের কাজ করতে পারে। তবে, যেসব প্রকৃত শিল্পী নিজেদের কাজের প্রক্রিয়ায় এআইকে আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন, তারাই টিকে থাকবেন এবং এগিয়ে যাবেন।”

এআই নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আশাবাদী অরুণ

২০২৬ সালকে এখন পর্যন্ত নিজের কাছে একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর, কৌতূহলজাগানিয়া ও কিছুটা উদ্বেগের বলে মনে করছেন অরুণ কুমার। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখনো আশাবাদী।

তিনি বলেন, “এআই নিয়ে আমাদের কিছু করার নেই; এটি ইতোমধ্যে চলে এসেছে। প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেছে। যারা উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে থাকবে, সময়ের স্রোতে তাদের ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের সবাইকে এই প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

জাহ্নবী-সুনয়না-কীর্তির আপত্তিকর ছবি, কঠোর আইনের দাবি

প্রকাশিত সময় : ১০:৪৩:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিনোদনজগতে। জাহ্নবী কাপুর, সুনয়না ও কীর্তি সুরেশের মতো অভিনেত্রীরাও তাদের ছবি ও ভিডিও বিকৃত করে আপত্তিকর ডিপফেক কনটেন্ট তৈরির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে স্পষ্ট ও বড় করে সতর্কবার্তা দেওয়ার বিষয়টি আইন করে বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন ভিএফএক্স বিশেষজ্ঞ সিবি অরুণ কুমার।

হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পার্ল একাডেমির কমিউনিকেশন, ফিল্ম অ্যান্ড গেমিং বিভাগের ডিন অরুণ কুমার এআই ব্যবহারের নৈতিক দিক, শিল্পীদের স্বত্ব এবং প্রযুক্তিটির অপব্যবহার নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, এআইয়ের সব ধরনের ব্যবহারকে একসঙ্গে দোষারোপ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর অপব্যবহার রোধে কার্যকর আইনও জরুরি।

আপত্তিকর কনটেন্ট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

অরুণ কুমার জানান, এআই কিংবা উন্নত ডিপফেক প্রযুক্তির প্রচলনের আগেও ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করা হতো। কখনো বডি ডাবল, কখনো ফটোশপ, আবার কখনো ভিএফএক্সের ক্লোনিং ও মরফিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব কাজ করা হতো। এখন দ্রুত অর্থ উপার্জনের জন্য সেই তালিকায় নতুন হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত হয়েছে এআই।

তিনি বলেন, “এ ধরনের আপত্তিকর কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার জন্য আগে থেকেই অনেক আইনি উপায় রয়েছে।”

তবে, তার মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এআইয়ের কারণে দর্শকদের পক্ষে আসল ও নকল কনটেন্টের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “ইনস্টাগ্রামের মতো বৈধ প্ল্যাটফর্মেও এআই কনটেন্টের সতর্কবার্তা খুব ছোট করে, আড়ালে দেওয়া থাকে। ফলে দর্শকের চোখে তা সহজে পড়ে না।”

অরুণ কুমারের ভাষায়, “আমাদের আরো কঠোর আইন প্রয়োজন, যেখানে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে স্পষ্ট ও বড় করে সতর্কবার্তা দেওয়া বাধ্যতামূলক থাকবে। তাহলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া কিছু দুর্যোগের ভিডিওর মতো এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট আর নিজেদের সংবাদ বলে চালিয়ে দিতে পারবে না। আসল সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন দর্শক বুঝতে পারেন না কোনটি সত্য আর কোনটি নকল।”

তবে, এআই প্রযুক্তির সামগ্রিক সমালোচনাকে বোকামি বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, এআইয়ের সাধারণ ব্যবহার এবং কোনো শিল্পীর অনুমতি ছাড়া তার কাজ দিয়ে এআই প্রশিক্ষণ দিয়ে অবৈধভাবে কনটেন্ট তৈরির বিষয় দুটি আলাদা করে দেখতে হবে।

তিনি বলেন, “এআইয়ের ঢালাও সমালোচনা করা এবং কোনো শিল্পীর অনুমতি ছাড়া তার কাজ ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত এআইয়ের অবৈধ ব্যবহার নিয়ে প্রতিবাদ করা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। প্রথমটি বোকামি, আর দ্বিতীয়টি সত্যিকারের আইনি ও নৈতিক উদ্বেগের বিষয়। প্রযুক্তিবিরোধী অবস্থান নিয়ে সব এআইকে খারাপ বলা এবং এর তৈরি সব কাজকে মানুষের কাছ থেকে চুরি করা বলে দাবি করার কোনো অর্থ নেই।”

ডিজিটাল শিল্পীদের জন্যও উদ্বেগের কারণ এআই

অরুণ কুমারের মতে, মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে অন্য মানুষের কাজ থেকে শেখা, অনুকরণ করা এবং নতুন কিছু তৈরি করার ভূমিকা রয়েছে। যেমন শিল্পশিক্ষার্থীরা বড় শিল্পীদের কাজ দেখে ও অনুকরণ করে নিজেদের দক্ষতা বাড়ান। তার মতে, মানুষের তৈরি সব শিল্পকর্মই আগের কোনো না কোনো কাজের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

বিষয়টি বোঝাতে তিনি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ এবং ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’-এর উদাহরণ দেন।

তিনি বলেন, “মানুষের সব শিল্পকর্মই আগের কাজের ভিত্তির ওপর তৈরি। আইনগতভাবে কোনো হুবহু অনুলিপি তখনই জালিয়াতি হবে, যখন শিল্পী সেটিকে মূল শিল্পীর কাজ বলে দাবি করবেন। আমি যদি মোনালিসা বা দ্য স্টারি নাইট আঁকি এবং বলি, এটি আমার তৈরি একটি পুনরুৎপাদন, তাহলে সেটি পুনরুৎপাদনই হবে। মূল শিল্পকর্মের মূল্য সেই আসল ছবিতেই থাকবে, যা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।”

তবে, এআইয়ের বিস্তারে শুধু অভিনেতারাই নন, ডিজিটাল শিল্পীরাও নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি। তার মতে, একজন শিল্পী অনেক সময় ও শ্রম দিয়ে যে কাজ তৈরি করেন, বাণিজ্যিকভাবে তার মূল্য এখন আগের মতো থাকছে না।

অরুণ বলেন, “গণমাধ্যম, ব্যবসা, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, স্থাপত্য কিংবা ফ্যাশন খাতে কাজ করা অনেক গ্রাফিক শিল্পীর কাজকে এআইয়ের তৈরি নিম্নমানের কাজের সঙ্গে তুলনা করা হতে পারে। বাস্তবতা হলো, এআই বিপ্লব অনেক শিল্পীকে কাজ হারানোর ঝুঁকিতে ফেলছে। কারণ, এআই অনেক দ্রুত একই ধরনের কাজ করতে পারে। তবে, যেসব প্রকৃত শিল্পী নিজেদের কাজের প্রক্রিয়ায় এআইকে আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন, তারাই টিকে থাকবেন এবং এগিয়ে যাবেন।”

এআই নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও আশাবাদী অরুণ

২০২৬ সালকে এখন পর্যন্ত নিজের কাছে একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর, কৌতূহলজাগানিয়া ও কিছুটা উদ্বেগের বলে মনে করছেন অরুণ কুমার। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখনো আশাবাদী।

তিনি বলেন, “এআই নিয়ে আমাদের কিছু করার নেই; এটি ইতোমধ্যে চলে এসেছে। প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেছে। যারা উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে থাকবে, সময়ের স্রোতে তাদের ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের সবাইকে এই প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।”