শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অভিশংসিত হয়ে গৃহবন্দি প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়া

প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়াকে অভিশংসনের মাধ্যমে পদ থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়েছে। দেশটির অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল ব্যাংক ‘উয়েনো’ ধসে যাওয়ার জেরে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পর শুক্রবার (৬ নভেম্বর) এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। খবর বিবিসি

শুক্রবার তার নিজের দলসহ আইনপ্রণেতারা তাকে পদ থেকে অপসারণের পক্ষে সর্বসম্মতভাবে ভোট দেওয়ার কয়েক মিনিট পরেই পেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে দেশটির ডিজিটাল ব্যাংক ‘উয়েনো’ দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের দেশ প্যারাগুয়েতে এই ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ লাখ। ব্যাংকটি ধসে পড়ায় দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী তাদের আমানত ও সঞ্চয় ব্যবহারের সুযোগ হারিয়ে তীব্র সংকটে পড়েন।

গত বছর পর্যন্ত এই ব্যাংকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সান্তিয়াগো পেনিয়ার হাতে ছিল। ফলে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকটিকে সুবিধা দেওয়া এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

তীব্র জনরোষ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে গত ৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সান্তিয়াগো পেনিয়া একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে দেশটির আইনপ্রণেতারা তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি।

পেনিয়ার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগে অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) প্রস্তাব আনা হয়। এর ফলে প্যারাগুয়ের সংবিধান অনুযায়ী সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজীবনের জন্য সিনেট সদস্য থাকার সুযোগ এবং আইনি দায়মুক্তি হারিয়েছেন তিনি।

অভিশংসনের অভিযোগে বলা হয়েছে, পেনিয়া স্বার্থের সংঘাত তৈরি করেছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি প্রক্রিয়ায় কারসাজি করেছেন, পেনশন তহবিলের অর্থ অন্য খাতে সরিয়েছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ঘিরে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সিলভিয়া মার্গারিটা গনজালেস ভেস্টার জানিয়েছেন, বিশ্বাসভঙ্গ, প্রভাব খাটানো এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পেনিয়াকে শনিবার জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে।

শুক্রবার সিনেটের বিশেষ অধিবেশনে উপস্থিত ৪৪ জন সিনেটরের সবাই পেনিয়াকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন। ১৯৮৯ সালে স্বৈরশাসনের অবসানের পর প্যারাগুয়ের ইতিহাসে অভিশংসিত হওয়া দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট তিনি।

অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেশটির রাজধানী আসুনসিওনে পেনিয়ার নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি নিজের বাড়িতেই কড়া পুলিশি পাহাড়ায় গৃহবন্দি রয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সিলভিয়া মার্গারিটা গনজালেস ভেস্টার জানিয়েছেন, পেনিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রভাব খাটানো, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার এবং অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত চলছে। চূড়ান্ত অভিযোগ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তিনি গৃহবন্দি থাকবেন।

সান্তিয়াগো পেনিয়া কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার আইনজীবী রিকার্ডো প্রেদা এই অভিযোগগুলোকে ‘অদায়িত্বশীল ও সুবিধাবাদী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে পেনিয়া তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছেন বলে জানা গেছে।

পেনিয়ার অভিশংসনের খবর আসার পরপরই দেশটির কংগ্রেস ভবনের বাইরের চত্বরে হাজার হাজার সাধারণ আমানতকারী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ও শিক্ষার্থীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। তারা প্যারাগুয়ের পতাকা উড়িয়ে এবং স্লোগান দিয়ে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।

পেনিয়ার অপসারণের পর প্যারাগুয়ের সংবিধান অনুযায়ী দেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট পেড্রো আলিয়ানা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

অভিশংসিত হয়ে গৃহবন্দি প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়া

প্রকাশিত সময় : ১১:০৭:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়াকে অভিশংসনের মাধ্যমে পদ থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়েছে। দেশটির অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল ব্যাংক ‘উয়েনো’ ধসে যাওয়ার জেরে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পর শুক্রবার (৬ নভেম্বর) এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। খবর বিবিসি

শুক্রবার তার নিজের দলসহ আইনপ্রণেতারা তাকে পদ থেকে অপসারণের পক্ষে সর্বসম্মতভাবে ভোট দেওয়ার কয়েক মিনিট পরেই পেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে দেশটির ডিজিটাল ব্যাংক ‘উয়েনো’ দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের দেশ প্যারাগুয়েতে এই ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ লাখ। ব্যাংকটি ধসে পড়ায় দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী তাদের আমানত ও সঞ্চয় ব্যবহারের সুযোগ হারিয়ে তীব্র সংকটে পড়েন।

গত বছর পর্যন্ত এই ব্যাংকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সান্তিয়াগো পেনিয়ার হাতে ছিল। ফলে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকটিকে সুবিধা দেওয়া এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

তীব্র জনরোষ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে গত ৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সান্তিয়াগো পেনিয়া একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে দেশটির আইনপ্রণেতারা তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি।

পেনিয়ার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগে অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) প্রস্তাব আনা হয়। এর ফলে প্যারাগুয়ের সংবিধান অনুযায়ী সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজীবনের জন্য সিনেট সদস্য থাকার সুযোগ এবং আইনি দায়মুক্তি হারিয়েছেন তিনি।

অভিশংসনের অভিযোগে বলা হয়েছে, পেনিয়া স্বার্থের সংঘাত তৈরি করেছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি প্রক্রিয়ায় কারসাজি করেছেন, পেনশন তহবিলের অর্থ অন্য খাতে সরিয়েছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ঘিরে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সিলভিয়া মার্গারিটা গনজালেস ভেস্টার জানিয়েছেন, বিশ্বাসভঙ্গ, প্রভাব খাটানো এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পেনিয়াকে শনিবার জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে।

শুক্রবার সিনেটের বিশেষ অধিবেশনে উপস্থিত ৪৪ জন সিনেটরের সবাই পেনিয়াকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন। ১৯৮৯ সালে স্বৈরশাসনের অবসানের পর প্যারাগুয়ের ইতিহাসে অভিশংসিত হওয়া দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট তিনি।

অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেশটির রাজধানী আসুনসিওনে পেনিয়ার নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি নিজের বাড়িতেই কড়া পুলিশি পাহাড়ায় গৃহবন্দি রয়েছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সিলভিয়া মার্গারিটা গনজালেস ভেস্টার জানিয়েছেন, পেনিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রভাব খাটানো, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার এবং অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত চলছে। চূড়ান্ত অভিযোগ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তিনি গৃহবন্দি থাকবেন।

সান্তিয়াগো পেনিয়া কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার আইনজীবী রিকার্ডো প্রেদা এই অভিযোগগুলোকে ‘অদায়িত্বশীল ও সুবিধাবাদী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে পেনিয়া তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছেন বলে জানা গেছে।

পেনিয়ার অভিশংসনের খবর আসার পরপরই দেশটির কংগ্রেস ভবনের বাইরের চত্বরে হাজার হাজার সাধারণ আমানতকারী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ও শিক্ষার্থীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। তারা প্যারাগুয়ের পতাকা উড়িয়ে এবং স্লোগান দিয়ে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।

পেনিয়ার অপসারণের পর প্যারাগুয়ের সংবিধান অনুযায়ী দেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট পেড্রো আলিয়ানা।