যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফের হামলা চালালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) জোরালো আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। যুদ্ধের সতর্কবার্তায় আমিরাতকে বারবার নিশানা করছে দেশটি।
ফলে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের এক প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য আলি খেজরিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, “আমিরাতের সঙ্গে আমাদের প্রতিবেশী তকমা আপাতত তুলে নেওয়া হয়েছে। দেশটিকে এখন শত্রুঘাঁটির তকমা দেওয়া হয়েছে।”
গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পরও চলতি মাসে হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গুলিবর্ষণ হওয়ার পর ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার থেকে আমিরাতকে সরাসরি সম্বোধন করে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর জেনারেলদের নেতৃত্বাধীন এই কমান্ড আমিরাতি নেতাদের উদ্দেশে বলেছে, তারা যেন নিজেদের দেশকে “আমেরিকান ও জায়নবাদীদের আস্তানা” না বানায়। তাদের মতে, এর মাধ্যমে আমিরাত মূলত মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
বিরোধের মূলে কী?
ইরানের আইআরজিসি বলছে, আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক, রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক এ অঞ্চলের অনিরাপত্তা তৈরি করছে। একারণে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ ও বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আরও কোনও হামলা হলে আরব আমিরাতে ‘ধ্বংসাত্মক এবং অনুশোচনা জাগানিয়া জবাব’ দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
রেভল্যুশনারি গার্ড এও ঘোষণা করেছে যে, আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরাহ বন্দর হরমুজ প্রণালির এমন এক এলাকায় অবস্থিত, যার ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আছে। ফলে এই বন্দরে যাতায়াত করা যে কোনো জাহাজ ইরানের আওতাভুক্ত। চলতি মাসের শুরুতে বন্দরটিতে হামলার ঘটনা ঘটলেও ইরান এর দায় অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে, আমিরাত বারবার ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং সামরিক উপায়ে এর জবাব দেওয়ার অধিকার রাখে বলে জানিয়েছে। তারা দেশটিতে বসবাস করা ইরানিদের ভিসা বাতিল করেছে এবং ইরানের ব্যবসা, বাণিজ্য পথ ও মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করেছে। সম্পর্কে ঘনিয়ে আসা এই অন্ধকারের কারণে ইরান গুরুতর অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।
কারণ, চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ইরান মূলত আরব আমিরাতের বন্দর ব্যবহার করত। মার্কিন নৌ অবরোধ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার জেরে ইরান এখন আমিরাতের বদলে পাকিস্তান, ইরাক ও তুরস্কের মতো দেশের সঙ্গে স্থলপথে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বারবার আমিরাত কেন নিশানায়?
ইরানের যুদ্ধের হুমকির বার্তায় আমিরাতকে বারবার নিশানা করার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
মার্কিন সেনা উপস্থিতি: আবুধাবির উপকণ্ঠে আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা, অত্যাধুনিক রাডার এবং গোয়েন্দা ব্যবস্থা রয়েছে। আইআরজিসি যুদ্ধের সময় এগুলোকে নিশানা করার কথা জানিয়েছে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ও ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা: ২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আমিরাত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ সই করার পর দুই দেশের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এমনকি ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এলবিট সিস্টেমস’ আমিরাতে শাখা খুলেছে।
আয়রন ডোম মোতায়েন: আরব বিশ্বের আর কোনও দেশে না দিলেও, চলমান ইরান যুদ্ধের সময় ইসরায়েল তাদের ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এটি পরিচালনার জন্য সেনাসদস্য আমিরাতে পাঠিয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই উন্নত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন আব্রাহাম চুক্তির ভিত্তিতে দুই দেশের ‘অসাধারণ সম্পর্কের’ নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আমিরাত বলে আসছে তাদের বৈদেশিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের বিষয়টি একান্তই তাদের সার্বভৌম বিষয়। তবে দেশটিতে হামলা চালানোর বিষয়ে তেহরানের যুক্তি হল, আরব এই দেশগুলো তাদের ভূখণ্ড এবং আকাশসীমা ইরানে হামলার জন্য ব্যবহার হতে দিচ্ছে।
এছাড়াও, কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে ইরান এবং আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। গ্রেটার টুনব, লেসার টুনব এবং আবু মুসা নামের তিনটি দ্বীপ নিয়ে ১৯৭১ সাল থেকে ইরানের সঙ্গে আমিরাতের বিরোধ চলছে, যা দুইদেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
আমিরাত সরাসরি ইরানে হামলা চালিয়েছে?
ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আমিরাত-ইরান সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর খবর গণমাধ্যমে এসেছে। ইসরায়েলের গণমাধ্যম দাবি করে, আমিরাতের যুদ্ধবিমান ইরানের কেশম দ্বীপের একটি পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে।
যদিও আমিরাত একে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, ইরান দাবি করে, তারা একটি ‘উইং লুং’ ড্রোন ভূপাতিত করেছে, যা আমিরাত সাধারণত হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে।
গত ৮ এপ্রিল ইরানের লাভান ও সিরি দ্বীপের তেল শোধনাগারে রহস্যময় বিস্ফোরণ ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এতে জড়িত নয় বলে দাবি করার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো আমিরাতের ‘মিরেজ ২০০০-৯’ যুদ্ধবিমানের দিকে আঙুল তোলে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট চ্যানেলগুলোতে এমন কিছু ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে যেখানে দেখা যায়, আমিরাতি যুদ্ধবিমানগুলো তাদের পরিচয় মুছে আকাশসীমা ব্যবহার করছে
গত মাসের শেষ দিকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে বহনকারী উড়োজাহাজকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমিরাতের ‘এফ-১৬ই’ যুদ্ধবিমান। সেটির গায়ে দেশের নাম ও নাম্বার মুছে দেওয়া ছিল।
ইরানে হামলায় অংশ নেওয়ায় ঝুঁকি এড়াতে আমিরাত এই কৌশল নিয়েছিল বলেই ধারণা ইরানি বিশ্লেষকদের।
ইরান এসব ঘটনার জেরে মূলত আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর বাইরেও ইরান হামলা চালায় বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে। তবে ইসরায়েলের বাইরে আমিরাতের ওপরই সবচেয়ে বড় হামলা চালিয়েছে ইরান। যদিও ইরানের ভূখণ্ডে হামলার বিষয়ে আমিরাত সরকারিভাবে কোনও মন্তব্য করেনি। সূত্র{বিডিনিউজ

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 






















