মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘রহস্যময়’ সামুদ্রিক যানটি এখন নৌবাহিনীর হেফাজতে

বরগুনার পাথরঘাটা উপকূলে জেলের জালে ধরা পড়া লাল-হলুদ রঙের অদ্ভুত যান্ত্রিক বস্তুটি নিয়ে গত দুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। অবশেষে আজ মঙ্গলবার বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা নিশ্চিত করেছেন, আট ফুট দীর্ঘ এই যানটি কোস্টগার্ডের মাধ্যমে নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন এর ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।

কী এই রহস্যময় যান?
সমুদ্রবিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, এটি কোনো সাধারণ বস্তু নয়, বরং পানির নিচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলকারী একটি অত্যাধুনিক গবেষণা যান— যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় AUV (Autonomous Underwater Vehicle)। টর্পেডোর মতো দেখতে সিলিন্ডার আকৃতির এই যানের ভেতরে রয়েছে উন্নত ইলেকট্রনিক মডিউল, সেন্সর, ব্যাটারি এবং অ্যান্টেনাসদৃশ যোগাযোগ যন্ত্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সমুদ্রের নিচে মানচিত্র তৈরি, জলবায়ুর তথ্য সংগ্রহ বা সামরিক নজরদারির জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আবদুল আজিজ এবং সমুদ্রপ্রাণী গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন—আমাদের দেশের সমুদ্রসীমায় সাধারণত এই ধরনের যান ব্যবহার করা হয় না।

ধারণা করা হচ্ছে, এটি অন্য কোনো দেশের গবেষণা যান। মাঝসমুদ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি বা চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এটি স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে বাংলাদেশের জলসীমায় চলে এসেছে।

উদ্ধার হওয়া যানটির গায়ে থাকা সিরিয়াল নম্বর, প্রস্তুতকারকের নাম এবং এর মেমোরি চিপে সংরক্ষিত ডেটা বিশ্লেষণ করলেই জানা যাবে— এটি আসলে কোন দেশের, কতদিন ধরে সাগরে ছিল এবং ঠিক কী উদ্দেশ্যে এটি বঙ্গোপসাগরে ঘুরছিল!

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, এটি একটি অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল বা এইউভি বলে মনে হচ্ছে। আমাদের সমুদ্রসীমায় এমন যান ব্যবহারের তথ্য জানা নেই। মনে হচ্ছে এটি সচল অবস্থায় ছিল না। সম্ভবত যান্ত্রিক ত্রুটি বা শক্তি হারানোর কারণে স্রোতের টানে উপকূলের এসেছে।

তার মতে, এ ধরনের যান সাধারণত দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসে অথবা সংগৃহীত তথ্য প্রেরণ করে।

আবদুল আজিজ আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, আবহাওয়া সংস্থা, নৌবাহিনী ও অফশোর তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো নিয়মিত এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। আর যদি এটা অন্য কোনো দেশের হয়ে থাকে, তাহলে অচল হওয়ার পর যানটি ভাসতে ভাসতে আমাদের জলসীমায় চলে আসতে পারে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সমুদ্রপ্রাণী গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, এ ধরনের যান যদি আমাদের সমুদ্র গবেষণায় ব্যবহৃত না হয়ে থাকে, তাহলে এটি কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে আমাদের সমুদ্রসীমায় এসেছে, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বাংলাদেশের উপকূলে প্রকাশ্যে এমন প্রযুক্তিগত যন্ত্র উদ্ধারের ঘটনা বিরল। একই সঙ্গে ঘটনাটি বঙ্গোপসাগরে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সমুদ্র গবেষণা, জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর প্রকৃত পরিচয় জানা গেলে সমুদ্র গবেষণা ও সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, এর গায়ে থাকা সিরিয়াল নম্বর, প্রস্তুতকারকের নাম, মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্য, সেন্সরের বিন্যাস এবং যোগাযোগব্যবস্থার প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ তথ্য সংরক্ষিত থাকলে এটি কোথা থেকে এসেছে, কত দিন সমুদ্রে ছিল এবং কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছিল, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

প্রশাসনে বড় রদবদল, প্রজ্ঞাপন জারি

‘রহস্যময়’ সামুদ্রিক যানটি এখন নৌবাহিনীর হেফাজতে

প্রকাশিত সময় : ০৪:২১:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
বরগুনার পাথরঘাটা উপকূলে জেলের জালে ধরা পড়া লাল-হলুদ রঙের অদ্ভুত যান্ত্রিক বস্তুটি নিয়ে গত দুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। অবশেষে আজ মঙ্গলবার বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা নিশ্চিত করেছেন, আট ফুট দীর্ঘ এই যানটি কোস্টগার্ডের মাধ্যমে নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন এর ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।

কী এই রহস্যময় যান?
সমুদ্রবিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, এটি কোনো সাধারণ বস্তু নয়, বরং পানির নিচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলকারী একটি অত্যাধুনিক গবেষণা যান— যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় AUV (Autonomous Underwater Vehicle)। টর্পেডোর মতো দেখতে সিলিন্ডার আকৃতির এই যানের ভেতরে রয়েছে উন্নত ইলেকট্রনিক মডিউল, সেন্সর, ব্যাটারি এবং অ্যান্টেনাসদৃশ যোগাযোগ যন্ত্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সমুদ্রের নিচে মানচিত্র তৈরি, জলবায়ুর তথ্য সংগ্রহ বা সামরিক নজরদারির জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আবদুল আজিজ এবং সমুদ্রপ্রাণী গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন—আমাদের দেশের সমুদ্রসীমায় সাধারণত এই ধরনের যান ব্যবহার করা হয় না।

ধারণা করা হচ্ছে, এটি অন্য কোনো দেশের গবেষণা যান। মাঝসমুদ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি বা চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এটি স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে বাংলাদেশের জলসীমায় চলে এসেছে।

উদ্ধার হওয়া যানটির গায়ে থাকা সিরিয়াল নম্বর, প্রস্তুতকারকের নাম এবং এর মেমোরি চিপে সংরক্ষিত ডেটা বিশ্লেষণ করলেই জানা যাবে— এটি আসলে কোন দেশের, কতদিন ধরে সাগরে ছিল এবং ঠিক কী উদ্দেশ্যে এটি বঙ্গোপসাগরে ঘুরছিল!

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, এটি একটি অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল বা এইউভি বলে মনে হচ্ছে। আমাদের সমুদ্রসীমায় এমন যান ব্যবহারের তথ্য জানা নেই। মনে হচ্ছে এটি সচল অবস্থায় ছিল না। সম্ভবত যান্ত্রিক ত্রুটি বা শক্তি হারানোর কারণে স্রোতের টানে উপকূলের এসেছে।

তার মতে, এ ধরনের যান সাধারণত দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসে অথবা সংগৃহীত তথ্য প্রেরণ করে।

আবদুল আজিজ আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, আবহাওয়া সংস্থা, নৌবাহিনী ও অফশোর তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো নিয়মিত এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। আর যদি এটা অন্য কোনো দেশের হয়ে থাকে, তাহলে অচল হওয়ার পর যানটি ভাসতে ভাসতে আমাদের জলসীমায় চলে আসতে পারে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সমুদ্রপ্রাণী গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, এ ধরনের যান যদি আমাদের সমুদ্র গবেষণায় ব্যবহৃত না হয়ে থাকে, তাহলে এটি কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে আমাদের সমুদ্রসীমায় এসেছে, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বাংলাদেশের উপকূলে প্রকাশ্যে এমন প্রযুক্তিগত যন্ত্র উদ্ধারের ঘটনা বিরল। একই সঙ্গে ঘটনাটি বঙ্গোপসাগরে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সমুদ্র গবেষণা, জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর প্রকৃত পরিচয় জানা গেলে সমুদ্র গবেষণা ও সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, এর গায়ে থাকা সিরিয়াল নম্বর, প্রস্তুতকারকের নাম, মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্য, সেন্সরের বিন্যাস এবং যোগাযোগব্যবস্থার প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অভ্যন্তরীণ তথ্য সংরক্ষিত থাকলে এটি কোথা থেকে এসেছে, কত দিন সমুদ্রে ছিল এবং কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছিল, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।