বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জামায়াত আমিরের

ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার হস্তান্তর, অবৈধ নিয়োগ ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে সংসদে বক্তব্য রেখেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, শেয়ারহোল্ডার যেভাবে শেয়ারহোল্ডার হয়েছে, তা পরে দেখা যাবে কেন? এটা আগেই প্রকাশ পেয়েছে। সারা দুনিয়া জানে। উনি একজন বিজ্ঞ মানুষ তা না জানেন, আমি তা বিশ্বাস করি না।

মঙ্গলবার (৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) তৃতীয় দিনে ৬৮ বিধিতে দেওয়া নোটিশ উত্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন।

বিরোধীদলীয় নেতা দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে এককভাবে একজন ৮২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে নিজের নামে শেয়ার কিনে ৮২ শতাংশ মালিক বনে গেছেন, যার প্রকৃত মূল্য ১২ হাজার কোটি টাকা। আর সব ব্যাংক থেকে ডাকাতি করা টাকা দিয়ে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, একটি বিশেষ এজেন্সির মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের চাপ দিয়ে শেয়ার হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হয়েছে। অথচ এটিই একমাত্র ব্যাংক যা তারল্য সংকটে অন্য ব্যাংককে সাহায্য করত। সেই ব্যাংকটাকেই ডাকাতি করে দেউলিয়া করা হয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ১০ হাজার কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কোনো নিয়ম-নীতি না মেনে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি, কোনো পরীক্ষা নেওয়া হয়নি, কাগজে কেউ সই করে দিয়েছে-সেটাই নিয়োগপত্র, বলেন তিনি। ৫ আগস্টের পর তাদের পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও কেউ আসেননি বলে জানান তিনি।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করে থাকেন, তাহলে তিনি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন-কেউ প্রমাণ করলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাকে মেডেল দেবেন। তিনি বলেন, কোথাও ৭০০ কোটি টাকার লোন নিয়ে দলের নির্বাচনী তহবিল গঠন করা হয়েছে-এমন অভিযোগ করলে প্রমাণ করতে হবে।

তিনি ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি ব্যাংকের বোর্ডে ছিলেন। সেই সময় ব্যাংক একাই দেশের বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ৩২ শতাংশ অর্জন করত। সব সরকারি ব্যাংক মিলেও এর সমতুল্য ছিল না। তখন অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত আঙুল তুলে জামায়াতে ইসলামীকে অভিযুক্ত করেছিল। ‘তার বয়ানের ভিত্তিতেই ব্যাংকে অভ্যুত্থান ঘটানো হয়, দখল করা হয়, সাড়ে ১৫ বছর দুঃশাসন চালানো হয়। কিন্তু প্রমাণ কোথায়?’ প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, যাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক শেয়ার ডাকাতি করে নেওয়া হয়েছে, অনতিবিলম্বে স্বসম্মানে সেই মূল্যেই তাদের কাছে শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তারপর সরকার নিয়ম মেনে বোর্ড গঠন করুক। আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে। সন্তান মায়ের কোলেই নিরাপদ। ওরা তো সৎমা হয়ে এসেছিল, ডাকাতি করেছে।

বিরোধীদলীয় নেতা সতর্ক করে বলেন, ইসলামী ব্যাংক যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। এটি একটি পিরামিড। এই পিরামিড হেলে পড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে। তিনি হজ সফরের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বলেন, প্রবাসীরা উদ্বিগ্ন। রেমিট্যান্স ও পোশাক শিল্প-এই দুই খাতের ওপর দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে। ‘রেমিট্যান্স বিপদে পড়লে দেশ কোথায় দাঁড়াবে?’

তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক এক ডেপুটি গভর্নর যার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল এবং পরে তাকে বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয়, সেই লোককে আবার এনে বিধ্বস্ত ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ওই ডেপুটি গভর্নর এস আলমের অপকর্মের সহযোগী ছিলেন এবং পুরস্কার পেয়েছিলেন-তার স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠানে এক্সিম ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকার গিফট লোন দেওয়া হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা শেষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, পূর্ব ধারণা থেকে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে ব্যাংকটাকে বাঁচাতে হবে। এই ব্যাংক বাঁচলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। তিনি আরও বলেন, আমি এই ব্যাংকের একজন মালিক-মাত্র ১০ টাকার শেয়ার হলেও আমার দাবি আমি ছেড়ে দেব না। আমি রাজনৈতিকভাবে নয়, গ্রাহক ও মালিক হিসেবে এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করব।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জামায়াত আমিরের

প্রকাশিত সময় : ০৯:৫১:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার হস্তান্তর, অবৈধ নিয়োগ ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে সংসদে বক্তব্য রেখেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, শেয়ারহোল্ডার যেভাবে শেয়ারহোল্ডার হয়েছে, তা পরে দেখা যাবে কেন? এটা আগেই প্রকাশ পেয়েছে। সারা দুনিয়া জানে। উনি একজন বিজ্ঞ মানুষ তা না জানেন, আমি তা বিশ্বাস করি না।

মঙ্গলবার (৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) তৃতীয় দিনে ৬৮ বিধিতে দেওয়া নোটিশ উত্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন।

বিরোধীদলীয় নেতা দাবি করেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে এককভাবে একজন ৮২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে নিজের নামে শেয়ার কিনে ৮২ শতাংশ মালিক বনে গেছেন, যার প্রকৃত মূল্য ১২ হাজার কোটি টাকা। আর সব ব্যাংক থেকে ডাকাতি করা টাকা দিয়ে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, একটি বিশেষ এজেন্সির মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের চাপ দিয়ে শেয়ার হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হয়েছে। অথচ এটিই একমাত্র ব্যাংক যা তারল্য সংকটে অন্য ব্যাংককে সাহায্য করত। সেই ব্যাংকটাকেই ডাকাতি করে দেউলিয়া করা হয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ১০ হাজার কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কোনো নিয়ম-নীতি না মেনে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি, কোনো পরীক্ষা নেওয়া হয়নি, কাগজে কেউ সই করে দিয়েছে-সেটাই নিয়োগপত্র, বলেন তিনি। ৫ আগস্টের পর তাদের পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও কেউ আসেননি বলে জানান তিনি।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করে থাকেন, তাহলে তিনি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন-কেউ প্রমাণ করলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাকে মেডেল দেবেন। তিনি বলেন, কোথাও ৭০০ কোটি টাকার লোন নিয়ে দলের নির্বাচনী তহবিল গঠন করা হয়েছে-এমন অভিযোগ করলে প্রমাণ করতে হবে।

তিনি ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি ব্যাংকের বোর্ডে ছিলেন। সেই সময় ব্যাংক একাই দেশের বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ৩২ শতাংশ অর্জন করত। সব সরকারি ব্যাংক মিলেও এর সমতুল্য ছিল না। তখন অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত আঙুল তুলে জামায়াতে ইসলামীকে অভিযুক্ত করেছিল। ‘তার বয়ানের ভিত্তিতেই ব্যাংকে অভ্যুত্থান ঘটানো হয়, দখল করা হয়, সাড়ে ১৫ বছর দুঃশাসন চালানো হয়। কিন্তু প্রমাণ কোথায়?’ প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, যাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক শেয়ার ডাকাতি করে নেওয়া হয়েছে, অনতিবিলম্বে স্বসম্মানে সেই মূল্যেই তাদের কাছে শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তারপর সরকার নিয়ম মেনে বোর্ড গঠন করুক। আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে। সন্তান মায়ের কোলেই নিরাপদ। ওরা তো সৎমা হয়ে এসেছিল, ডাকাতি করেছে।

বিরোধীদলীয় নেতা সতর্ক করে বলেন, ইসলামী ব্যাংক যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। এটি একটি পিরামিড। এই পিরামিড হেলে পড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে। তিনি হজ সফরের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বলেন, প্রবাসীরা উদ্বিগ্ন। রেমিট্যান্স ও পোশাক শিল্প-এই দুই খাতের ওপর দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে। ‘রেমিট্যান্স বিপদে পড়লে দেশ কোথায় দাঁড়াবে?’

তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক এক ডেপুটি গভর্নর যার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল এবং পরে তাকে বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয়, সেই লোককে আবার এনে বিধ্বস্ত ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ওই ডেপুটি গভর্নর এস আলমের অপকর্মের সহযোগী ছিলেন এবং পুরস্কার পেয়েছিলেন-তার স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠানে এক্সিম ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকার গিফট লোন দেওয়া হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা শেষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, পূর্ব ধারণা থেকে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে ব্যাংকটাকে বাঁচাতে হবে। এই ব্যাংক বাঁচলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। তিনি আরও বলেন, আমি এই ব্যাংকের একজন মালিক-মাত্র ১০ টাকার শেয়ার হলেও আমার দাবি আমি ছেড়ে দেব না। আমি রাজনৈতিকভাবে নয়, গ্রাহক ও মালিক হিসেবে এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করব।