বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যেভাবে বেনজীরকে ধরিয়ে দেন এমপি বন্ধু

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমদকে দুবাই বিমানবন্দর থেকে নয়, বরং গত ১২ জুন তার বাসার নিকটবর্তী একটি শপিং মল থেকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তার পরিবার। দুবাইয়ে টানা সরকারি ছুটির কারণে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মঙ্গলবার (১৬ জুন) তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে। একই সঙ্গে তার জামিন আবেদনের শুনানিও হতে পারে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে তার পক্ষে স্থানীয় একজন আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই বেনজীর আহমদ পরিবারের সঙ্গে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। তাদের দাবি, ১২ জুন তিনি বাসায় অবস্থানকালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক সংসদ সদস্য, যিনি তার বন্ধু ও ব্যবসায়িক সহযোগী হিসেবে পরিচিত, ফোন করে কাছের একটি শপিং মলে দেখা করতে বলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর আগে থেকেই ওত পেতে থাকা দুবাই পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে ওই সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ লোকজনও উপস্থিত ছিলেন।

পরিবারের অভিযোগ, দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা জানতে পেরেছেন যে স্থানীয়ভাবে বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। তাদের দাবি, বাংলাদেশ পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে ইন্টারপোলের জারি করা রেড নোটিশের কারণেই তাকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে রেড নোটিশসংক্রান্ত নথি দুবাই পুলিশের কাছে পৌঁছে দেন। তবে এই অভিযোগের স্বতন্ত্র কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি।

বেনজীর আহমদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, আটকের পর দুবাই পুলিশ তার ভিসার বৈধতা, দেশটিতে অবস্থানের উদ্দেশ্য এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে যাচাই করে। পরে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক এবং তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল নোটিশ রয়েছে—এ তথ্য ঢাকার ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ও বাংলাদেশ পুলিশকে অবহিত করা হয়।

আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পারিবারিক সূত্র জানায়, দুবাইয়ে তার পক্ষে একজন আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে এবং ঢাকায় চলমান মামলাগুলোর নথিও আইনজীবীর পরামর্শে সেখানে পাঠানো হয়েছে। ১২ জুন আদালত সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও পরবর্তী কয়েকদিন সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির কারণে নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ফলে মঙ্গলবার থেকে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মঙ্গলবার দুবাই পুলিশ যদি তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করে, তাহলে তার আইনজীবী জামিনের আবেদন করবেন। অন্যদিকে আদালতে হাজির করা না হলে প্রসিকিউশন দপ্তরে তার পক্ষে প্রয়োজনীয় আবেদন জমা দেওয়া হবে। এ বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।

যে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বেনজীর আহমদকে শপিং মলে ডেকে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পরে স্বল্প সময়ের জন্য ফোনে সংযোগ স্থাপিত হলেও তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ পুলিশ সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে বেনজীর আহমদ দুবাই পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন এবং ইন্টারপোল নোটিশের সূত্রেই বিষয়টি বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। তবে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আটক প্রক্রিয়াটি শুধুই ইন্টারপোলের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণও ভূমিকা রেখেছে—সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠানো সম্ভব হবে কি না, সেটিও বিবেচ্য বিষয়।

এদিকে, তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পুলিশের সাবেক এক অতিরিক্ত আইজিপির মতে, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট দুই দেশের আইন, পারস্পরিক চুক্তি, মামলার প্রকৃতি এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, কেবল ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকলেই দ্রুত প্রত্যর্পণ সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ফেরত চাইলেও দুবাই কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার নথি ও অভিযোগের আইনগত ভিত্তি যাচাই করবে।

তিনি আরও বলেন, পরিচয় বা ভ্রমণ নথি নিয়ে কোনো জটিলতা থাকলে সেটিও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। ফলে আদালতে শুনানি শুরু হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা কম।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আমাদের জানানো হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।”

উল্লেখ্য, বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে দেশে একাধিক মামলা ও অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। তার গ্রেপ্তারের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এখন মূলত দুবাইয়ের আদালত, প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুবাইয়ে আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার পর তার আটক, জামিন এবং সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ বিষয়ে আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

অভিনেত্রীর আত্মহত্যা, মৃত্যুর আগে প্রেমিকের সঙ্গে স্ক্রীনশট ফাঁস

যেভাবে বেনজীরকে ধরিয়ে দেন এমপি বন্ধু

প্রকাশিত সময় : ১০:৪২:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমদকে দুবাই বিমানবন্দর থেকে নয়, বরং গত ১২ জুন তার বাসার নিকটবর্তী একটি শপিং মল থেকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তার পরিবার। দুবাইয়ে টানা সরকারি ছুটির কারণে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মঙ্গলবার (১৬ জুন) তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে। একই সঙ্গে তার জামিন আবেদনের শুনানিও হতে পারে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে তার পক্ষে স্থানীয় একজন আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে।

পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই বেনজীর আহমদ পরিবারের সঙ্গে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। তাদের দাবি, ১২ জুন তিনি বাসায় অবস্থানকালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক সংসদ সদস্য, যিনি তার বন্ধু ও ব্যবসায়িক সহযোগী হিসেবে পরিচিত, ফোন করে কাছের একটি শপিং মলে দেখা করতে বলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর আগে থেকেই ওত পেতে থাকা দুবাই পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে ওই সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ লোকজনও উপস্থিত ছিলেন।

পরিবারের অভিযোগ, দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা জানতে পেরেছেন যে স্থানীয়ভাবে বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। তাদের দাবি, বাংলাদেশ পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে ইন্টারপোলের জারি করা রেড নোটিশের কারণেই তাকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে রেড নোটিশসংক্রান্ত নথি দুবাই পুলিশের কাছে পৌঁছে দেন। তবে এই অভিযোগের স্বতন্ত্র কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি।

বেনজীর আহমদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, আটকের পর দুবাই পুলিশ তার ভিসার বৈধতা, দেশটিতে অবস্থানের উদ্দেশ্য এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে যাচাই করে। পরে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক এবং তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল নোটিশ রয়েছে—এ তথ্য ঢাকার ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ও বাংলাদেশ পুলিশকে অবহিত করা হয়।

আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পারিবারিক সূত্র জানায়, দুবাইয়ে তার পক্ষে একজন আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে এবং ঢাকায় চলমান মামলাগুলোর নথিও আইনজীবীর পরামর্শে সেখানে পাঠানো হয়েছে। ১২ জুন আদালত সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও পরবর্তী কয়েকদিন সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির কারণে নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ফলে মঙ্গলবার থেকে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মঙ্গলবার দুবাই পুলিশ যদি তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করে, তাহলে তার আইনজীবী জামিনের আবেদন করবেন। অন্যদিকে আদালতে হাজির করা না হলে প্রসিকিউশন দপ্তরে তার পক্ষে প্রয়োজনীয় আবেদন জমা দেওয়া হবে। এ বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।

যে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বেনজীর আহমদকে শপিং মলে ডেকে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পরে স্বল্প সময়ের জন্য ফোনে সংযোগ স্থাপিত হলেও তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ পুলিশ সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে বেনজীর আহমদ দুবাই পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন এবং ইন্টারপোল নোটিশের সূত্রেই বিষয়টি বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। তবে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আটক প্রক্রিয়াটি শুধুই ইন্টারপোলের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণও ভূমিকা রেখেছে—সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠানো সম্ভব হবে কি না, সেটিও বিবেচ্য বিষয়।

এদিকে, তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পুলিশের সাবেক এক অতিরিক্ত আইজিপির মতে, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট দুই দেশের আইন, পারস্পরিক চুক্তি, মামলার প্রকৃতি এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, কেবল ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকলেই দ্রুত প্রত্যর্পণ সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ফেরত চাইলেও দুবাই কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার নথি ও অভিযোগের আইনগত ভিত্তি যাচাই করবে।

তিনি আরও বলেন, পরিচয় বা ভ্রমণ নথি নিয়ে কোনো জটিলতা থাকলে সেটিও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। ফলে আদালতে শুনানি শুরু হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা কম।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আমাদের জানানো হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে।”

উল্লেখ্য, বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে দেশে একাধিক মামলা ও অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। তার গ্রেপ্তারের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এখন মূলত দুবাইয়ের আদালত, প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুবাইয়ে আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার পর তার আটক, জামিন এবং সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ বিষয়ে আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে।