মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেইমারদের বিদায়, আজ মেসিদের পরীক্ষা

বিশ্বকাপ মানেই লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে অন্য রকম উন্মাদনা। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই দুই দলের অগণিত সমর্থকের আবেগও তাই ওঠা-নামা করে দল দুটির সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে।

সেই আবেগের বড় একটি অংশের ইতি ঘটেছে। শেষ ষোলো থেকেই নিয়েছে ব্রাজিল। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ২-১ গোলে হেরেছে নরওয়ের কাছে। ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গের পর এখন লাতিন আমেরিকার আশা-ভরসার বড় অংশই আর্জেন্টিনার কাঁধে।

তবে তাদের সামনেও অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। আজ আটলান্টায় শেষ আটের টিকিটের লড়াইয়ে মিসরের মুখোমুখি হবে আলবিসেলেস্তেরা। ব্রাজিলের বিদায়টা কিছুটা বিস্ময়করই বটে। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের পর ধারণা করা হচ্ছিল, ভালো কিছুই উপহার দেবে সেলেসাওরা।

বিশেষ করে সেদিন দ্বিতীয়ার্ধে বেশ দাপুটে ও নান্দনিক ফুটবলই খেলেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়ররা। কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে সেই ছন্দের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। বল দখলের লড়াইয়েও পিছিয়ে ছিল ব্রাজিল। একই সঙ্গে সুযোগ নষ্টেরও খেসারত দিয়েছে কার্লো আনচেলোত্তির দল। ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি থেকে গোল করার সুযোগ হাতছাড়া করেন ব্রুনো গিমারেস।

তাঁর সেই পেনাল্টি মিস ফিরিয়ে এনেছে ৪০ বছর আগের স্মৃতি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ‘সাদা পেলে’ খ্যাত জিকো। সেই বিশ্বকাপের পর ছয় পেনাল্টির সব কটিতেই গোল পেয়েছিল ব্রাজিল। গিমারেসের ওই মিসের পর কিছু সুযোগ তৈরি হলেও ৭৮ মিনিট পর্যন্ত কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি।

পরের মিনিটে আর্লিং হালান্ডের দুর্দান্ত এক হেডে এগিয়ে যায় নরওয়ে। এরপর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় থাকা ব্রাজিলকে দ্বিতীয় ধাক্কাটিও দেন হালান্ড। ডি-বক্সের বাইরে থেকে আচমকা জোরালো এক নিচু শটে ব্রাজিলের গোলপোস্ট কাঁপিয়ে দেন এই তারকা। যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও ব্রাজিলের শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায়ঘণ্টা বাজল টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দলটির। নরওয়ের অবশ্য তাতে বয়ে গেছে! অবিশ্বাস্য এক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে উত্তর ইউরোপের দেশটি মনভরে উদযাপন করেছে ম্যাচ-পরবর্তী সময়টা। সেই উদযাপনের রেশ নিশ্চয়ই আগামী কয়েক দিনও থাকবে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটাই যে তাদের সেরা সাফল্য। ব্রাজিলের বিদায়ের পর সবার চোখ এখন আর্জেন্টিনার দিকে। অবশ্য রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ গোলের কষ্টার্জিত জয়ে বেশ কিছু দুর্বলতা ধরা পড়েছে লিওনেল স্কালোনির দলের খেলায়। বিশেষ করে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং রক্ষণভাগের সমন্বয়হীনতা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।

সে কারণেই মিসরের বিপক্ষে শুরুর একাদশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। স্কালোনি মাঝমাঠে আরো প্রাণ ফেরাতে কিছু রদবদল করতে পারেন। লিয়ান্দ্রো পারেদেস কিংবা জিওভান্নি লো সেলসোকে শুরু থেকেই খেলানোর সম্ভাবনা রয়েছে। আক্রমণভাগে হুলিয়ান আলভারেজকে আরো স্বাধীন ভূমিকা দেওয়া হতে পারে, যাতে মেসির ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। মিসরও অবশ্য সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার দল নয়।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১২০ মিনিট লড়াইয়ের পর টাইব্রেকারে জিতে শেষ ষোলো পার করেছে আফ্রিকার দলটি। মোহাম্মদ সালাহ ও ওমর মারমুশকে ঘিরে গতিময় আক্রমণ, সঙ্গে সুশৃঙ্খল রক্ষণ—সব মিলিয়ে তারা এরই মধ্যে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে।

আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা সের্হিয়ো আগুয়েরোর কণ্ঠেও তাই মেসিদের জন্য সতর্কবার্তা। আগুয়েরো মনে করেন, কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ক্লান্তি চোখে পড়েছে। আর মিসরের মতো শারীরিকভাবে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সেটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। লিওনেল মেসিও ম্যাচের আগে স্বীকার করেছেন, নক আউট পর্বের টানা লড়াইয়ে ক্লান্তি জমেছে। তবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের আত্মবিশ্বাস এখনো অটুট। শেষ কয়েকটি বড় টুর্নামেন্টে চাপের মধ্যে থেকে ম্যাচ বের করে আনার অভিজ্ঞতাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তবে ব্রাজিলের বিদায়ে কিছুটা হলেও চাপ থাকবে আর্জেন্টিনার ওপর। এখন সবার মনোযোগের কেন্দ্রেই যে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। আত্মবিশ্বাসী মিসরের বিপক্ষে এই পরীক্ষায় আলবিসেলেস্তেরা কিভাবে উতরে যায়, সেটাই এখন দেখার।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

নেইমারদের বিদায়, আজ মেসিদের পরীক্ষা

প্রকাশিত সময় : ০৯:০৭:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপ মানেই লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে অন্য রকম উন্মাদনা। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই দুই দলের অগণিত সমর্থকের আবেগও তাই ওঠা-নামা করে দল দুটির সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে।

সেই আবেগের বড় একটি অংশের ইতি ঘটেছে। শেষ ষোলো থেকেই নিয়েছে ব্রাজিল। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ২-১ গোলে হেরেছে নরওয়ের কাছে। ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গের পর এখন লাতিন আমেরিকার আশা-ভরসার বড় অংশই আর্জেন্টিনার কাঁধে।

তবে তাদের সামনেও অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। আজ আটলান্টায় শেষ আটের টিকিটের লড়াইয়ে মিসরের মুখোমুখি হবে আলবিসেলেস্তেরা। ব্রাজিলের বিদায়টা কিছুটা বিস্ময়করই বটে। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের পর ধারণা করা হচ্ছিল, ভালো কিছুই উপহার দেবে সেলেসাওরা।

বিশেষ করে সেদিন দ্বিতীয়ার্ধে বেশ দাপুটে ও নান্দনিক ফুটবলই খেলেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়ররা। কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে সেই ছন্দের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। বল দখলের লড়াইয়েও পিছিয়ে ছিল ব্রাজিল। একই সঙ্গে সুযোগ নষ্টেরও খেসারত দিয়েছে কার্লো আনচেলোত্তির দল। ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি থেকে গোল করার সুযোগ হাতছাড়া করেন ব্রুনো গিমারেস।

তাঁর সেই পেনাল্টি মিস ফিরিয়ে এনেছে ৪০ বছর আগের স্মৃতি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ‘সাদা পেলে’ খ্যাত জিকো। সেই বিশ্বকাপের পর ছয় পেনাল্টির সব কটিতেই গোল পেয়েছিল ব্রাজিল। গিমারেসের ওই মিসের পর কিছু সুযোগ তৈরি হলেও ৭৮ মিনিট পর্যন্ত কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি।

পরের মিনিটে আর্লিং হালান্ডের দুর্দান্ত এক হেডে এগিয়ে যায় নরওয়ে। এরপর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় থাকা ব্রাজিলকে দ্বিতীয় ধাক্কাটিও দেন হালান্ড। ডি-বক্সের বাইরে থেকে আচমকা জোরালো এক নিচু শটে ব্রাজিলের গোলপোস্ট কাঁপিয়ে দেন এই তারকা। যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও ব্রাজিলের শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায়ঘণ্টা বাজল টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দলটির। নরওয়ের অবশ্য তাতে বয়ে গেছে! অবিশ্বাস্য এক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে উত্তর ইউরোপের দেশটি মনভরে উদযাপন করেছে ম্যাচ-পরবর্তী সময়টা। সেই উদযাপনের রেশ নিশ্চয়ই আগামী কয়েক দিনও থাকবে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটাই যে তাদের সেরা সাফল্য। ব্রাজিলের বিদায়ের পর সবার চোখ এখন আর্জেন্টিনার দিকে। অবশ্য রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ গোলের কষ্টার্জিত জয়ে বেশ কিছু দুর্বলতা ধরা পড়েছে লিওনেল স্কালোনির দলের খেলায়। বিশেষ করে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং রক্ষণভাগের সমন্বয়হীনতা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।

সে কারণেই মিসরের বিপক্ষে শুরুর একাদশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। স্কালোনি মাঝমাঠে আরো প্রাণ ফেরাতে কিছু রদবদল করতে পারেন। লিয়ান্দ্রো পারেদেস কিংবা জিওভান্নি লো সেলসোকে শুরু থেকেই খেলানোর সম্ভাবনা রয়েছে। আক্রমণভাগে হুলিয়ান আলভারেজকে আরো স্বাধীন ভূমিকা দেওয়া হতে পারে, যাতে মেসির ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। মিসরও অবশ্য সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার দল নয়।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১২০ মিনিট লড়াইয়ের পর টাইব্রেকারে জিতে শেষ ষোলো পার করেছে আফ্রিকার দলটি। মোহাম্মদ সালাহ ও ওমর মারমুশকে ঘিরে গতিময় আক্রমণ, সঙ্গে সুশৃঙ্খল রক্ষণ—সব মিলিয়ে তারা এরই মধ্যে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে।

আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা সের্হিয়ো আগুয়েরোর কণ্ঠেও তাই মেসিদের জন্য সতর্কবার্তা। আগুয়েরো মনে করেন, কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ক্লান্তি চোখে পড়েছে। আর মিসরের মতো শারীরিকভাবে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সেটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। লিওনেল মেসিও ম্যাচের আগে স্বীকার করেছেন, নক আউট পর্বের টানা লড়াইয়ে ক্লান্তি জমেছে। তবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের আত্মবিশ্বাস এখনো অটুট। শেষ কয়েকটি বড় টুর্নামেন্টে চাপের মধ্যে থেকে ম্যাচ বের করে আনার অভিজ্ঞতাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তবে ব্রাজিলের বিদায়ে কিছুটা হলেও চাপ থাকবে আর্জেন্টিনার ওপর। এখন সবার মনোযোগের কেন্দ্রেই যে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। আত্মবিশ্বাসী মিসরের বিপক্ষে এই পরীক্ষায় আলবিসেলেস্তেরা কিভাবে উতরে যায়, সেটাই এখন দেখার।