সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন ছেলে হারিয়ে জায়েদই ছিল শেষ ভরসা, তাকেও কেড়ে নিল ইসরায়েল

ইসরায়েলি বিমান হামলায় ২০২৩ সালে তিন ছেলে হারানোর পর ফাতিমা নোফালের কোলজুড়ে আসে জায়েদ। কিন্তু ১৫ মাস পর মধ্য গাজায় আরেকটি ইসরায়েলি হামলায় সেও নিহত হয়।

খোলা জানালার পাশে একটি ছোট ঘরে ১৫ মাস বয়সী জায়েদ নোফাল ঘুমিয়ে ছিল। গাজার প্রচণ্ড গরমের কারণে তার গায়ে কোনো কম্বলও ছিল না।

রাত ৩টার দিকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাদের বাড়িটি ধসে পড়ে, আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছোট্ট জায়েদের নিথর দেহ।

কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার ৩৮ বছর বয়সী মা ফাতিমা নোফাল। রক্ত ও ধুলায় আচ্ছন্ন অবস্থায়, চারপাশে প্রতিবেশীদের চিৎকারের মধ্যে তিনিও আবার এমন এক শোকের মুখোমুখি হলেন, যা তিনি আগেও সহ্য করেছেন। জায়েদ ছিল তার চতুর্থ ছেলে, যে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারায়। এর আগে ২০২৩ সালে তিনি তিন ছেলেকে হারিয়েছিলেন।

প্রতিবেশীরা ছুটে এসে বাড়িটির ধ্বংসস্তূপ সরাতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর বাড়িটি আংশিকভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল।

ফাতিমা বলেন, ‘এখনও আমি বুঝে উঠতে পারিনি কী ঘটেছে। আমি গভীর শোক আর বিস্ময়ে হতবাক।’

তিনি আরও বলেন, ‘হামলার কয়েক মিনিট আগে প্রচণ্ড গরমের কারণে আমি ঘরের অন্য পাশে চলে গিয়েছিলাম। ছোট্ট জায়েদকে জানালার পাশে রেখে দিয়েছিলাম, যেন বাতাসে একটু আরাম করে ঘুমাতে পারে।’

নিজে আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি বাড়ি ছাড়েননি। বরং প্রতিবেশীদের অনুরোধ করেন তার ছেলেকে খুঁজে বের করতে।

তিনি বলেন, ‘ঘরটি পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে ভরে গিয়েছিল। সবাই মিলে ইট-পাথর সরিয়ে তাকে খুঁজতে শুরু করে।’

অবশেষে জায়েদকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। একটি পাতলা কম্বলে জড়িয়ে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু ততক্ষণে সে আর নেই।

২০২৩ সালে তিন ছেলের মৃত্যু

জায়েদের মৃত্যু আবারও ফিরিয়ে আনে ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরের সেই বিভীষিকাময় দিন, যখন একটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় ফাতিমার তিন ছেলে নিহত হন। সেদিন শুধু তিনি ও তার দুই মেয়ে বেঁচে ছিলেন।

যুদ্ধের শুরুতে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় পরিবারসহ আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবির ছেড়ে আল-জাওয়াইদার আল-সাওয়ারহা এলাকায় চলে যান তারা।

তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম সীমান্তের কাছাকাছি থাকার চেয়ে সেখানে নিরাপদ থাকব। কিন্তু কখনো ভাবিনি, নিরাপত্তার আশায় যেখানে গিয়েছিলাম, সেখানেই আমার তিন ছেলে এবং আমার স্বামীর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারাব।’

সেই হামলায় নিহত হয় তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে আমিন, ১১ বছরের হামজা এবং মাত্র ২২ দিনের নবজাতক আহমেদ।

ফাতিমা ও তার দুই মেয়েও আহত হন। আশ্রয়স্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাদের বারবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়।

ছোট একটি অলৌকিক ঘটনা

গাজার প্রায় সব মানুষের মতো ফাতিমাও দীর্ঘ মাস ধরে বাস্তুচ্যুতি, ক্ষতি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন।

তিন ছেলে হারানোর দশ মাস পর তিনি জানতে পারেন, তিনি আবার সন্তানসম্ভবা। পরে জানতে পারেন, এবারও ছেলে সন্তান হবে।

২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল চলমান যুদ্ধের মধ্যেই জন্ম নেয় জায়েদ।

ফাতিমা বলেন, ‘জায়েদের জন্ম ছিল যুদ্ধের সময় আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সুখবর। সে আমাদের জীবনে ছোট্ট এক অলৌকিক ঘটনা হয়ে এসেছিল। দীর্ঘদিনের কান্না আর কষ্টের পর সে আমাদের ঘরে আলো ফিরিয়ে এনেছিল।’

পরিবারের অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, মৃত ছেলেদের কারও নামে তার নাম রাখতে।

কিন্তু ফাতিমা রাজি হননি।

‘আমি চেয়েছিলাম, তার নিজের একটি নাম থাকুক, নিজের একটি ভাগ্য থাকুক।’ ক্রমে জায়েদ হয়ে ওঠে পুরো পরিবারের আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু। তার দুই বোন তাকে ভীষণ ভালোবাসত।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন তাকে টিকা বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ক্লিনিকে নিয়ে যেতাম, তার বোনেরা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত। এই কয়েক ঘণ্টাও তারা তাকে ছাড়া থাকতে পারত না।’

আরেকটি অসহনীয় ক্ষতি

ফাতিমা নিজেও হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

তার বড় মেয়ে বারাআ সামান্য আহত হলেও ছোট মেয়ে লিনা মাথায় গুরুতর আঘাত পায়।

তিনি বলেন,‘লিনা এখনও হাসপাতালে। আমি যখন তাকে দেখতে গেলাম, প্রথমেই সে জায়েদের কথা জিজ্ঞেস করল। আমি তাকে সত্য বলতে পারিনি। বলেছি, জায়েদ ভালো আছে এবং তার অপেক্ষায় রয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কীভাবে তাকে সত্যটা বলব, আমি জানি না।’

শৈশবও পায়নি জায়েদ

ফাতিমার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয় এই ভাবনা যে, জায়েদ কখনো স্বাভাবিক শৈশব পায়নি।

তিনি বলেন, ‘যেদিন সে মারা যায়, সেদিন বিকেলে বাইরে যেতে চাইছিল। আমি তার বোনদের বলেছিলাম, যদি কোথাও নিয়ে যেতে পারতাম! কিন্তু শিশুদের খেলার মতো কোনো জায়গাই আর অবশিষ্ট নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘সে সারাজীবন ঘরের ভেতরেই ছিল। তার চাচাতো ভাই-বোনেরাও ইসরায়েলি হামলায় মারা গেছে। তাই তার খেলাধুলারও কোনো সঙ্গী ছিল না।’

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ

গত বছরের যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে প্রায় ১০ মাসে অন্তত ১,২০০ জন নিহত হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে মোট ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে বিপুলসংখ্যকই নারী ও শিশু।

ইউনিসেফ জুন মাসে জানায়, যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজায় প্রায় ২৬০ শিশু নিহত হয়েছে।

ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধবিরতির নিষ্ঠুর ও প্রাণঘাতী ভ্রম’ বলে বর্ণনা করে বলেন, গড়ে প্রতিদিন একজন শিশু নিহত হচ্ছে।

নিজের সন্তানদের হারানোর পর ফাতিমা বিশ্বাস করেন, ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ; বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ইচ্ছাকৃত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

তিনি বলেন,‘যুদ্ধ শুরুর পর নিহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। ইসরায়েল আমাদের হত্যা করতে চায়, আর এর জন্য তাদের কোনো অজুহাতেরও প্রয়োজন হয় না।’

সেদিনই আল-বুরেইজে জায়েদ নিহত হওয়ার পাশাপাশি আল-মাওয়াসিতে আরেকটি ইসরায়েলি হামলায় ৯ বছর বয়সী রাতিল আল-আবাদলাও নিহত হয়।

তার বাবা আবদুল্লাহ আল-আবাদলার কোলে মেয়ের নিথর দেহ নিয়ে কর প্রশ্ন , আমার মেয়েটি কী অপরাধ করেছিল? যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

গাজার অসংখ্য পরিবারের কাছে এই প্রশ্ন এখন যেন প্রতিদিনের বাস্তবতা।

জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, তারা এমন প্রমাণ পেয়েছে যে ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড গণহত্যামূলক কার্যকলাপের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কিন্তু ফাতিমা নোফালের জন্য কোনো প্রতিবেদন, পরিসংখ্যান বা তদন্তই তার হারিয়ে যাওয়া চার সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

আহত মেয়ের হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে তিনি এখন নতুন এক সংগ্রামের মুখোমুখি—একটি নতুন আশ্রয় খুঁজে পাওয়া এবং ছোট মেয়েকে জানানো যে তার প্রিয় ছোট ভাই আর কখনো ফিরে আসবে না।

তিনি বলেন,‘আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে। আমি জানি না, সেই আগুন কে নিভিয়ে দেবে।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

তিন ছেলে হারিয়ে জায়েদই ছিল শেষ ভরসা, তাকেও কেড়ে নিল ইসরায়েল

প্রকাশিত সময় : ০৫:২৩:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
ইসরায়েলি বিমান হামলায় ২০২৩ সালে তিন ছেলে হারানোর পর ফাতিমা নোফালের কোলজুড়ে আসে জায়েদ। কিন্তু ১৫ মাস পর মধ্য গাজায় আরেকটি ইসরায়েলি হামলায় সেও নিহত হয়।

খোলা জানালার পাশে একটি ছোট ঘরে ১৫ মাস বয়সী জায়েদ নোফাল ঘুমিয়ে ছিল। গাজার প্রচণ্ড গরমের কারণে তার গায়ে কোনো কম্বলও ছিল না।

রাত ৩টার দিকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাদের বাড়িটি ধসে পড়ে, আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছোট্ট জায়েদের নিথর দেহ।

কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার ৩৮ বছর বয়সী মা ফাতিমা নোফাল। রক্ত ও ধুলায় আচ্ছন্ন অবস্থায়, চারপাশে প্রতিবেশীদের চিৎকারের মধ্যে তিনিও আবার এমন এক শোকের মুখোমুখি হলেন, যা তিনি আগেও সহ্য করেছেন। জায়েদ ছিল তার চতুর্থ ছেলে, যে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারায়। এর আগে ২০২৩ সালে তিনি তিন ছেলেকে হারিয়েছিলেন।

প্রতিবেশীরা ছুটে এসে বাড়িটির ধ্বংসস্তূপ সরাতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর বাড়িটি আংশিকভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল।

ফাতিমা বলেন, ‘এখনও আমি বুঝে উঠতে পারিনি কী ঘটেছে। আমি গভীর শোক আর বিস্ময়ে হতবাক।’

তিনি আরও বলেন, ‘হামলার কয়েক মিনিট আগে প্রচণ্ড গরমের কারণে আমি ঘরের অন্য পাশে চলে গিয়েছিলাম। ছোট্ট জায়েদকে জানালার পাশে রেখে দিয়েছিলাম, যেন বাতাসে একটু আরাম করে ঘুমাতে পারে।’

নিজে আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি বাড়ি ছাড়েননি। বরং প্রতিবেশীদের অনুরোধ করেন তার ছেলেকে খুঁজে বের করতে।

তিনি বলেন, ‘ঘরটি পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে ভরে গিয়েছিল। সবাই মিলে ইট-পাথর সরিয়ে তাকে খুঁজতে শুরু করে।’

অবশেষে জায়েদকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। একটি পাতলা কম্বলে জড়িয়ে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু ততক্ষণে সে আর নেই।

২০২৩ সালে তিন ছেলের মৃত্যু

জায়েদের মৃত্যু আবারও ফিরিয়ে আনে ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরের সেই বিভীষিকাময় দিন, যখন একটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় ফাতিমার তিন ছেলে নিহত হন। সেদিন শুধু তিনি ও তার দুই মেয়ে বেঁচে ছিলেন।

যুদ্ধের শুরুতে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় পরিবারসহ আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবির ছেড়ে আল-জাওয়াইদার আল-সাওয়ারহা এলাকায় চলে যান তারা।

তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম সীমান্তের কাছাকাছি থাকার চেয়ে সেখানে নিরাপদ থাকব। কিন্তু কখনো ভাবিনি, নিরাপত্তার আশায় যেখানে গিয়েছিলাম, সেখানেই আমার তিন ছেলে এবং আমার স্বামীর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারাব।’

সেই হামলায় নিহত হয় তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে আমিন, ১১ বছরের হামজা এবং মাত্র ২২ দিনের নবজাতক আহমেদ।

ফাতিমা ও তার দুই মেয়েও আহত হন। আশ্রয়স্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাদের বারবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়।

ছোট একটি অলৌকিক ঘটনা

গাজার প্রায় সব মানুষের মতো ফাতিমাও দীর্ঘ মাস ধরে বাস্তুচ্যুতি, ক্ষতি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন।

তিন ছেলে হারানোর দশ মাস পর তিনি জানতে পারেন, তিনি আবার সন্তানসম্ভবা। পরে জানতে পারেন, এবারও ছেলে সন্তান হবে।

২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল চলমান যুদ্ধের মধ্যেই জন্ম নেয় জায়েদ।

ফাতিমা বলেন, ‘জায়েদের জন্ম ছিল যুদ্ধের সময় আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সুখবর। সে আমাদের জীবনে ছোট্ট এক অলৌকিক ঘটনা হয়ে এসেছিল। দীর্ঘদিনের কান্না আর কষ্টের পর সে আমাদের ঘরে আলো ফিরিয়ে এনেছিল।’

পরিবারের অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, মৃত ছেলেদের কারও নামে তার নাম রাখতে।

কিন্তু ফাতিমা রাজি হননি।

‘আমি চেয়েছিলাম, তার নিজের একটি নাম থাকুক, নিজের একটি ভাগ্য থাকুক।’ ক্রমে জায়েদ হয়ে ওঠে পুরো পরিবারের আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু। তার দুই বোন তাকে ভীষণ ভালোবাসত।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন তাকে টিকা বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ক্লিনিকে নিয়ে যেতাম, তার বোনেরা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত। এই কয়েক ঘণ্টাও তারা তাকে ছাড়া থাকতে পারত না।’

আরেকটি অসহনীয় ক্ষতি

ফাতিমা নিজেও হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

তার বড় মেয়ে বারাআ সামান্য আহত হলেও ছোট মেয়ে লিনা মাথায় গুরুতর আঘাত পায়।

তিনি বলেন,‘লিনা এখনও হাসপাতালে। আমি যখন তাকে দেখতে গেলাম, প্রথমেই সে জায়েদের কথা জিজ্ঞেস করল। আমি তাকে সত্য বলতে পারিনি। বলেছি, জায়েদ ভালো আছে এবং তার অপেক্ষায় রয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কীভাবে তাকে সত্যটা বলব, আমি জানি না।’

শৈশবও পায়নি জায়েদ

ফাতিমার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয় এই ভাবনা যে, জায়েদ কখনো স্বাভাবিক শৈশব পায়নি।

তিনি বলেন, ‘যেদিন সে মারা যায়, সেদিন বিকেলে বাইরে যেতে চাইছিল। আমি তার বোনদের বলেছিলাম, যদি কোথাও নিয়ে যেতে পারতাম! কিন্তু শিশুদের খেলার মতো কোনো জায়গাই আর অবশিষ্ট নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘সে সারাজীবন ঘরের ভেতরেই ছিল। তার চাচাতো ভাই-বোনেরাও ইসরায়েলি হামলায় মারা গেছে। তাই তার খেলাধুলারও কোনো সঙ্গী ছিল না।’

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ

গত বছরের যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে প্রায় ১০ মাসে অন্তত ১,২০০ জন নিহত হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে মোট ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে বিপুলসংখ্যকই নারী ও শিশু।

ইউনিসেফ জুন মাসে জানায়, যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজায় প্রায় ২৬০ শিশু নিহত হয়েছে।

ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধবিরতির নিষ্ঠুর ও প্রাণঘাতী ভ্রম’ বলে বর্ণনা করে বলেন, গড়ে প্রতিদিন একজন শিশু নিহত হচ্ছে।

নিজের সন্তানদের হারানোর পর ফাতিমা বিশ্বাস করেন, ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ; বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ইচ্ছাকৃত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

তিনি বলেন,‘যুদ্ধ শুরুর পর নিহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। ইসরায়েল আমাদের হত্যা করতে চায়, আর এর জন্য তাদের কোনো অজুহাতেরও প্রয়োজন হয় না।’

সেদিনই আল-বুরেইজে জায়েদ নিহত হওয়ার পাশাপাশি আল-মাওয়াসিতে আরেকটি ইসরায়েলি হামলায় ৯ বছর বয়সী রাতিল আল-আবাদলাও নিহত হয়।

তার বাবা আবদুল্লাহ আল-আবাদলার কোলে মেয়ের নিথর দেহ নিয়ে কর প্রশ্ন , আমার মেয়েটি কী অপরাধ করেছিল? যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

গাজার অসংখ্য পরিবারের কাছে এই প্রশ্ন এখন যেন প্রতিদিনের বাস্তবতা।

জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, তারা এমন প্রমাণ পেয়েছে যে ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড গণহত্যামূলক কার্যকলাপের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কিন্তু ফাতিমা নোফালের জন্য কোনো প্রতিবেদন, পরিসংখ্যান বা তদন্তই তার হারিয়ে যাওয়া চার সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

আহত মেয়ের হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে তিনি এখন নতুন এক সংগ্রামের মুখোমুখি—একটি নতুন আশ্রয় খুঁজে পাওয়া এবং ছোট মেয়েকে জানানো যে তার প্রিয় ছোট ভাই আর কখনো ফিরে আসবে না।

তিনি বলেন,‘আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে। আমি জানি না, সেই আগুন কে নিভিয়ে দেবে।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই