সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুইডেনের আলোচিত স্টকহোম জামে মসজিদ

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেশটির বৃহত্তম ও সর্বাধিক পরিচিত মসজিদ—স্টকহোম জামে মসজিদ। মসজিদটির আসল নাম জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান মসজিদ হলেও এটি স্টকহোম গ্র্যান্ড মসজিদ নামেই বেশ পরিচিত।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের পরিকল্পনা, আলোচনা ও নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ২০০০ সালের ৮ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় স্টকহোম জামে মসজিদ। বর্তমানে এটি স্টকহোম ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিদিন শত শত মুসল্লি ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে।
এই মসজিদের পেছনের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ ও চমকপ্রদ। স্টকহোমে একটি বড় জামে মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হওয়ার পর প্রায় বিশ বছর ধরে বিভিন্ন স্থান নিয়ে আলোচনা চলে।

নরটুল, অবজারভেটোরিলুন্ডেন, ক্রিস্টিনবার্গ, স্কারহোলমেন, টেনস্তা ও জারলাপ্লানসহ একাধিক এলাকা বিবেচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয় ঐতিহাসিক কাতারিনা বিদ্যুৎকেন্দ্র ভবনকে।
১৯৯৬ সালে স্টকহোম সিটি কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনারে ভবনটি স্টকহোম ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশনের কাছে বিক্রি করে। পরে ১৯৯৯ সালে সিটি কাউন্সিল ভবনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদে রূপান্তরের অনুমোদন দেয়। যদিও বিক্ষোভ, আপত্তি ও আইনি জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ কিছুটা বিলম্বিত হয়, শেষ পর্যন্ত সব বাধা অতিক্রম করে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে স্টকহোমের এই ঐতিহাসিক জামে মসজিদ।

বর্তমান মসজিদের ভবনটি মূলত ১৯০৩ সালে বিখ্যাত সুইডিশ স্থপতি ফার্ডিনান্দ বোবার্গ নির্মাণ করেন। মরক্কো সফর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভবনটির নকশায় ইসলামি বা মুরিশ স্থাপত্যশৈলীর ছাপ ফুটিয়ে তোলেন। উঁচু খিলানযুক্ত জানালা, নান্দনিক অলংকরণ এবং কিবলামুখী বিন্যাস ভবনটিকে পরবর্তীকালে মসজিদে রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত উপযোগী করে তোলে। আজও এর স্থাপত্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

মসজিদ নির্মাণে সুইডেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা উদারভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

দাতাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মসজিদটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় তাঁর নামেই।
স্টকহোম জামে মসজিদ কেবল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বা জুমার জামাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সুইডেনের মুসলিম সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানে নিয়মিত কোরআন শিক্ষা, ইসলামি বক্তৃতা, দাওয়াহ কার্যক্রম, আন্তধর্মীয় সংলাপ, সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগসহ নানা ধরনের কর্মসূচি পরিচালিত হয়।

মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এছাড়া ভবনের ভেতরে রয়েছে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, বক্তৃতা হল, অফিস, ব্যায়ামাগার, বড় রান্নাঘর, ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্টকহোম জামে মসজিদ সুইডেনের মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ইতিহাস, স্থাপত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্প্রীতির অনন্য সমন্বয়ে এটি আজ শুধু সুইডেনের বৃহত্তম মসজিদই নয়, বরং ইউরোপে ইসলামের শান্তিপূর্ণ উপস্থিতি ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবদানের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবেও বেশ সমাদৃত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সুইডেনের আলোচিত স্টকহোম জামে মসজিদ

প্রকাশিত সময় : ০৫:০৪:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেশটির বৃহত্তম ও সর্বাধিক পরিচিত মসজিদ—স্টকহোম জামে মসজিদ। মসজিদটির আসল নাম জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান মসজিদ হলেও এটি স্টকহোম গ্র্যান্ড মসজিদ নামেই বেশ পরিচিত।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের পরিকল্পনা, আলোচনা ও নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ২০০০ সালের ৮ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় স্টকহোম জামে মসজিদ। বর্তমানে এটি স্টকহোম ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিদিন শত শত মুসল্লি ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে।
এই মসজিদের পেছনের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ ও চমকপ্রদ। স্টকহোমে একটি বড় জামে মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হওয়ার পর প্রায় বিশ বছর ধরে বিভিন্ন স্থান নিয়ে আলোচনা চলে।

নরটুল, অবজারভেটোরিলুন্ডেন, ক্রিস্টিনবার্গ, স্কারহোলমেন, টেনস্তা ও জারলাপ্লানসহ একাধিক এলাকা বিবেচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয় ঐতিহাসিক কাতারিনা বিদ্যুৎকেন্দ্র ভবনকে।
১৯৯৬ সালে স্টকহোম সিটি কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনারে ভবনটি স্টকহোম ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশনের কাছে বিক্রি করে। পরে ১৯৯৯ সালে সিটি কাউন্সিল ভবনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদে রূপান্তরের অনুমোদন দেয়। যদিও বিক্ষোভ, আপত্তি ও আইনি জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ কিছুটা বিলম্বিত হয়, শেষ পর্যন্ত সব বাধা অতিক্রম করে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে স্টকহোমের এই ঐতিহাসিক জামে মসজিদ।

বর্তমান মসজিদের ভবনটি মূলত ১৯০৩ সালে বিখ্যাত সুইডিশ স্থপতি ফার্ডিনান্দ বোবার্গ নির্মাণ করেন। মরক্কো সফর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভবনটির নকশায় ইসলামি বা মুরিশ স্থাপত্যশৈলীর ছাপ ফুটিয়ে তোলেন। উঁচু খিলানযুক্ত জানালা, নান্দনিক অলংকরণ এবং কিবলামুখী বিন্যাস ভবনটিকে পরবর্তীকালে মসজিদে রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত উপযোগী করে তোলে। আজও এর স্থাপত্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

মসজিদ নির্মাণে সুইডেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা উদারভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

দাতাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মসজিদটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় তাঁর নামেই।
স্টকহোম জামে মসজিদ কেবল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বা জুমার জামাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সুইডেনের মুসলিম সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানে নিয়মিত কোরআন শিক্ষা, ইসলামি বক্তৃতা, দাওয়াহ কার্যক্রম, আন্তধর্মীয় সংলাপ, সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগসহ নানা ধরনের কর্মসূচি পরিচালিত হয়।

মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এছাড়া ভবনের ভেতরে রয়েছে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, বক্তৃতা হল, অফিস, ব্যায়ামাগার, বড় রান্নাঘর, ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্টকহোম জামে মসজিদ সুইডেনের মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ইতিহাস, স্থাপত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্প্রীতির অনন্য সমন্বয়ে এটি আজ শুধু সুইডেনের বৃহত্তম মসজিদই নয়, বরং ইউরোপে ইসলামের শান্তিপূর্ণ উপস্থিতি ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবদানের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবেও বেশ সমাদৃত।